নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ১৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ কোটি টাকায় উন্নীত করার বিষয়টিকে গর্হিত ও ন্যক্কারজনক বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে ধর্মমন্ত্রীর পক্ষে জবাব দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলামের নাম ভাঙিয়ে যারা এই অপকর্ম করেছে, তাদের চিহ্নিত করতে প্রতিটি মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ ও ব্যয় নিয়ে আলাদাভাবে তদন্ত পরিচালনা করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হবে।
সংসদে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদীন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে অর্থ লোপাটের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। মসজিদের নামে করা এসব অনিয়ম কেবল দুর্নীতির নয়, বরং ধর্মীয় অবমাননার শামিল। তিনি উল্লেখ করেন, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের শ্বেতপত্রেও মেগাপ্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সময় ও ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে লুটপাট করা হয়েছে। মডেল মসজিদের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ তদন্ত প্রক্রিয়ায় সরকারের অন্যান্য সংস্থাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে তিনি জানান।
এ সময় জয়নুল আবদীন ফারুক অভিযোগ করে বলেন, অধিকাংশ মডেল মসজিদ মানসম্মতভাবে নির্মিত হয়নি এবং নির্মাণের পরপরই অনেকগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তার নিজের নির্বাচনী এলাকা সেনবাগের মডেল মসজিদের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে মসজিদে প্রবেশ করাই দায় এবং ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। একই সুর শোনা যায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের কণ্ঠেও। নিজের এলাকার দুর্গাপুর মডেল মসজিদের দুরবস্থার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, দুর্গম স্থানে মসজিদ তৈরি করে সেটিকে স্থানীয়দের কাছে তাজমহল হিসেবে হাস্যরসে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে পৌঁছাতে এখন নতুন করে ব্রিজের প্রয়োজন পড়ছে।
এদিকে, একই অধিবেশনে নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়কুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইত এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতাদের চলমান কর্মসূচির আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। এরইমধ্যে ১৩ হাজার ৯৪৯ জনের অনুকূলে সম্মানী দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফজ্জল হোসাইন (কায়কোবাদ) জানান, দেশে বর্তমানে ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫০ দশমিক ৯৮ একর নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, যার মধ্যে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে ২৭ দশমিক ৫৩ একর সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের কাজের পরিধি ও নির্বাচনী এলাকা নিয়ে বিরোধী দল সমালোচনা করেছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে সরকারের নীতিগত অবস্থান এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সরকারি দলের একজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বক্তব্য দেওয়ার সময় দুটি সংসদীয় আসনকে তার ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় যাওয়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এমন প্রচার চালানো হচ্ছে যে, নির্বাচিত মূল এমপি সেখানে বড় বিষয় নন, বরং সংরক্ষিত আসনের এমপিই সেখানকার সব কাজ পরিচালনা করবেন। একই বিষয়ে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর আগের বক্তব্যের মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে দাবি করে আখতার হোসেন প্রশ্ন তোলেন, এই অতিরিক্ত দায়িত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি এবং এর আওতা আসলে কতটুকু। শুধুমাত্র বিরোধী দলের জেতা আসনগুলোতেই কেন এই ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি জানতে চান এর মাধ্যমে দেশে কোনো ভিন্ন একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে কি না। এই সামগ্রিক বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি।
বিরোধী দলীয় সদস্যের এই গুরুতর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাঁড়িয়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্পষ্ট করেন। মন্ত্রী জানান, উত্থাপিত বিষয়টি আজ পয়েন্ট অব অর্ডার না হলেও এর একটি জরুরি এবং সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এই মহান জাতীয় সংসদ ৩০০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এবং এর অতিরিক্ত আরও ৫০ জন সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য নিয়ে সংসদ গঠিত হবে। ৩০০ আসনের ক্ষেত্রে ডিলিমিটেশন অ্যাক্ট বা সীমানা নির্ধারণ আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট আঞ্চলিক এলাকা বা সীমানা প্রযোজ্য হলেও সংরক্ষিত আসনের মহিলা সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে তা খাটবে না। সংরক্ষিত আসনে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের নির্বাচনী এলাকা বা লিমিটেড এরিয়া হচ্ছে সমগ্র বাংলাদেশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য যদি নিজের বক্তব্য দিয়ে নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ বা লিমিটেড করে ফেলেন, তবে তা মোটেও সঠিক নয়। তাদের বলা উচিত যে তারা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য নির্বাচিত। আইন ও বিধি অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে সমস্ত সরকারি বরাদ্দ পান, তা তারা বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে উপ-বরাদ্দ দিতে পারেন। দেশের যেকোনো অঞ্চলেই তারা এই বরাদ্দ বণ্টন করতে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সমগ্র বাংলাদেশের সমস্ত অধিক্ষেত্রে তারা তাদের সংসদীয় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সুনির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা দায়িত্বের যে কথা বলা হচ্ছে, তা সংবিধান বা আইন অনুযায়ী তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















