Dhaka বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জে সেতু এখন উদ্বেগ আর হতাশার প্রতীক, ভোগান্তিতে স্থানীয় বাসিন্দারা

সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি : 

পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর। যেখানে প্রতি মৌসুমে যাদুকাটা নদী, বারিকা টিলা, নীলাদ্রি লেক ও টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন দেশের লক্ষাধিক ভ্রমণপিপাসু। এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সীমান্তবর্তী তিনটি শুল্ক স্টেশনের কার্যক্রম সচল রাখা এবং পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে যাদুকাটা নদীর ওপর প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ শুরু হয় শাহ আরেফিন (রা.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু। কিন্তু স্বপ্নের এই সেতু এখন উদ্বেগ আর হতাশার প্রতীক।

নির্মাণকাজ শুরুর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দুই দফায় ভেঙে পড়েছে সেতুর গার্ডার। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতটি গার্ডার। বারবার এমন ঘটনায় নির্মাণ মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। আর হতাশা বাড়ছে পুরো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পল্লি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর তমা কনস্ট্রাকশন একাধিক দফায় সময় বাড়িয়েও আট বছরে কাজ শেষ করতে পারেনি। সেতুর ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে এখনও ১৮টি গার্ডার ও পাঁচটি স্লাবের কাজ বাকি রয়েছে। এরমধ্যেই দুই দফায় সাতটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, এখানে যখন সেতু নির্মাণ শুরু হয় তখন এই অঞ্চলের মানুষ অনেক আশা করেছিল- যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হবে। অথচ গত আট বছর ধরে এই সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে অর্থ শুধু আতসাৎ করা হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি। পাশাপাশি গত কয়েকদিন ধরে রাতের আঁধারে সেতুর পাশেই অবৈধ ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছে একটি চক্র। ফলে সেতুর কাজের মান ও ড্রেজার দিয়ে সেতুর পাশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে গত সোমবার (১৮ মে) সেতুর ৫টি গাডার ভেঙে পড়ে।

যাদুকাটা পাড়ের বাসিন্দা আফাজ মিয়া বলেন, সেতুর নির্মাণ কাজের সময় প্রচুর অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। পাশাপাশি সেতুর পাশে বড় বড় ড্রেজার লাগিয়ে বালু উত্তোলন হয়েছে। এর ফলেই মূলত সেতুর গার্ডার ভেঙে পড়ে।

লাউড়েরগড় এলাকার বাসিন্দা ওয়াসিম মিয়া বলেন, ৮ বছরেও এই সেতুর কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তারমধ্যে দুই বছরে দুই বার সেতুর গাডার ভেঙে পড়লো। এই নিয়ে সাতটি গার্ডার ভেঙেছে সেতুটির।

মিয়ারচর এলাকার বাসিন্দা আলীরাজ বলেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ ফেরি পারাপার হয়। অথচ যখন সেতু নির্মাণ শুরু হয়েছিল তখন এই অঞ্চলের মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। ঠিকাদারের কাজের মান অনেক খারাপ। পাশাপাশি নদীতে ড্রেজার তাণ্ডবে এই সেতুটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন। পাশাপাশি ২৪ সালের আগ থেকেই সেতুর নির্মাণধীন কাজ বন্ধ থাকায় সম্প্রতি ঠিকাদার বাতিল করে পুনরায় অসমাপ্ত কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু গত সোমবার বিকেলে হঠাৎ করে সেতুটির পাঁচ গার্ডার ভাঙার পর এই প্রক্রিয়া থমকে গেছে। আবার নতুন করে ওই পাঁচ গার্ডারসহ ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।

তমা কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার আনিসুর রহমান বলেন, সেতুর বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, যাদুকাটা সেতুটি ৮ বছরেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে সেতুটির ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। এটার ক্ষতিপূরণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা টাকা থেকে মোট দুই কোটি ১০ লাখ টাকা কর্তন করা হবে।

সেতু নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি সঠিক নয় দাবি করে এই প্রকৌশলী বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গার্ডারগুলো করার সময় ক্লোজ গার্ডার করলে এমন হতো না।

