নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভ্রান্তি ও হঠকারিতার রাজনীতি ছেড়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাস্তায় বসে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা তৈরির রাজনীতি ছেড়ে জনগণের জন্য কাজ করুন। আপনাদের কাছে যদি জ্বালানি বা বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকে, তবে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন। যদি আপনাদের পরিকল্পনা ৬ মাসের মধ্যেও সমস্যার সমাধান করতে পারে, তবে সরকার তা সানন্দে বাস্তবায়ন করবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে দুস্থ, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের মধ্যে চেক বিতরণ এবং দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বিভ্রান্তির রাজনীতি স্বৈরাচার করে গেছে, মিথ্যের রাজনীতি স্বৈরাচার করে গেছে, ভাঙচুরের রাজনীতি স্বৈরাচার করে গেছে, আপনারা জনগণের সামনে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, জনগণের জন্য কাজ করবেন। আপনারা জনগণের সামনে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, আপনারা দেশ গঠনের জন্য কাজ করবেন। কাজেই সেইসব বিভ্রান্তির রাজনীতি বাদ দেন, সেইসব হঠকারিতার রাজনীতি বাদ দেন। আসেন জনগণের জন্য কী করতে পারবেন কী পরামর্শ আপনাদের থলের মধ্যে আছে সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরেন। কী পরিকল্পনা আপনাদের মাথার মধ্যে আছে যা জনগণের উপকার করবে, যা দেশের মানুষের উপকার করবে, সেটি জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। রাস্তায় বসে ভাঙচুর করা রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করার দিন শেষ, সেই রাজনীতি শেষ, জনগণ এখন সেই রাজনীতি আর সমর্থন করে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই নেতাদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, যারা মঞ্চে বসে পিছনে ফ্যানের বাতাস খেয়েছে, সামনে হারিকেন রেখেছে। সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করছে। বিএনপির পরিকল্পনা রয়েছে, জনগণের জন্য কীভাবে আমরা এই জ্বালানি সমস্যার সমাধান করব, ইনশাআল্লাহ আগামী ২৭ তারিখে শুরু হবে সংসদ অধিবেশন। সেই সংসদেই আমরা বাংলাদেশের জনগণের সামনে উপস্থাপন করব, আগামী ১০ বছর আমরা কীভাবে এই দেশের মানুষের জন্য জ্বালানি সমস্যার সমাধান করব, সেই পরিকল্পনা দেব।
তিনি বলেন, আজকে এই সকল রাজনৈতিক দলকে পরিষ্কারভাবে আমি বলতে চাই, আপনারা যদি মনে করেন- অতই জনগণের প্রতি আপনাদের দায়িত্ব আছে, তাহলে আপনাদের পরিকল্পনা নিয়ে আসুন জনগণের সামনে, আপনাদের পরিকল্পনা যদি আগামী তিন মাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে, তাহলে আমি আপনাদের পরিকল্পনাই গ্রহণ করব। তাদের প্রতি আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। যেই বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে, যেই গ্যাসের সমস্যা রয়েছে, সেইটি সমাধানের জন্য তারা যদি সরকার থেকে ভালো কোনো পরিকল্পনা নিয়ে আসতে পারে যে পরিকল্পনা আগামী তিন মাসের মধ্যে, বাদ দেন তিন মাস আরও তিন মাস আমি তাদেরকে দিলাম, যদি ছয় মাসের মধ্যেও তারা সমস্যার সমাধান করতে পারে তাহলে তাদের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন করব। আর যদি তারা শুধুমাত্র জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য দেশকে বিভ্রান্ত করার জন্য এইসব কথা বলে থাকে তাহলে অবশ্যই তাদেরকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমালোচনা করা খুবই সহজ কাজ। মানুষের জন্য কাজ করুন দেশের জন্য কাজ করুন। সঠিক কথা বলুন, এমন কোনো কথা বলবেন না, যেই কথা বললে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, এমন কোনো কাজ করবেন না, যে কথা বললে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় রাজপথে, কারণ স্বৈরাচার বসে আছে। স্বৈরাচারের সাথে বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রত্যেকটি নেতাকর্মী যুদ্ধ করে টিকে ছিল, এই রাজপথেই তারা টিকে ছিল। আর কোনো রাজনৈতিক অন্য যারা ছিল তারা আমাদের সাথে ছিল। যারা আজকে গলা উঁচু করে কথা বলছে, যারা আজকে বিশৃঙ্খল কথা বলছে, বিভ্রান্তিকর কথা বলছে- ১৭ বছর মানুষ আপনাদেরকে রাজপথে দেখতে পায় নাই।
তিনি বলেন, এইসব বিভ্রান্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসুন, এইসব মিথ্যার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসুন, এইসব উসকানি দেওয়ার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসুন। সত্যিকারভাবে জনগণের কাজ হতে পারে, সত্যিকারভাবে দেশ এগিয়ে যেতে পারে এরকম যদি কোনো পরিকল্পনা আপনাদের কাছে থাকে, এরকম যদি কোনো চিন্তাভাবনা আপনাদের কাছে থাকে, সংসদে উপস্থাপন করুন, জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন। সেই পরিকল্পনা যদি ভালো হয়, সেই পরিকল্পনা যদি বাস্তবসম্মত হয়, সেই পরিকল্পনা যদি দেশ এবং দেশের মানুষের উপকার করে অবশ্যই আমরা সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।
