বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিবারই দেশকে সংকটমুক্ত করেছে : প্রধানমন্ত্রী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৪০:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৭৮ জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

যখনই দেশের মানুষ অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিবারই দেশকে সংকট থেকে বের করে এনেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা (ফ্যাসিবাদ) শুধু লুটপাট ও অর্থ পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, খেলাপি ঋণের হিসাবেও জালিয়াতি করেছিল। ২০২৪ সালে তারা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল মাত্র ১১ শতাংশ। অথচ আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ফরেনসিক অডিটে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। তবে আমাদের সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে গত ৫ মাসে তা কমে ৩২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

তারেক রহমান বলেন, বিরোধীদলকে সঙ্গে নিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের কারণে যে সংকট, তাতে জনগণের ভোগান্তিতে সরকার সচেতন। তবে এটা বর্তমান সরকারের তৈরি নয়, এটা ফ্যাসিস্ট সরকারের তৈরি।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাস এবং বিদ্যুতের কারণে জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সচেতন। এই সমস্যা হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়নি।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস উত্তোলনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। এবং খুবই আশ্চর্যের বিষয়, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের ডানে এবং বামে যে প্রতিবেশী দেশগুলো আছে, তারা সমুদ্র থেকে গ্যাস আরোহণ করছে। কী এক অদৃশ্য ইশারায় বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলন করেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে বলে বিশেষ কোনো দেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তারা যাতে নির্বিঘ্নে গ্যাস নিয়ে যেতে পারে, সেই জন্যই বাংলাদেশের অংশে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস কূপ খনন করা হয়নি।

তিনি বলেন, অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যই ছিল আমাদের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। এমন পরিস্থিতিতেই সম্পূর্ণভাবেই দেশকে নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছিল জ্বালানি নির্ভর।

তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে, নির্বাচনের পরে সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরেই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল এবং গ্যাস আমদানি করা হতো, সে ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হলো। সব পত্র পত্রিকায়, সব ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতেই এই বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

সরকারপ্রধান বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই পরিস্থিতির ভেতরেই, আমাদের যে দুটি এফএসআরইউ আছে, তার একটিতে ইলেকট্রিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এবং সম্পূর্ণভাবে সেই এফএসআরইউতে গ্যাস সরবরাহ করতে সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে যায়। এটা একটা বাড়তি বিপদ। এ কারণেই বর্তমানে গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য জনগণকে এই ভোগান্তি, সমগ্র দেশের মানুষকে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

বিরোধীদলকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চায় বর্তমান সরকার, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংসদের কাছে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এই সমস্যার কারণে সমগ্র দেশের মানুষকে কিছু ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই জাতীয় সমস্যা সমাধানে তারা বিরোধীদলীয় বন্ধুদের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেছিলেন।

তবে সংকট সমাধানে রাজপথের কর্মসূচির কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অথচ আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কিনা।’

লংমার্চের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।

তিনি আরো বলেন, এই (জ্বালানি ও বিদ্যুতের) সমস্যা সমাধানে আমরা বিরোধীদলীয় বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। অথচ আমরা দেখলাম একটি বিশাল গাড়ি লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না!

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের পরে সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল এবং গ্যাস আমদানি করা হতো, সে ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হলো। সব পত্র-পত্রিকায়, সব আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেই এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই পরিস্থিতির ভেতরে আমাদের যে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে, এর মধ্যে একটিতে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিটে দুর্ঘটনা ঘটে। এর ফলে সেই এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এটা একটা বাড়তি বিপদ যোগ করল এই সমস্যার ক্ষেত্রে। এ কারণেই বর্তমানে গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য জনগণকে এই ভোগান্তি, সমগ্র দেশের মানুষকে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একটি কথা সবারই মনে আছে, তারপরেও একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—রাশিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের যখন শুরু হলো, সেই সময় সেই ২০২২ সাল, সেই যুদ্ধের অজুহাতে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করার জন্য তখন অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করে সকাল ৮টা থেকে ৩টা পর্যন্ত করা হয়েছিল। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্কুলগুলো একদিনের জায়গায় দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের লেনদেনের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়েছিল।

এসময় তিনি বলেন, আমি আগেই বলেছি, কোনো অজুহাত তুলে আমরা জনগণের দুর্ভোগের সমস্যার সমাধানকে এড়িয়ে যেতে চাই না।

জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এই সংসদ ভবনকে প্রধান প্ল্যাটফর্ম ও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং একইভাবে গত দুই বছর আগে একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই চলতি অধিবেশন সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।