আবহাওয়া

সুনামগঞ্জে সেতু এখন উদ্বেগ আর হতাশার প্রতীক, ভোগান্তিতে স্থানীয় বাসিন্দারা

প্রকাশের সময় : ১২:৩৭:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি : 

পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর। যেখানে প্রতি মৌসুমে যাদুকাটা নদী, বারিকা টিলা, নীলাদ্রি লেক ও টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন দেশের লক্ষাধিক ভ্রমণপিপাসু। এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সীমান্তবর্তী তিনটি শুল্ক স্টেশনের কার্যক্রম সচল রাখা এবং পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে যাদুকাটা নদীর ওপর প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ শুরু হয় শাহ আরেফিন (রা.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু। কিন্তু স্বপ্নের এই সেতু এখন উদ্বেগ আর হতাশার প্রতীক।

নির্মাণকাজ শুরুর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দুই দফায় ভেঙে পড়েছে সেতুর গার্ডার। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতটি গার্ডার। বারবার এমন ঘটনায় নির্মাণ মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। আর হতাশা বাড়ছে পুরো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পল্লি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর তমা কনস্ট্রাকশন একাধিক দফায় সময় বাড়িয়েও আট বছরে কাজ শেষ করতে পারেনি। সেতুর ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে এখনও ১৮টি গার্ডার ও পাঁচটি স্লাবের কাজ বাকি রয়েছে। এরমধ্যেই দুই দফায় সাতটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, এখানে যখন সেতু নির্মাণ শুরু হয় তখন এই অঞ্চলের মানুষ অনেক আশা করেছিল- যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হবে। অথচ গত আট বছর ধরে এই সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে অর্থ শুধু আতসাৎ করা হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি। পাশাপাশি গত কয়েকদিন ধরে রাতের আঁধারে সেতুর পাশেই অবৈধ ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছে একটি চক্র। ফলে সেতুর কাজের মান ও ড্রেজার দিয়ে সেতুর পাশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে গত সোমবার (১৮ মে) সেতুর ৫টি গাডার ভেঙে পড়ে।

যাদুকাটা পাড়ের বাসিন্দা আফাজ মিয়া বলেন, সেতুর নির্মাণ কাজের সময় প্রচুর অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। পাশাপাশি সেতুর পাশে বড় বড় ড্রেজার লাগিয়ে বালু উত্তোলন হয়েছে। এর ফলেই মূলত সেতুর গার্ডার ভেঙে পড়ে।

লাউড়েরগড় এলাকার বাসিন্দা ওয়াসিম মিয়া বলেন, ৮ বছরেও এই সেতুর কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তারমধ্যে দুই বছরে দুই বার সেতুর গাডার ভেঙে পড়লো। এই নিয়ে সাতটি গার্ডার ভেঙেছে সেতুটির।

মিয়ারচর এলাকার বাসিন্দা আলীরাজ বলেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ ফেরি পারাপার হয়। অথচ যখন সেতু নির্মাণ শুরু হয়েছিল তখন এই অঞ্চলের মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। ঠিকাদারের কাজের মান অনেক খারাপ। পাশাপাশি নদীতে ড্রেজার তাণ্ডবে এই সেতুটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন। পাশাপাশি ২৪ সালের আগ থেকেই সেতুর নির্মাণধীন কাজ বন্ধ থাকায় সম্প্রতি ঠিকাদার বাতিল করে পুনরায় অসমাপ্ত কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু গত সোমবার বিকেলে হঠাৎ করে সেতুটির পাঁচ গার্ডার ভাঙার পর এই প্রক্রিয়া থমকে গেছে। আবার নতুন করে ওই পাঁচ গার্ডারসহ ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।

তমা কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার আনিসুর রহমান বলেন, সেতুর বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, যাদুকাটা সেতুটি ৮ বছরেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে সেতুটির ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। এটার ক্ষতিপূরণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা টাকা থেকে মোট দুই কোটি ১০ লাখ টাকা কর্তন করা হবে।

সেতু নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি সঠিক নয় দাবি করে এই প্রকৌশলী বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গার্ডারগুলো করার সময় ক্লোজ গার্ডার করলে এমন হতো না।