নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত পাম্প বন্ধ রাখতে চান মাম্প মালিকরা বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বেলা ১২টায় রাজধানীর মগবাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ কথা জানায় এ সংগঠন।
সংগঠনটি বলে, ‘ডিপো থেকে চাহিদামত জ্বালানি পাচ্ছে না ফিলিং স্টেশনগুলো। এমন অবস্থায় রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত পাম্প বন্ধ রাখতে চাই আমরা।’
সভায় পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা। অনেক ক্ষেত্রে ট্যাংকার পুরোপুরি ভর্তি না করে আংশিক লোড নিয়ে পাঠানো হলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায় এবং এতে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এ কারণে তারা চেম্বার পূর্ণ করে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে পরিবহন ব্যয় কমানো যায় এবং সরবরাহ আরও কার্যকর হয়।
এ সময় একই জেলার একাধিক পাম্পে একসঙ্গে সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার কারণে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং বা সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক জায়গায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।”
ডিপো থেকে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, “মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বর্তমানে যাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। পরে সেই পেট্রোল বা অকটেন খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন কিংবা বোতলে ভরে মজুত করছেন। তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “আগে যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, সেই অনুপাতে সরকার তেল সরবরাহ করে আসছিল এবং এখনো একইভাবে সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন গ্রাহকদের চাহিদা দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এমনকি বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়েও তেল মজুতের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, গুজব ও আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনা এবং অবৈধ মজুতের কারণে অনেক জায়গায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এজন্য সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে নিয়ম মেনে তেল নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সন্ধ্যার পর পেট্রোল পাম্পে তেল বিক্রি করতে গিয়ে প্রায়ই কিছু দুষ্টু চক্রের উৎপাত দেখা যায়। তারা পাম্পে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, ফলে অন্য গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভোগান্তি বাড়ে। এ কারণে পাম্পে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তেল বিক্রির সময়সীমা নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং বাস্তবতার নিরিখে সামঞ্জস্যপূর্ণ তেল সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ ৮ দফা দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো স্থায়ী সংকট নেই। বর্তমানে যে মজুত রয়েছে তা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও আতঙ্কের কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনতে পাম্পে ভিড় করছেন।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, যদি সবাই নিজের গাড়ির ট্যাঙ্ক পূর্ণ করার প্রতিযোগিতায় নামেন, তাহলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। একজনের অতিরিক্ত সংগ্রহের কারণে অন্য কেউ জরুরি প্রয়োজনেও তেল নাও পেতে পারেন। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সরকার ঘোষিত নির্দেশনা মেনে চলার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক পেট্রোল পাম্পে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ থাকলেও অতিরিক্ত ভিড় ও আতঙ্কের কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও তেলের দাবিতে পেট্রোল পাম্পে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তাই এসব এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সংগঠনটি পেট্রোল পাম্পে তেল বিক্রির সময়সীমা সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাস্তবতার ভিত্তিতে তেল সরবরাহ সমন্বয় করা এবং ডিপো থেকে ট্যাঙ্কলরির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তেল সরবরাহের দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, পাম্পে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নির্ধারিত রেশনিং অনুযায়ী তেল নিয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও অনুরোধ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পেট্রোল পাম্প মালিকদের ওপর একতরফা দোষারোপ না করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাম্পে হামলা ও সহিংসতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সংগঠনটির নেতারা।
জ্বালানি তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিপিসি ও প্রশাসনের প্রতি ৮টি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও দাবি তুলে ধরা হয়—
১. প্রতিটি পেট্রোলপাম্পে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. বাস্তবতার নিরিখে সামঞ্জস্যপূর্ণ তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ক্রেতা সাধারণকে সচেতন ও ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
৪. পাম্পে ট্যাংক শূন্য অবস্থায় তেল নিতে হুমড়ি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. তেল বিক্রির সময়সীমা সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করতে হবে।
৬. উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
৭. ডিপো থেকে ট্যাংকলরির ধারণক্ষমতা (যেমন ৪,৫০০ লিটার) অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে হবে, অন্যথায় পরিবহন খরচ বাড়বে।
৮. সরকারি মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং অযথা পাম্প মালিকদের ওপর দোষ চাপানো যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলা হয়, সেনাবাহিনী পরিচালিত ট্রাস্ট এনার্জি বা জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে রিফাইনারি সক্ষমতা বাড়ানোর যে দীর্ঘমেয়াদি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে মালিকরা আশাবাদী।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ, সদস্য সাজ্জাদুর রহমান ইমন, সদস্য মিজানুর রহমান, অর্থ সম্পাদক মিজান প্রধান, যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়া উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম আহ্বায়ক আবু হিরন ও সদস্য মাসুদ পারভেজ উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