তিনি বলেন, সংক্ষিপ্ত এই জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের বিদ্যমান নানা সংকট, জাতীয় উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের অপার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে। সংসদ কক্ষে উত্থাপিত প্রতিটি আলোচনা পুরোপুরি সফল কিংবা অর্থবহ হয়েছে এমন দাবি করা না গেলেও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এই সংসদ ভবনকে প্রধান প্ল্যাটফর্ম ও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অধিবেশনের সার্বিক কার্যকলাপে সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিল না বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের অখণ্ডতা ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যরা দল-মত নির্বিশেষে যেসব কার্যকর উদ্যোগ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন তা ইতিবাচক। এই গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় অধিবেশনকে সার্বিকভাবে সক্রিয় ও কার্যকর রাখতে উপস্থিত সকল সংসদ সদস্যদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে জাতীয় সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে সামনের দিনগুলোতেও সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে।

জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

সংকটময় এই মুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত লং মার্চ কর্মসূচির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে উসকানি না দিয়ে সংকট উত্তরণে সরকারের পাশে থাকা উচিত। লং মার্চ দিয়ে সংকট সমাধান হলে সরকারি দল সবার আগে লং মার্চ করতো। এসময় বিরোধী দলকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি বিএনপি সরকারের অতীত সাফল্য ও সংকট জয়ের নজির তুলে ধরে দ্রুত বর্তমান পরিস্থিতি সামলে ওঠার দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দুই বছর আগের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আজ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হতে যাচ্ছে। অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ কার্যকর আলোচনা করেছে। সংসদের প্রতিটি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে তা তিনি দাবি না করলেও সংসদকে দেশের সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সব সংসদ সদস্যের সদিচ্ছার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয় পক্ষই দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করার যে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিগত ২৪-এর আন্দোলন পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন-তাদের স্বপ্ন পূরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ-এই বিশ্বাস থেকে তিনি বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প কারখানা, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দুর্নীতির পাহাড় জমেছিল, যা বিরোধী দল ও গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর সবার জানা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে কোনো অজুহাত হিসেবে না দাঁড় করিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

সাম্প্রতিক সময়কার তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনের কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টাই করেনি। এমনকি বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গ্যাস আহরণ করছিল, তখন এক অদৃশ্য ইশারায় বাংলাদেশের অংশ থেকে গ্যাস কূপ খনন করা থেকে বিরত থাকা হয়, যাতে বিশেষ কোনো দেশ লাভবান হতে পারে। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশ সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়, যা তেল-গ্যাস আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে টার্মিনালটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে সংকট চরম আকার ধারণ করে।

জ্বালানি সংকটের এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলের বিশাল গাড়িবহর লং মার্চ কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে বা জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে কোনো অপচেষ্টা চালানো সমীচীন নয়। যদি গাড়ির লং মার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হতো, তবে সরকার নিজেই সবার আগে লং মার্চের আয়োজন করত।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, ব্যাংকের সময় হ্রাস বা স্কুলে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার নামে কুইক রেন্টাল বসিয়ে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রকে দেউলিয়া ও ঋণগ্রস্ত করেছিল, অথচ দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দেয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও কারিগরি দুর্যোগের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাকে উসকানিমূলক আচরণে রূপ দিলে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ দেওয়া ১৪০০ শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজার মানুষের ত্যাগ অবমূল্যায়িত হবে এবং পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র লাভবান হবে।

সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা এবং আশাবাদের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, ইতোমধ্যে সরকার সংকট সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংকট দূর হবে। ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে একটি স্বাবলম্বী উৎপাদক রাষ্ট্রে রূপান্তর করার বিশাল পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

অতীতের ঐতিহাসিক সাফল্যের নজির তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তখনই সংকট থেকে দেশকে বের করে এনেছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ খাদ্যে উদ্বৃত্ত ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল। তিনিই মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিশাল জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পরবর্তী ১৯৯১ সালের সরকারের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তৎকালীন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ও বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যার ফলে প্রায় দুই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতিকে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ভবিষ্যৎ উপহার দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জাতীয় সংসদ থেকে পতিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো বিভেদ না রাখার ওপর জোর দেন তিনি। সংসদ নেতা বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক, কিন্তু বৈরিতা বা শত্রুতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও খেলাপি ঋণের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত ২০০১ সালের জুনে দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে জুলাই মাসে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। এরপর দেশের জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছিল এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মেয়াদে বিএনপির সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছেড়ে পালানোর আগ পর্যন্ত তাদের দুঃশাসন, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে।

ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক জালিয়াতির তথ্য ফাঁস করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালে পতিত সরকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ১১ শতাংশ দেখিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পরিচালনা করা ফরেনসিক অডিটে বেরিয়ে আসে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গৃহীত নানা কার্যকর পদক্ষেপের ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির দিকে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অতীতের মতো বর্তমান সরকারও দেশের এই খেলাপি ঋণের কলঙ্ক দূর করতে সক্ষম হবে।

বৈদেশিক ঋণের বোঝা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশ ছেড়ে অনেকে পালিয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া ঋণের দায়ভার দেশের সাধারণ জনগণের ওপর এসে পড়েছে। এই অবস্থায় ভঙ্গুর অর্থনীতি সত্ত্বেও বর্তমান বিএনপি সরকার বিগত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লক্ষ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত, ব্যাংক-বিমা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছিল। বর্তমানে দেশে একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে যেখানে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই স্বাধীনতার সুযোগে শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি তিনি বিশেষ অনুরোধ জানান।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও বক্তব্যের রুচিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে সংসদ নেতা প্রশ্ন তোলেন, যে ভাষা বা শব্দ পরিবারে ব্যবহারে আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, তা কেন আমরা জনপরিসরে ব্যবহার করব? রাজনৈতিক গালিগালাজের অপসংস্কৃতি বন্ধ করে একটি গঠনমূলক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে বিরোধী দলসহ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।

গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি হলে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি পুনরায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিন্নমত যেন শত্রুতার রূপ না নেয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ বা বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তাদের পথকেই সুগম করতে পারে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে সংসদ নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ জীবন দিয়েছেন, ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছেন। সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। তাই আসুন, সরকারি বা বিরোধী দল, সবাই মিলে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জনগণের সব গণতান্ত্রিক ও বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে, বাকস্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাকস্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।

সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পারিবারিক পরিবেশে আমরা যেসব শব্দ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, জনপ্রতিনিধি হয়েও কেন আমরা সেই শব্দগুলো জনপরিসরে ব্যবহার করব? কেন আমরা সেগুলো পরিহার করব না? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত না হয়। আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং একটি রুচিশীল সমাজ গঠন করি।

বক্তব্যের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর নিজস্ব বিভেদ ও বিরোধ মূলত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনর্জীবিত করার পথকে সুগম করতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধে ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

পরিশেষে সংসদ সফলভাবে পরিচালনার জন্য স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সকল সংসদ সদস্য, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কের মেঘনা নদীতে সেতু নির্মাণে আগ্রহী জাপানি প্রতিষ্ঠান

বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিবারই দেশকে সংকটমুক্ত করেছে : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৯:৪০:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

যখনই দেশের মানুষ অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিবারই দেশকে সংকট থেকে বের করে এনেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা (ফ্যাসিবাদ) শুধু লুটপাট ও অর্থ পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, খেলাপি ঋণের হিসাবেও জালিয়াতি করেছিল। ২০২৪ সালে তারা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল মাত্র ১১ শতাংশ। অথচ আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ফরেনসিক অডিটে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। তবে আমাদের সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে গত ৫ মাসে তা কমে ৩২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

তারেক রহমান বলেন, বিরোধীদলকে সঙ্গে নিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের কারণে যে সংকট, তাতে জনগণের ভোগান্তিতে সরকার সচেতন। তবে এটা বর্তমান সরকারের তৈরি নয়, এটা ফ্যাসিস্ট সরকারের তৈরি।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাস এবং বিদ্যুতের কারণে জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সচেতন। এই সমস্যা হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়নি।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস উত্তোলনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। এবং খুবই আশ্চর্যের বিষয়, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের ডানে এবং বামে যে প্রতিবেশী দেশগুলো আছে, তারা সমুদ্র থেকে গ্যাস আরোহণ করছে। কী এক অদৃশ্য ইশারায় বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলন করেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে বলে বিশেষ কোনো দেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তারা যাতে নির্বিঘ্নে গ্যাস নিয়ে যেতে পারে, সেই জন্যই বাংলাদেশের অংশে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস কূপ খনন করা হয়নি।

তিনি বলেন, অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যই ছিল আমাদের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। এমন পরিস্থিতিতেই সম্পূর্ণভাবেই দেশকে নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছিল জ্বালানি নির্ভর।

তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে, নির্বাচনের পরে সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরেই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল এবং গ্যাস আমদানি করা হতো, সে ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হলো। সব পত্র পত্রিকায়, সব ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতেই এই বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

সরকারপ্রধান বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই পরিস্থিতির ভেতরেই, আমাদের যে দুটি এফএসআরইউ আছে, তার একটিতে ইলেকট্রিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এবং সম্পূর্ণভাবে সেই এফএসআরইউতে গ্যাস সরবরাহ করতে সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে যায়। এটা একটা বাড়তি বিপদ। এ কারণেই বর্তমানে গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য জনগণকে এই ভোগান্তি, সমগ্র দেশের মানুষকে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

বিরোধীদলকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চায় বর্তমান সরকার, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংসদের কাছে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এই সমস্যার কারণে সমগ্র দেশের মানুষকে কিছু ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই জাতীয় সমস্যা সমাধানে তারা বিরোধীদলীয় বন্ধুদের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেছিলেন।

তবে সংকট সমাধানে রাজপথের কর্মসূচির কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অথচ আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কিনা।’

লংমার্চের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।

তিনি আরো বলেন, এই (জ্বালানি ও বিদ্যুতের) সমস্যা সমাধানে আমরা বিরোধীদলীয় বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। অথচ আমরা দেখলাম একটি বিশাল গাড়ি লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না!

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের পরে সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল এবং গ্যাস আমদানি করা হতো, সে ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হলো। সব পত্র-পত্রিকায়, সব আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেই এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই পরিস্থিতির ভেতরে আমাদের যে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে, এর মধ্যে একটিতে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিটে দুর্ঘটনা ঘটে। এর ফলে সেই এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এটা একটা বাড়তি বিপদ যোগ করল এই সমস্যার ক্ষেত্রে। এ কারণেই বর্তমানে গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য জনগণকে এই ভোগান্তি, সমগ্র দেশের মানুষকে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একটি কথা সবারই মনে আছে, তারপরেও একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—রাশিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের যখন শুরু হলো, সেই সময় সেই ২০২২ সাল, সেই যুদ্ধের অজুহাতে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করার জন্য তখন অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করে সকাল ৮টা থেকে ৩টা পর্যন্ত করা হয়েছিল। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্কুলগুলো একদিনের জায়গায় দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের লেনদেনের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়েছিল।

এসময় তিনি বলেন, আমি আগেই বলেছি, কোনো অজুহাত তুলে আমরা জনগণের দুর্ভোগের সমস্যার সমাধানকে এড়িয়ে যেতে চাই না।

জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এই সংসদ ভবনকে প্রধান প্ল্যাটফর্ম ও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং একইভাবে গত দুই বছর আগে একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই চলতি অধিবেশন সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।

তিনি বলেন, সংক্ষিপ্ত এই জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের বিদ্যমান নানা সংকট, জাতীয় উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের অপার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে। সংসদ কক্ষে উত্থাপিত প্রতিটি আলোচনা পুরোপুরি সফল কিংবা অর্থবহ হয়েছে এমন দাবি করা না গেলেও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এই সংসদ ভবনকে প্রধান প্ল্যাটফর্ম ও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অধিবেশনের সার্বিক কার্যকলাপে সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিল না বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের অখণ্ডতা ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যরা দল-মত নির্বিশেষে যেসব কার্যকর উদ্যোগ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন তা ইতিবাচক। এই গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় অধিবেশনকে সার্বিকভাবে সক্রিয় ও কার্যকর রাখতে উপস্থিত সকল সংসদ সদস্যদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে জাতীয় সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে সামনের দিনগুলোতেও সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে।

জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

সংকটময় এই মুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত লং মার্চ কর্মসূচির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে উসকানি না দিয়ে সংকট উত্তরণে সরকারের পাশে থাকা উচিত। লং মার্চ দিয়ে সংকট সমাধান হলে সরকারি দল সবার আগে লং মার্চ করতো। এসময় বিরোধী দলকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি বিএনপি সরকারের অতীত সাফল্য ও সংকট জয়ের নজির তুলে ধরে দ্রুত বর্তমান পরিস্থিতি সামলে ওঠার দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দুই বছর আগের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আজ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হতে যাচ্ছে। অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ কার্যকর আলোচনা করেছে। সংসদের প্রতিটি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে তা তিনি দাবি না করলেও সংসদকে দেশের সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সব সংসদ সদস্যের সদিচ্ছার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয় পক্ষই দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করার যে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিগত ২৪-এর আন্দোলন পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন-তাদের স্বপ্ন পূরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ-এই বিশ্বাস থেকে তিনি বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প কারখানা, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দুর্নীতির পাহাড় জমেছিল, যা বিরোধী দল ও গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর সবার জানা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে কোনো অজুহাত হিসেবে না দাঁড় করিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

সাম্প্রতিক সময়কার তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনের কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টাই করেনি। এমনকি বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গ্যাস আহরণ করছিল, তখন এক অদৃশ্য ইশারায় বাংলাদেশের অংশ থেকে গ্যাস কূপ খনন করা থেকে বিরত থাকা হয়, যাতে বিশেষ কোনো দেশ লাভবান হতে পারে। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশ সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়, যা তেল-গ্যাস আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে টার্মিনালটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে সংকট চরম আকার ধারণ করে।

