Dhaka মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুটহাট বাস ধর্মঘটে জিম্মি বাস মালিক ও যাত্রীরা

রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি :

আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। এরই মধ্যে অনেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে, শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হুটহাট রাজশাহী থেকে বাস চলাচল বন্ধের ঘটনায় অতিষ্ট যাত্রীরা। তারা বলছেন, পান থেকে চুন খসলেই বাস চলাচল বন্ধ করে দেন চালক-শ্রমিকরা। যাত্রীদের দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনার অন্ত নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে আন্তঃজেলা পরিবহন সংকটের নেপথ্যে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকে বন্ধ ছিল সব রুটের বাস। পরে রাত ১০টার দিকে আবারো শুরু বাস চলাচল। ফলে সারাদিন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ইচ্ছুক যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

গেল সেপ্টেম্বর থেকে চার দফায় বন্ধ ছিল বাস চলাচল। সেপ্টেম্বর মাসে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে দুই দফায় বাস চলাচল বন্ধ করা হয়। এপ্রিল মাসে নাটোরের মালিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে দুইদিন বাস চলাচল বন্ধ থাকে। সবশেষ সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত প্রায় ১৬ ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর শিরোইল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বাস ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে রওনা হয়। নগরীর ভদ্রা থেকে আন্তঃজেলা বাস ছাড়া হয়। এখান থেকেও প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাস ছেড়ে যায়। এছাড়াও নগরীর রেলগেট থেকে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০টির বেশি বাস ছেড়ে যায়। রাজশাহী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯০০টি বাস ছাড়ে। আর বাস বন্ধ হলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

সাইফুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, ‍সোমবার সকালে কাউন্টারে এসে শুনি বাস বন্ধ। সব রুটের বাস বন্ধ থাকায় ফেরত যেতে হচ্ছে। এটা চরম ভোগান্তির। অথচ আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

ঈদের ছুটি কাটাতে আগেভাগেই ময়মনসিংহ যাচ্ছিলেন রাবি শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন। তিনি বলেন, মেস থেকে এসে শুনি বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাউন্টারও দেখি বন্ধ। ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য বাস ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। এখন বাধ্য হয়ে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে।

গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রাহাত হোসেন বলেন, সোমবার ঢাকায় যাওয়ার কথা দোকানের পণ্য কেনার জন্য। কোরবানি ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এই ঈদের বেচাকেনা শেষ দিকে জমে ওঠে। আজকে কাউন্টারে এসে শুনি বাস বন্ধ। দিনটা নষ্ট হলো, আমার ব্যবসারও ক্ষতি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাস কোম্পানির ব্যবস্থাপক বলেন, শ্রমিকরা হুটহাট ধর্মঘট ডেকে বসেন। এতে মালিকদের বড় অংকের ক্ষতি হয়। কারণ বাস চললে লাভের দেখা মেলে। এছাড়া ঋণ আছে। আমাদের কোম্পানির প্রতিদিন ৩৫টি বাস ছাড়া হয়। এর মধ্যে এসি-নন এসি দুই বাসই চলে। আমাদের বাসেই প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ রাজশাহী-ঢাকা যাওয়া আসা করেন।

দেশ ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারি বজলুর রহমান রতন বলেন, আমাদের সব মালিকদের গাড়ি ঋণে নেওয়া। প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করেই এই ঋণ শোধ করতে হয়। আমরাও শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে বিড়ম্বনায় পড়ছি। তাদের বুঝিয়েও কাজ হচ্ছে না। এর পেছনে বড় কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে। কারণ এরা কথায় কথায় বাস বন্ধ করে দিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েজন শ্রমিক জানান, রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি ও মোমিনুল ইসলাম মোমিনকে সাধারণ সম্পাদক করে রোববার রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এই কমিটি ঘোষণা করে। এই কমিটি বাতিলের দাবি জানায় শ্রমিকদের একটি অংশ।
তারা নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটির দাবি করেন। নতুন কমিটি গঠনের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে রাজশাহী থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা।

এদিকে, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিরোইলে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ঘোষিত কমিটি বাতিল করেন। ঈদের পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানালে শ্রমিকরা ধর্মঘট তুলে নেন।

স্থগিত হওয়া রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, মন্ত্রী এবং স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ্রীয় ফেডারেশন এই কমিটি ঘোষণা করেছিল। কমিটিতে কিছু শ্রমিক বাদ পড়েছে। তারাই বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি সমঝোতা করার জন্য সোমবার দুপুরে ডিসি অফিসে বসেছিলাম কিন্তু একটি পক্ষ নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল। রাতে ডিসি শিরোইলে গিয়ে সব শ্রমিককে আশ্বস্ত করলে তারা কর্মবিরতি তুলে নিয়েছে।

জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুপুরে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করি। শ্রমিকদের একটি পক্ষ নির্বাচন চাচ্ছিলেন। তাই তাদের দাবি মেনে নিয়ে ঘোষিত কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। ঈদের পর তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করা হবে। এতে শ্রমিকরা এক মত হয়েছেন। এরপর বাস চলাচল শুরু হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

আবহাওয়া

চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন থেকে কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার

