নিজস্ব প্রতিবেদক :
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (২৩ জুন) ঘিরে সম্ভাব্য নাশকতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
সোমবার (২২ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২ থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের কাছে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সোমবারই এ বিষয়ে আদেশ জারি হবে।
তিনি বলেন, “২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অন্যান্য সংস্থাকে সহযোগিতা করতে এক সপ্তাহের জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ সেনা মোতায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষার লক্ষ্যে ২২ জুন হতে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে অরাজকতা হতে পারে–এমন আলোচনা কয়েকদিন ধরেই ছিল। ২৩ জুন সামনে রেখে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ‘জরুরি বার্তা’ও পাঠানো হয়।
ওইদিন সারাদেশে পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতার’ পাশাপাশি ‘নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ নিতে নির্দেশনা দেয় সদর দপ্তর।
সেখানে বলা হয়, সেদিন দলটির কর্মীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে। এর ফলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে ‘সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে’। পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর ক্ষুব্ধ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ২৩ জুন ঘিরে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ মাঠে থাকবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
রোববার (২১ জুন) রাতে ডিএমপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশেষ এই দিনটি ঘিরে রাজধানীজুড়ে ২০০টির বেশি কৌশলগত স্থানে পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট ডিউটি পরিচালনা করা হবে। একই সাথে ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহানগরের সবকটি প্রবেশপথে কড়া চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার থাকবে, যাতে কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও নিটোল করতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকবে ডিএমপির বিশেষায়িত ইউনিটগুলোও। এর মধ্যে ডিবি এবং সিটিটিসি (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি যে কোনো ধরনের আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) ব্যাপক গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য মহানগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া ঢাকার ৪টি প্রধান কন্ট্রোলরুমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ফোর্স স্ট্যান্ডবাই বা রিজার্ভ রাখা হবে, যেন ডাক পাওয়া মাত্রই তারা অ্যাকশনে যেতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির ১৮ হাজারের বেশি অফিসার ও ফোর্স মাঠে থেকে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এই বিশাল নিরাপত্তা কর্মযজ্ঞ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশের সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরেজমিনে মাঠে উপস্থিত থেকে সার্বিক নিরাপত্তা ডিউটি তদারকি ও দিকনির্দেশনা দেবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দলটির পক্ষ থেকে মিছিল, শোডাউন বা অন্যান্য কর্মসূচি পালনের চেষ্টা হতে পারে। সরকার এসব কর্মসূচিকে বেআইনি হিসেবে বিবেচনা করছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। ২০২৫ সালের ১০ মে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়।
২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে কোনো কোনো সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে। এর ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
বিএনপি সরকারের আমলে গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন পায়। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















