নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক রয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চলতি এপ্রিলসহ আগামী দুই মাসে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই কথা বলেন।
যুগ্ম সচিব বলেন, ডিজেল নিয়ে আজকের দিনে আমি খুবই কমফর্টেবল। আমাদের এপ্রিল মাস তো বটেই, ইনশাআল্লাহ মে মাসেও কোনো সমস্যা নেই। এটা আগে কিন্তু বলিনি, আগে এপ্রিল মাস পর্যন্তই বলেছি।
ব্রিফিংয়ে জ্বালানি বিভাগের এই যুগ্ম সচিব উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান মজুত পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, সারাদেশে গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৯১৬ টি অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার ৫১০ টি মামলা করা হয়েছে। তিনি জানান, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯০০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে এবং ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যুগ্ম সচিব বলেন, সারাদেশে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ডিজেল উদ্ধারের পরিমাণ হচ্ছে ৩ লাখ ৬ হাজার লিটার, অকটেন উদ্ধার হয়েছে ৩৯ হাজার ৭৭৬ লিটার, পেট্রোল ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার, গত পরশুদিন চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার হয়েছে ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার ফার্নেস ওয়েল। তিনি বলেন, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সারাদেশে সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৬ লিটার অবৈধ মজুতকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
মনির চৌধুরী বলেন, আজকের দিনের মজুত পরিস্থিতি- টোটাল ডিজেলের আছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন আছে ৩১ হাজার ৮২১ টন। পেট্রোল আছে ১৮ হাজার ২১ টন। ফারনেস ওয়েল আছে ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, চট্টগ্রামে অবস্থিত একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি আমাদের একমাত্র পরিশোধনাগার। সেখানে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টনের মত ক্রুড ওয়েল এনে ওখানে পরিশোধন করা হয়। এবং এই রিফাইনারি থেকে সারা বছরে বাংলাদেশের যে তেল দরকার তার মাত্র ২০ শতাংশ সরবরাহ নেওয়া হয়।
যুগ্ম সচিব বলেন, এটা বন্ধ হয়ে গেলেও সরকারের কাছে আরও জ্বালানি তেলের বিকল্প আছে। কারণ সরকার সব সময় বিদেশ থেকে রিফাইন তেল আমদানি করে থাকে। তবে ইস্টার্ন রিফাইনারি এখনো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি। রিফাইনারির দুইটি ইউনিট এখনো চালু আছে। আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণদমে কাজ শুরু করতে পারবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
মনির চৌধুরী বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ক্রুড অয়েলের একমাত্র সোর্স যেটা হরমুজ দিয়ে আসে সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত থেকে। সৌদির আরামকো এবং আরব আমিরাত থেকে এআলফ এরাবিয়ান বাইট ক্রুট যেটা সেটা আমরা আনি। এনে আমাদের রিফাইনারিতে আমরা সেটা পরিশোধন করি। কিন্তু যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার পরে মার্চ মাসে আমাদের যে শিডিউলটা ছিল সেটা আমরা আনতে পারিনি। আর এপ্রিল মাসেও একই অবস্থা চলছে। কিন্তু ফরচুনেটলি আমাদের মোটামুটি আগের যে মজুত ছিল সেটা দিয়ে আমরা কন্টিনিউ করে যাচ্ছিলাম।