দেশে লোডশেডিংয়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সব ঠিক থাকলে কয়েকদিনের মধ্যে গ্যাস সংকট কেটে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। আর তখন বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ সমালোচনাকারীদের একহাত নিলেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পেছনে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে, হাতে হারিকেন নিয়ে বসে বলছে ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে’; এগুলো হঠকারিতা। তাদের বন্ধুরাই ক্ষমতায় ছিল, অন্তবর্তীকালীন সরকার এলএনজি টার্মিনাল বসানো বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার দেশে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল বানানোর চেষ্টা করছে, এজন্য সময় লাগবে। সংকট সমাধানে সরকার চীন ও মালয়েশিয়ার সাথে কথা বলেছে।
বিরোধীদলকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের সমাধান যদি বিরোধী দল দিতে পারে, সেগুলো সরকার গ্রহণ করবে। যদি না পারে, তাহলে বিভ্রান্তির রাজনীতির জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে তাদের। বিভ্রান্তি, হঠকারী রাজনীতি বাদ দেন। জনগণের উপকার হবে সেই রকম পরিকল্পনা থাকলে উপস্থাপন করুন। রাস্তায় বসে ভাঙচুরের রাজনীতির দিন শেষ।
‘সমালোচনা করা খুবই সহজ কাজ, মুরদ থাকলে কোদাল হাতে মাঠে নামুন, জনগণের জন্য কাজ করুন। এমন কথা বলবেন না, যাতে দেশে বিশৃঙ্খলা হয়। যারা আজ বড় বড় কথা বলছে, সতেরো বছর জনগণ আপনাদের রাজপথে দেখেনি। পত্রিকা বের করুন, আমাদের দলের নেতাকর্মীরা কীভাবে সতেরো বছর নির্যাতন সহ্য করেছে দেখুন’ যোগ করেন তারেক রহমান।
বিরোধী দলের আরও সমালোচনা করে তিনি বলেন, ’৭১, ’৮৬, ’৯৬-এ ভুল করেছেন। ’২৪-এ টিকিট বিক্রি করে ভুল করেছেন। এখন উসকানি, বিভ্রান্তির রাজনীতি পরিহার করুন। মানুষ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায়। এগিয়ে যেতে হলে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত শ্রমিকের হাতে রূপ দিতে হবে। আমি কী পেলাম সেটা বড় নয়, বরং জনগণের জন্য কী করতে পারলাম, সেটাই বড়। দেশ গঠনে যেই পথ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দেখিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করতে হবে।
নিজের সরকারের প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, একটি শিশু হাঁটতেও এক বছর সময় লাগে। বর্তমান সরকারের সরকারের বয়স মাত্র ৬ মাস। ক্ষমতায় এসে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা শুরু করেছে সরকার।
আওয়ামী লীগের শাসনামল নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ছিল সমালোচনার ঝাঁজ। তিনি বললেন, ফ্যাসিবাদী সরকার মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে মেগা দুর্নীতি করেছে। দেশকে ফোকলা বানিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে তিন লাখ দেনা করে গেছে। বিদ্যুতে কষ্ট পাচ্ছে মানুষ, গ্যাসের কষ্ট হচ্ছে। দেশের নিজস্ব গ্যাস ছিল, কিন্তু তারা নতুন কূপ খনন করেনি। বরং বিদেশিদের হাতে এই সেক্টর তুলে দিয়েছে। একটি দেশের জন্য স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
একাত্তরে স্বাধীন হলেও দেশে গণতন্ত্র হোঁচট খায়। গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহিতা থাকবে। যে সকল কাজ করলে দেশ ও মানুষের উপকার হবে, সরকার তাই করবে বলে স্পষ্ট করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চীনের সঙ্গে ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তৃতীয় জাহাজটি চলে এলে গ্যাসের সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। তবে জাহাজ তৈরিতে সময় লাগে বিধায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
পত্রিকার পাতা খুঁজলেই বিগত দিনে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর গুম, খুন ও নির্যাতনের চিত্র উঠে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় বসে ভাঙচুর করা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করার দিন শেষ। জনগণ এখন সেই রাজনীতি আর সমর্থন করে না। মুরোদ থাকলে শার্টের হাতা গুটিয়ে, কোদাল হাতে মাঠে নামুন, মানুষের জন্য কাজ করুন।
অনুষ্ঠানে দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের ৫০৩টি উপজেলার প্রত্যেকটি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মা ও শিশুরা নিজ নিজ এলাকায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, অতীতে স্বাস্থ্যসেবা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, যাতে মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য হয়। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শুধু শ্রমিকের হাত নয়, দক্ষ কর্মীর হাতে রূপান্তর করতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, আমি নিজে কী পেলাম, সেটি বড় কথা নয়; আমি দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কী করতে পারলাম সেটিই বড় সার্থকতা।
বক্তব্যের শেষে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের পথ ধরে বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ ব্যক্ত করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