হুটহাট বাস ধর্মঘটে জিম্মি বাস মালিক ও যাত্রীরা

প্রকাশের সময় : ১১:৩৩:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি :

আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। এরই মধ্যে অনেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে, শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হুটহাট রাজশাহী থেকে বাস চলাচল বন্ধের ঘটনায় অতিষ্ট যাত্রীরা। তারা বলছেন, পান থেকে চুন খসলেই বাস চলাচল বন্ধ করে দেন চালক-শ্রমিকরা। যাত্রীদের দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনার অন্ত নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে আন্তঃজেলা পরিবহন সংকটের নেপথ্যে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকে বন্ধ ছিল সব রুটের বাস। পরে রাত ১০টার দিকে আবারো শুরু বাস চলাচল। ফলে সারাদিন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ইচ্ছুক যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

গেল সেপ্টেম্বর থেকে চার দফায় বন্ধ ছিল বাস চলাচল। সেপ্টেম্বর মাসে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে দুই দফায় বাস চলাচল বন্ধ করা হয়। এপ্রিল মাসে নাটোরের মালিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে দুইদিন বাস চলাচল বন্ধ থাকে। সবশেষ সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত প্রায় ১৬ ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর শিরোইল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বাস ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে রওনা হয়। নগরীর ভদ্রা থেকে আন্তঃজেলা বাস ছাড়া হয়। এখান থেকেও প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাস ছেড়ে যায়। এছাড়াও নগরীর রেলগেট থেকে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০টির বেশি বাস ছেড়ে যায়। রাজশাহী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯০০টি বাস ছাড়ে। আর বাস বন্ধ হলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

সাইফুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, ‍সোমবার সকালে কাউন্টারে এসে শুনি বাস বন্ধ। সব রুটের বাস বন্ধ থাকায় ফেরত যেতে হচ্ছে। এটা চরম ভোগান্তির। অথচ আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

ঈদের ছুটি কাটাতে আগেভাগেই ময়মনসিংহ যাচ্ছিলেন রাবি শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন। তিনি বলেন, মেস থেকে এসে শুনি বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাউন্টারও দেখি বন্ধ। ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য বাস ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। এখন বাধ্য হয়ে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে।

গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রাহাত হোসেন বলেন, সোমবার ঢাকায় যাওয়ার কথা দোকানের পণ্য কেনার জন্য। কোরবানি ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এই ঈদের বেচাকেনা শেষ দিকে জমে ওঠে। আজকে কাউন্টারে এসে শুনি বাস বন্ধ। দিনটা নষ্ট হলো, আমার ব্যবসারও ক্ষতি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাস কোম্পানির ব্যবস্থাপক বলেন, শ্রমিকরা হুটহাট ধর্মঘট ডেকে বসেন। এতে মালিকদের বড় অংকের ক্ষতি হয়। কারণ বাস চললে লাভের দেখা মেলে। এছাড়া ঋণ আছে। আমাদের কোম্পানির প্রতিদিন ৩৫টি বাস ছাড়া হয়। এর মধ্যে এসি-নন এসি দুই বাসই চলে। আমাদের বাসেই প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ রাজশাহী-ঢাকা যাওয়া আসা করেন।

দেশ ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারি বজলুর রহমান রতন বলেন, আমাদের সব মালিকদের গাড়ি ঋণে নেওয়া। প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করেই এই ঋণ শোধ করতে হয়। আমরাও শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে বিড়ম্বনায় পড়ছি। তাদের বুঝিয়েও কাজ হচ্ছে না। এর পেছনে বড় কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে। কারণ এরা কথায় কথায় বাস বন্ধ করে দিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েজন শ্রমিক জানান, রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি ও মোমিনুল ইসলাম মোমিনকে সাধারণ সম্পাদক করে রোববার রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এই কমিটি ঘোষণা করে। এই কমিটি বাতিলের দাবি জানায় শ্রমিকদের একটি অংশ।
তারা নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটির দাবি করেন। নতুন কমিটি গঠনের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে রাজশাহী থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা।

এদিকে, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিরোইলে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ঘোষিত কমিটি বাতিল করেন। ঈদের পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানালে শ্রমিকরা ধর্মঘট তুলে নেন।

স্থগিত হওয়া রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, মন্ত্রী এবং স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ্রীয় ফেডারেশন এই কমিটি ঘোষণা করেছিল। কমিটিতে কিছু শ্রমিক বাদ পড়েছে। তারাই বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি সমঝোতা করার জন্য সোমবার দুপুরে ডিসি অফিসে বসেছিলাম কিন্তু একটি পক্ষ নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল। রাতে ডিসি শিরোইলে গিয়ে সব শ্রমিককে আশ্বস্ত করলে তারা কর্মবিরতি তুলে নিয়েছে।

জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুপুরে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করি। শ্রমিকদের একটি পক্ষ নির্বাচন চাচ্ছিলেন। তাই তাদের দাবি মেনে নিয়ে ঘোষিত কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। ঈদের পর তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করা হবে। এতে শ্রমিকরা এক মত হয়েছেন। এরপর বাস চলাচল শুরু হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।