যুগ্ম সচিব বলেন, আমরা খুব সীমিত পর্যায়ে হলেও পরবর্তী যে চালানটা আমরা পাব আশা করছি আগামী ২০ তারিখ নাগাদ। তিনি বলেন, আমাদের ক্রুড ওয়েলের একটা জাহাজ সৌদি আরবের ইয়াম্বু বন্দর থেকে স্টার্ট করে লোহিত সাগর হয়ে ভিন্ন চ্যানেলে চলতি এপ্রিলের লাস্ট উইকে কিংবা মে মাসের এক দুই তারিখের মধ্যে এসে পৌঁছাবে। তো সে পর্যন্ত আমরা সীমিত পরিসরে আমাদের ইআরএলটাকে চালু রাখবো।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের মাধ্যমে একটু জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, ইআরএল (ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড)-এর বিষয়টা আমাদের জ্বালানি সরবরাহ চ্যানেলে খুব প্রভাব বিস্তার করে না। কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণ রিফাইন অয়েল আমাদের হাতে আছে। ইআরএলের কাজ রিফাইন করা। ফলে রিফাইনড অয়েল যখন আমার হাতে আছে ফলে ইআরএলের বিষয়টা আমাদের জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোন প্রভাব ফেলবে না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে তিনি বলেন সরকার জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এখনই দাম বাড়ানোর পক্ষে নয়।
পেট্রল পাম্পে ভিড় প্রসঙ্গে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, পেট্রোল পাম্পে অতিরিক্ত ভিড়-এই সমস্যা ঢাকার বাইরে নেই। ঢাকায় সমস্যাটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্যানিক বায়িংয়ের প্রয়োজন নেই। গত বছর একই সময়ে যে তেল পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেওয়া হয়েছে, এ বছরও পরিমাণের তেল দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ কোনোভাবেই কমানো হচ্ছে না। এতে তো সমস্যা হওয়ার কথা না।
কাঁচামালের অভাবে দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হওয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসলেও শোধনাগারটি এখনো লো-ফিডে বা সীমিত উৎপাদনে চালু আছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মার্চ ২০২৬ শিডিউলের ক্রুড অয়েল পার্সেল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারায় বর্তমানে ইআরএল লো-ফিডে চালু রাখা হয়েছে। তবে সরকার সূচি অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করছে এবং নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের একমাত্র রিফাইনারি ইআরএল জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রুড অয়েল স্বল্পতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হচ্ছে বিধায় লো-ফিডে ইআরএল চালু থাকলেও এর কোনো বিরূপ প্রভাব সরবরাহ চ্যানেলে পড়বে না। এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
মনির হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, দেশের মূল জ্বালানি তেল ডিজেলের মাত্র ১৫ শতাংশ এবং পেট্রলের ১১ শতাংশ ইআরএল থেকে পাওয়া যায়। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিশোধিত তেল আমদানি করে একদিকে ইআরএল থেকে প্রাপ্ত তেলের ঘাটতি যথাযথভাবে পূরণ করছে এবং অন্যদিকে সীমিত পর্যায়ে ইআরএলের উৎপাদনও অব্যাহত রেখেছে। ইআরএলের মোট ইউনিট সংখ্যা ৪টি। এর মধ্যে ২টি ইউনিট বর্তমানে মেইনটেন্যান্স এবং ২টি অপারেশনে আছে।’
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারি সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধন করে দেশের মোট বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদার ৫ ভাগের ১ ভাগ সরবরাহ করে, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন। বছরের শুরুতে নেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি মাসে সাধারণত ১/২টি কার্গো আমদানি করে ইআরএলের উৎপাদন অব্যাহত রাখে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী, অবশিষ্ট জ্বালানি তেল পরিশোধিত আকারে আমদানি করা হয়।
যুগ্মসচিব আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেল ৪৭ লাখ ৪২ হাজার টন বিক্রি হয়েছিল, যার মধ্যে ইআরএলের জোগান ছিল ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টন বা ১৫.৪৪ শতাংশ। পেট্রল বিক্রি হয়েছিল ৪ লাখ ৮৯ হাজার টন। সেখানে ইআরএলের জোগান ৫৮ হাজার ৩০৯ টন বা ১১.৯২ শতাংশ। আর অকটেন বিক্রি হয়েছিল ৪ লাখ ৩৭ হাজার টন। এখানে ইআরএল থেকে জোগান ছিল না। এর বাইরে ফার্নেস তেল, কেরোসিন ও বিটুমিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উপজাত হিসেবে ইআরএল থেকে পাওয়া যায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















