নিজস্ব প্রতিবেদক :
এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানবপাচার আইনের মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালত এই আদেশ দেন।
এদিন বিকেল পাঁচটার পর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত ৫ দিনই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার (২৩ মার্চ) গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতে পাঠানোর আগে দুপুরে ডিবি পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১১টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফেনীতে তিনটি ও ঢাকায় আটটি মামলা রয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, রিক্রুটিং এজেন্সি আফিয়া ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী আলতাব খান ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন মডেল থানায় সাবেক প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব আহমেদ মুনিরুস সালেহীন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তাঁর স্ত্রী কাশ্মীরি কামাল, মেয়ে নাফিসা কামাল, সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, বেনজীর আহমেদসহ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ২৪ হাজার কোটি টাকা পাচার ও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের কারণে আফিয়া ওভারসিজসহ অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে এবং আসামিরা যোগসাজশে বিপুল অঙ্কের অর্থ চাঁদা হিসেবে নেন।
তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় গত বছর সিআইডির হিনিয়াস ক্রাইম বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মো. রাসেল মামলা থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ সব আসামির অব্যাহতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এ ছাড়া মিথ্যা মামলা করায় বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির মো. রাসেল চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেন, মামলার বাদী সরাসরি ভুক্তভোগী নন। এই মামলায় ভিকটিম হলেন শ্রমিকেরা। মালয়েশিয়ায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার শ্রমিক গিয়েছিলেন, তাঁদের কেউই মামলার বাদীকে টাকা দেননি। তাঁরা কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেননি। ফলে মামলায় যথাযথ প্রমাণের অভাব রয়েছে।
পরে বাদী পুলিশ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দাখিল করলে আদালত ফের মামলাটি তদন্তে পাঠান। মামলাটি বর্তমানে ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলার তদন্তকালে এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিলেন। ডিএমপি তাঁর অবস্থান নির্ণয় করে নিজ বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাঁকে মামলার বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে আড়াল করে মামলার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। এমতাবস্থায় মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ করা টাকা উদ্ধার, চাঁদার টাকা উদ্ধার, মূল অপরাধী চক্র শনাক্তসহ অন্যান্য আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এ জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন জরুরি। তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে একসময় যাঁকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তিনি বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। একই বছর এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের জুনে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত ওই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