জ্বালানি সংকটের এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলের বিশাল গাড়িবহর লং মার্চ কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে বা জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে কোনো অপচেষ্টা চালানো সমীচীন নয়। যদি গাড়ির লং মার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হতো, তবে সরকার নিজেই সবার আগে লং মার্চের আয়োজন করত।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, ব্যাংকের সময় হ্রাস বা স্কুলে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার নামে কুইক রেন্টাল বসিয়ে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রকে দেউলিয়া ও ঋণগ্রস্ত করেছিল, অথচ দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দেয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও কারিগরি দুর্যোগের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাকে উসকানিমূলক আচরণে রূপ দিলে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ দেওয়া ১৪০০ শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজার মানুষের ত্যাগ অবমূল্যায়িত হবে এবং পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র লাভবান হবে।

সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা এবং আশাবাদের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, ইতোমধ্যে সরকার সংকট সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংকট দূর হবে। ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে একটি স্বাবলম্বী উৎপাদক রাষ্ট্রে রূপান্তর করার বিশাল পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

অতীতের ঐতিহাসিক সাফল্যের নজির তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তখনই সংকট থেকে দেশকে বের করে এনেছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ খাদ্যে উদ্বৃত্ত ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল। তিনিই মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিশাল জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পরবর্তী ১৯৯১ সালের সরকারের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তৎকালীন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ও বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যার ফলে প্রায় দুই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতিকে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ভবিষ্যৎ উপহার দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জাতীয় সংসদ থেকে পতিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো বিভেদ না রাখার ওপর জোর দেন তিনি। সংসদ নেতা বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক, কিন্তু বৈরিতা বা শত্রুতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও খেলাপি ঋণের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত ২০০১ সালের জুনে দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে জুলাই মাসে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। এরপর দেশের জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছিল এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মেয়াদে বিএনপির সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছেড়ে পালানোর আগ পর্যন্ত তাদের দুঃশাসন, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে।

ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক জালিয়াতির তথ্য ফাঁস করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালে পতিত সরকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ১১ শতাংশ দেখিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পরিচালনা করা ফরেনসিক অডিটে বেরিয়ে আসে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গৃহীত নানা কার্যকর পদক্ষেপের ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির দিকে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অতীতের মতো বর্তমান সরকারও দেশের এই খেলাপি ঋণের কলঙ্ক দূর করতে সক্ষম হবে।

বৈদেশিক ঋণের বোঝা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশ ছেড়ে অনেকে পালিয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া ঋণের দায়ভার দেশের সাধারণ জনগণের ওপর এসে পড়েছে। এই অবস্থায় ভঙ্গুর অর্থনীতি সত্ত্বেও বর্তমান বিএনপি সরকার বিগত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লক্ষ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত, ব্যাংক-বিমা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছিল। বর্তমানে দেশে একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে যেখানে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই স্বাধীনতার সুযোগে শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি তিনি বিশেষ অনুরোধ জানান।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও বক্তব্যের রুচিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে সংসদ নেতা প্রশ্ন তোলেন, যে ভাষা বা শব্দ পরিবারে ব্যবহারে আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, তা কেন আমরা জনপরিসরে ব্যবহার করব? রাজনৈতিক গালিগালাজের অপসংস্কৃতি বন্ধ করে একটি গঠনমূলক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে বিরোধী দলসহ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।

গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি হলে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি পুনরায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিন্নমত যেন শত্রুতার রূপ না নেয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ বা বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তাদের পথকেই সুগম করতে পারে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে সংসদ নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ জীবন দিয়েছেন, ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছেন। সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। তাই আসুন, সরকারি বা বিরোধী দল, সবাই মিলে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জনগণের সব গণতান্ত্রিক ও বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে, বাকস্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাকস্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।

সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পারিবারিক পরিবেশে আমরা যেসব শব্দ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, জনপ্রতিনিধি হয়েও কেন আমরা সেই শব্দগুলো জনপরিসরে ব্যবহার করব? কেন আমরা সেগুলো পরিহার করব না? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত না হয়। আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং একটি রুচিশীল সমাজ গঠন করি।

বক্তব্যের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর নিজস্ব বিভেদ ও বিরোধ মূলত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনর্জীবিত করার পথকে সুগম করতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধে ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

পরিশেষে সংসদ সফলভাবে পরিচালনার জন্য স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সকল সংসদ সদস্য, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।