নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখাসহ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে নয় দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে থাকা প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার দাবিও জানিয়েছে দলটি।
বুধবার (২৯ জুলাই) নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব কথা বলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে কমিশনের সঙ্গে জামায়াত বৈঠক করেছে বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ৩০ জুন ইসিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে সাতটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি সামসুল আলমকে ইসির অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, এখানে রাজনৈতিক ব্যক্তির নিয়োগ যেকোন নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে অন্তরায় এবং বাধা। সামসুল আলম বিএনপির নির্বাচনী আসন পুননির্ধারণ কমিটির সদস্য ছিলেন, তার নিয়োগ বাতিল করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী জায়গায় রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিকে ইসির মত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাতে তিনি সরকারি দলের লোকদেরকে স্থানীয় নির্বাচনে বিজয়ী করে নিয়ে আসতে পারেন, সেই কাজটা উনি যেন এখানে বসে করতে পারেন, সেই তৎপরতার জন্যই তাকে এখানে বিশেষভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসি তাদের বলেছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তারা জানতেন না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
সামসুল আলমের নিয়োগে ইসি আপত্তি জানাতে পারত উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কথার ভেতর দিয়ে তো উনারা উনাদের অসহায়ত্বের কথা, অক্ষমতার কথা, অপারগতার কথাই আলটিমেটলি ফুটে উঠেছে।
স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণায় ইসির প্রস্তাবের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে থাকেন। জাতীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের লোকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিধিনিষেধ আরোপ করেননি। তারা তো ইলেকশন করছেন। একটা ইলেকশন করতে পারবে, আরেকটা পারবে না। তো এই যে একটা বৈষম্য, সংবিধানে নাগরিক অধিকারের খেলাপ। ইসি জানিয়েছে বিষয়টি আলোচনা করে দেখবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পদদারী নেতাদের প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনীতির নিষিদ্ধতা থাকলে ব্যক্তি যেহেতু রাজনীতি করে, ব্যক্তির নির্বাচন করাটাও একটা রাজনীতি। ফলে পদ-পদবীধারী নিষিদ্ধ দলের কোনো ব্যক্তির নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও অযোগ্য এবং নিষিদ্ধ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, তাদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য করতে হবে। কারণ এরকম স্থানীয় সরকারের পদে থেকে দুই-পাঁচ-দশ মাস সার্ভ করে সাথে সাথে ইলেকশনে ক্যান্ডিডেট হওয়া মানেই হচ্ছে যে এই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ হতে দেওয়া হলো না। দলীয়করণের জন্যই তাকে এখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং নির্বাচন একেবারে দিব্বি এটা একটা দলীয় নির্বাচন হবে, পক্ষপাতিত্ব হবে, এটা নিরপেক্ষ হবে না, স্বচ্ছ হবে না।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে রায় ঘোষণার দিনই চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপির সরওয়ার আলমগীরের গেজেট প্রকাশে ইসির সমালোচনা করেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রেসারের মুখে আপনারা দুই চার ঘণ্টার মধ্যে স্বাক্ষর করা আদেশ আসার পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি, আপনারা একটা গেজেট জারি করে দিয়ে শপথের ব্যবস্থা করে দিলেন, পলিটিক্যাল প্রেসারে ছিলেন। তো উনাদের কথাবার্তায় তো আর ওই ভাষায় তো আর স্বীকার করবেন না। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝা যায় যে তারা আন্ডার প্রেসারে এটা করতে বাধ্য হয়েছেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ইসি যে স্বাধীন, সাংবিধানিক একটা বিরাট ক্ষমতাধীন একটা সাংবিধানিক সংস্থা, বিরাট ক্ষমতাসম্পন্ন এবং দেশের নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটা বিরাট ক্ষমতা তাদেরকে দেওয়া হয়েছে, তারা এ ব্যাপারে যে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না আমরা বিনয় সাথে সে ব্যাপারে তাদেরকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।
সাতক্ষীরা-৪ আলোচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সদস্য পদ নিয়ে তিনি বলেন, আমরা স্পিকার ও ইসির কাছে চিঠি দিয়েছি। আমাদের দিক থেকে দল থেকে বহিস্কার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা। সদস্য পদের বিষয়টি সাংবিধানিক। এটা স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের বিষয়। আমাদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা হয় নি আজ।
গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির সংসদীয় আসন পুনবির্ন্যাস কমিটির সাবেক সদস্য শামসুল আলম। তাকে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
শামসুল আলমের নিয়োগের বিষয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি’র রাজনীতিতে যুক্ত শামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব করা হয়েছে। তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক নিয়োগ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। তিনি নির্বাচনের সময় বিএনপির একটি কমিটিতে ছিলেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করে আনতে এই নিয়োগটি দিয়েছে সরকার। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।
এসময় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জসিম উদ্দীন সরকার এবং শিশির মোহাম্মদ মনির উপস্থিত ছিলেন। সিইসি ছাড়াও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন, নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























