নিজস্ব প্রতিবেদক :
বর্তমান সরকারের মেয়াদে গত ৪২ দিনে দেশে কোনো ক্রসফায়ার বা গুমের ঘটনা ঘটেনি বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, এই সরকার মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং পূর্ববর্তী সময়ের মতো কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেবে না।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’ উত্থাপনের পর বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর আপত্তির জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের বয়স প্রায় ৪২ দিন। সরকার চাইলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করতে পারত। কিন্তু এই ৪২ দিনে বাংলাদেশের একটি মানুষও ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি, একটি মানুষও গুমের শিকার হয়নি। মানবাধিকারের রেকর্ডই বলে দিচ্ছে আমরা কোন পথে হাঁটছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার সবচেয়ে বড় পরিবার হলো জিয়া পরিবার ও বিএনপি পরিবার। আমাদের সামনে যারা বসে আছেন, তাদের অনেকেই গত ১৭ বছর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মা-বোনকে জায়নামাজে বসে সন্তানের প্রতীক্ষায় চোখের জল ফেলতে হোক।
মানবাধিকার কমিশন বিলের বিষয়ে মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল, যাতে অনেক আইনি অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ১৬ নম্বর ধারায় ক্ষতিপূরণ বা জরিমানার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট গাইডলাইন নেই। তাই স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী আইন করার লক্ষ্যেই ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আর এই অন্তর্বর্তী সময়ে দেশে যাতে মানবাধিকার কমিশনের আইনি শূন্যতা তৈরি না হয়, সেজন্যই সাময়িকভাবে ২০০৯ সালের আইনটি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি। হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যকে রাজনৈতিক ময়দানের জন্য ‘জুসি’ বা রসালো আখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য সবকিছুই পড়েছেন, কিন্তু প্রস্তাবিত বিলের প্রথম লাইনটিই সম্ভবত এড়িয়ে গেছেন।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য খুব সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছেন। উনার এই বক্তব্যগুলো পল্টন ময়দান, প্রেস ক্লাব বা রাজপথের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও ‘জুসি’। তবে, সংসদে বিল পাসের ক্ষেত্রে আইন গভীরভাবে পাঠ করা জরুরি। আমার মনে হয় উনি সব পড়েছেন, শুধু মূল বিলটা পড়েননি।’
২০২৫ সালের অধ্যাদেশটির সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই অধ্যাদেশটি একটি ভিন্ন উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এর ১৬ নম্বর ধারাটি পড়লে দেখা যাবে, এটি ভিকটিমের জন্য আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমান। এতে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই। এমন অস্পষ্ট আইন জনস্বার্থবিরোধী।’
২০২৫ সালের অধ্যাদেশটির সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, “এই অধ্যাদেশটি একটি ভিন্ন উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এর ১৬ নম্বর ধারাটি পড়লে দেখা যাবে, এটি ভিকটিমের জন্য আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমান। এতে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই। এমন অস্পষ্ট আইন জনস্বার্থবিরোধী।”
বর্তমান সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের বয়স মাত্র ৪২ দিন। এই অল্প সময়ে একজন মানুষও ক্রসফায়ার বা গুমের শিকার হয়নি। আমরা চাই না দেশে আর কোনো গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি বজায় থাকুক।
সংসদের অধিবেশনে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রোহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ উত্থাপনের পর বিরোধীদলের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের বিরোধিতা করে দেওয়া বক্তব্যের পর মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্টে ভালো বিচার হোক, আমরা চাই সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক এবং বাংলাদেশের বিচার বিভাগ পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করুক।
আইনমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন নিয়োগ হয়েছে অতীতে, বিশেষ করে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আমলে, নিয়োগে পার্টির ক্যাডারদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে নিয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে খায়রুল হকের জন্ম হয়েছে। যে নিয়োগের মাধ্যমে আমার বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে হৃদপিণ্ড সুপ্রিম কোর্টের প্রধান, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির বাড়িতে আক্রমণের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাই আমরা চাই সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা আরও স্বচ্ছ হোক। আমরা চাই সুপ্রিম কোর্টে ভালো বিচার হোক, সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করুক। এই আইনটায় যে ডিফেক্টটা আছে সেটা আমি বলব অধ্যাদেশে। উনি বলেছেন, আমি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ওই সময় এই আইনকে ডিফেন্ড করেছি। একজন রাষ্ট্রের আইনজীবী সরকারের ব্রিফ ক্যারি করেন, ইনস্ট্রাকশন ফলো করেন। আমি যখন কথা বলি আদালতে অ্যাটর্নি হিসেবে তখন সরকারের কথা বলি, সরকার আমার মক্কেল, মক্কেলের কথা বলি। আমি আমার মক্কেলের পক্ষে কথা বলেছি। ওই সরকারের পাবলিক পলিসি হলো প্রত্যেকটা আইন—একটা পাবলিক পলিসি। ওই সরকারের পাবলিক পলিসি ছিল এই অধ্যাদেশ জারি করা। সেই পাবলিক পলিসি সরকারের, যেটা আমার মক্কেলের পক্ষে কথা বলেছি। আমি এখন এই সরকারের মন্ত্রী, এই পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য। আমার সরকারের পাবলিক পলিসি হলো বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণরূপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, যোগ্যতার মানদণ্ড নিরূপণের জন্য আমরা নতুন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
আইনমন্ত্রী বলেন, যে অধ্যাদেশের কথা ওনারা বলছেন, অধ্যাদেশের ডিফেক্টটা কোথায় শুনবেন? উনি আর্টিকেল ৯৫(সি) পড়েছেন। ৯৫(২)(সি)-তে বলা হচ্ছে যে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট আইন পাস করতে পারবে। অ্যাবসলিউটলি, কিন্তু ৯৫(১) পড়েননি উনি। ৯৫(১)-এ বলছে, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। তাহলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে যে আইনটা করা হয়েছে, এখানে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে জায়গাটা কনস্টিটিউশনালি ফিট করছে। আর্টিকেল ৯৮-টা পড়েন সংসদ সদস্য। ৯৮-এ কিন্তু এই কথা বলা নেই। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শেরও দরকার নেই। অস্থায়ী বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শের কোনো প্রয়োজনও নেই। ৯৮-টা দেখেন কনস্টিটিউশনে, সেখানে বলা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করবেন অস্থায়ী ভিত্তিতে। আমাদের কথা হলো, উনি আর্টিকেল ৩১ পড়লেন। কিসের আর্টিকেল ৩১? জুলাই সনদের। জুলাই সনদের আর্টিকেল ৩১-এ আপনারা বলছেন একদিকে বিচারক নিয়োগের জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে, আরেকদিকে বিলের বিরোধিতা করছেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, সংবিধান যদি সংশোধন করতে হয়—আপনারটাই ধরে নিলাম—সংবিধান আপনি দেখেন, আর্টিকেল অব দ্য জুলাই চার্টার আমি পড়ি, আপনাদের সামনে কী লেখা আছে। এই পার্লামেন্টের সবার ক্লিয়ারিটির জন্য বলছি। ওনারা আর্টিকেলের লেফট-হ্যান্ড কলামকে রিলাই করছেন। লেফট-হ্যান্ড কলামে আছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংবিধানে রূপযুক্ত করা হবে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে—এটা ওনার বক্তব্য, ওনারা রিলাই করছেন। আমরা বিএনপি বলেছি যে আমরা বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয় আইন প্রণয়ন করব। আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি করতে চাচ্ছি। আমরা সেই কমিটির কাছে ফিরে যাই। সেই কমিটির কাছে গিয়ে আপনি যে আইনটার কথা বলছেন, আপনি বিচারক নিয়োগের যে স্বচ্ছতার কথা বলছেন, আপনি যে মানদণ্ডের বিচারক চান, আপনি যে সুপ্রিম কোর্ট চান, আপনি যে বিচার বিভাগের মানদণ্ড চান, আপনি যে বিচারালয় চান, আমরাও সেই বিচারালয় চাই। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো খায়রুল হক গজিয়ে উঠুক। আমরা চাই না আর কোনো বিচার বিভাগীয় কিলিং হোক। আমরা চাই এই বিচার বিভাগ স্বচ্ছ, স্বাধীন, সক্রিয়তায় ভরপুর হোক।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাক। আমরা চাই যার যার ফাংশন সেই সেই করুক। আমরা চাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেওয়া রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে। সেই রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে আমাদের সঠিক পথে যেতে হলে একটি সাংবিধানিক কমিটি গঠন করে আসেন চুলচেরা বিশ্লেষণ করি। আসেন কোন কোন জায়গায় রোগ আছে সেটা ডিটেক্ট করি। আসেন প্রোপার ডায়াগনোসিস করি। তারপর আসেন ওষুধ দিই। আমরা সেই পথ ধরে এগিয়ে যাই। তা না করে যদি আমরা কথায় কথায় এখন বিরোধিতা করি, পেছনে বসে ফ্যাসিস্টরা হাতে তালি দিচ্ছে। আপনারা সঠিক পথে আসেন। আমরাও বেঠিক হতে পারি। আমরাও সঠিক পথে আসতে চাই। আমরাও ভুল করতে পারি। আমরা সঠিক পথে আসতে চাই। আসেন দুই পক্ষের ভুল-সঠিক কথা এক টেবিলে বসে আমরা আলোচনা করে সমাধান করি। এ আইনগুলো এমন না যে কোরআনিক ভার্সন—এ আইনগুলো আজকে পাস করলে এমন না যে কালকে আবার এটা সংশোধন করতে পারব না। পার্লামেন্ট ওপেন, আমরা আবার সংশোধনের জন্য আসতে পারব। আপনারা বলছেন সংস্কার, আমরা বলছি সংবিধান সংশোধন—প্রত্যেক সংশোধনই একটি সংস্কার। আমরা সেই পথ ধরে এগিয়ে যাই।