নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১৯ এপ্রিল) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে নেত্রকোণা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সংসদ সদস্য তার প্রশ্নে অভিযোগ করেন, সরকারিভাবে সংকট নেই বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ২০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না এবং মোটরসাইকেলে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে পুনরায় তেল নেওয়া প্রতিরোধ করা হচ্ছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় চলতি মার্চ ২০২৬ মাসেও সমপরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে এই কৃত্রিম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া জনমনে ভীতি ও অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পাম্পে মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়া বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই।
সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম সংকট নিরসনে ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিপিসি কর্তৃক ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। অবৈধ মজুতকারীদের ধরতে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় এবং ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। মজুত ও কালোবাজারি প্রতিরোধে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিপণনে অধিকতর স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সফল হলে দেশব্যাপী তা বাস্তবায়ন করা হবে। এই ফুয়েল কার্ডে গ্রাহকদের জ্বালানি তেল সংগ্রহের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের (পাবনা-৫) এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ জারি করা হয়েছিল। এই আইনের আওতায় কোনও ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা ক্রয় প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অযাচিত প্রস্তাব অনুমোদনের সুযোগ তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, এই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বিদ্যুতের অন্যায্য মূল্য এবং অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হতো। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও জড়িত ছিলেন। এতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিতর্কিত বিশেষ বিধান আইনটি বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। অধ্যাদেশটি গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়েছে। এর ফলে আগের মতো স্বেচ্ছাচারী প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলেও মন্ত্রী জানান।
বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুদ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমানে কম-বেশি দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের ভিত্তিতে আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি জানান, পেট্রোবাংলার কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের মহাপরিকল্পনার আওতায় মোট ৫০ ও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ২৬টি কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কূপগুলোর কাজও বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান আছে। এ ছাড়া সাইসমিক সার্ভে সম্পর্কিত মন্ত্রী জানান, বাপেক্সের মাধ্যমে ব্লক-৭ ও ৯ এ ৩৬০০ কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক ডাটা আহরণ শেষ হয়ে ডাটা প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে।
পাশাপাশি বিজিএফসিএলর মাধ্যমে হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনার ১৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক ডাটা আহরণ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া বাপেক্স ও এসজিএফএলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরো বিপুল পরিমাণ ৩ডি সাইসমিক জরিপ সম্পাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধে আওতাধীন বিতরণকারী সংস্থা, কোম্পানিগুলো মাঠ পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা সত্ত্বেও অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
সরকারের নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ ও নিয়মিত নিবিড় তদারকি কার্যক্রমের ফলে দেশে অবৈধভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার, বিদ্যুতের অপচয় ও অপব্যবহার বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার, মিটার টেম্পারিং, মিটার বাইপাস, হকিং ইত্যাদির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং নিজস্ব জনবল দ্বারা ঝটিকা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ অবৈধ ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, দেশে অবৈধভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার রোধকল্পে গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো– নিজস্ব জনবল দ্বারা বিশেষ টিম গঠন করে নিয়মিত ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রম। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়মিতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, জরিমানা আদায় ও বিদ্যুৎ আইন মোতাবেক শাস্তি আরোপ। অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ। অবৈধ সংযোগ নিরূপণের লক্ষ্যে মিটার চেকিং কার্যক্রম। ফিডার ভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবহার মনিটরিংয়ের জন্য অটোমেটেড মিটার রিডিং মিটার স্থাপন।
মন্ত্রী জানান, বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার ও অপচয় রোধে গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত গণশুনানি/গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা ও লিফলেট বিতরণ করা হয়ে থাকে। এছাড়া মাইকিং করে এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়া, ওয়েবসাইট ও মসজিদের ইমামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গ্রাহকগণকে অবৈধ সংযোগ গ্রহণে ঝুঁকি, শাস্তি ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধের বিষয়ে সচেতন করা হয়। বিদ্যুৎ বিল বিগত মাসের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম হলে সংযোগের সার্বিক বিষয়গুলো সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পোস্ট পেইড মিটার পরিবর্তন করে ডিজিটাল ও প্রি-পেইড, স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হবে।
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন-এর লিখিত প্রশ্নের বিদ্যুৎ খাতের এই আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
তিনি বলেন, দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিদ্যুৎ আমদানিসহ সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, এই বিশাল বকেয়ার মধ্যে গ্যাস ও জ্বালানি তেলভিত্তিক আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ বকেয়া ১৭,৩৫৭.৬৮ কোটি টাকা। এছাড়া জয়েন্ট ভেঞ্চার ও আইপিপি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লার মূল্য ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ বকেয়া রয়েছে ১৫,৪৫২.৯১ কোটি টাকা। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার কাছে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির গ্যাস বিল বকেয়া বাবদ পাওনা ১১,৬৩৪.০৬ কোটি টাকা। সরকারি কোম্পানির ক্যাপাসিটি ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ বকেয়া ৫,৬২৩.০৩ কোটি টাকা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বকেয়া ৩,৮৯১.৫৫ কোটি টাকা। এছাড়াও হুইলিং চার্জ বাবদ বকেয়া রয়েছে ১৯৮.৯৪ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, বকেয়া বিলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে তাদের ব্যাংক ঋণ। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৪৯,৩১১.২৬ কোটি টাকা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















