নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মালয়েশিয়ায় বহু বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। অনেক প্রবাসী বিভিন্ন কারণে দেশটির কারাগারে আটকে আছেন, এ সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। কীভাবে তাদের মুক্ত করা যায়, সেই চেষ্টা করা হবে।
রোববার (২১ জুন) দিবাগত রাতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শাংগ্রি-লা হোটেলে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মালয়েশিয়ায় দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটকে আছে জানিয়ে তাদেরকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে দেশটির সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার আইটি ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও তিনি জানান।
শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব শ্রমিক বিদেশে আসবেন, তাদের ভাষা শেখানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণও দেবে সরকার। এরজন্য দেশের টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউশন আপডেট করা হবে। আগামী ১০ বছরে কোথায় কোথায় কাজ নিয়ে বাংলাদেশিরা যেতে পারেন, তা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
মালয়েশিয়া অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে এসেছিলাম। আজ এসে দেখলাম, এ দেশের রাস্তা বাংলাদেশের চেয়েও পরিষ্কার। এই রাস্তা পরিষ্কার রাখতে বাংলাদেশিরাও সহযোগিতা করছে। তাহলে আমরা দেশকে কেন পরিষ্কার রাখতে পারবো না?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রিয় প্রবাসী ভাই-বোনেরা আপনাদের সকলের কাছে দেশবাসীর পক্ষ থেকে একটি কথা রাখব…আসুন আজকে থেকে আমরা চিন্তা করি, আমরা কি করতে পারি দেশের জন্য? এটাই হোক আমাদের আজকের চিন্তা। আপনাদের কাছে এই আশা রেখে, এই চাওয়া রেখে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
তার আগে তারেক রহমান গত দেড় দশকে ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনে দেশের কী অবস্থা হয়েছিল, তা তুলে ধরেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে।
তিনি বলেন, দেখুন দেশ থেকে কেউ একজন, একটি গোষ্ঠী দেশ থেকে নিতে নিতে দেশটিকে একদম শেষ করে দিয়েছে আজকে, দেশটাকে একদম ধবংস করে দিয়েছে। কিছু করার ছিল না, আমরা চেষ্টা করেছি, বুকের রক্ত দিয়ে মানুষ দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছে। এখন আসুন আমরা সকলে মিলে দেশের জন্য কি করতে পারি …এটিতে আমরা থাকি। সকলে সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সামনে একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। তবে এখানে একটি বিরাট ‘তবে’ আছে। ‘তবে’ হচ্ছে যে, আমাদেরকে এর জন্য পরিশ্রম করতে হবে, আমাদেরকে এর জন্য কষ্ট করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে যে আমাদেরকে এর জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে।”
তিনি বলেন, যে কথাটি দিয়ে আমি শুরু করেছিলাম যে দেখুন আসার সময় যেই জিনিসটা সবচেয়ে বেশি, এটা তো ঠিক আছে নতুন রাস্তা হবে, বিল্ডিং হবে…এগুলা তো চোখে পড়ে। এটা তো কোন জিনিস না। যে উদাহরণটা আমি আপনাদের সামনে দিয়ে শুরু করেছিলাম যে কুয়ালালামপুর থেকে রাস্তাগুলো অনেক পরিষ্কার লেগেছে আমার কাছে এবং এই পরিষ্কার করার কাজটি কিন্তু আমার দেশের ভাইরাই করছে। আমার কথা হচ্ছে আমার দেশের ভাইরা যদি এখানে পারেন, তাহলে আমরা দেশে কেন পারব না? দেশে কেন করব না? প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময়ে উপস্থিত প্রবাসীরা তাদের সমস্যার কথা একযোগে বলতে চাইলে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়, তখন প্রধানমন্ত্রী সকলকে শান্ত হতে বলেন।
তিনি বলেন, আপনারা সবাই একসাথে কথা বলেন, কেউ কাউকে কথা বলতে দিচ্ছে না। তার ফলে কোনটাই হচ্ছে না, কারোটা কেউ বুঝতে পারছে না, কারোটা কেউ শুনতে পাচ্ছে না এবং আমিও কিছু করতে পারছি না। এই জায়গাটা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।
এক-এগারো এবং বিগত সরকারের আমলের পারিবারিক নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের পরে এবং তারপরেও বিভিন্ন সময় আমি ও আমার পরিবারের সঙ্গে কতগুলো ঘটনা ঘটেছিল। এখন এ মুহূর্তে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। আই এম দি প্রাইম মিনিস্টার। আমি চাইলে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারি।
তিনি বলেন, কিন্তু আমি যদি নেই তাতে বেনিফিটটা কী হবে বলতে পারেন? কারো কোনো বেনিফিট হবে না। এই বিষয়টা থেকে আমাদের বেরুতে হবে। দেশ আমাদের সবার। আমাদেরকে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে ধীরে ধীরে এগোতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের পরে এবং তারপরেও বিভিন্ন সময় কতগুলো ঘটনা ঘটেছিল আমার সঙ্গে, আমার মায়ের সঙ্গে, আমার ভাইয়ের সঙ্গে। আম্মা একবার খুব অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় একটি হসপিটালে অ্যাম্বুলেন্স চাওয়া হয়েছিল। তারা অ্যাম্বুলেন্সটি দেয় নাই সেদিন।
গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থার ধ্বংসাত্মক রূপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেখুন, একটি গোষ্ঠী দেশ থেকে নিতে নিতে দেশটিকে একদম শেষ করে দিয়েছে আজকে, দেশটাকে একদম ধ্বংস করে দিয়েছে। ঠিক আছে হয়েছে, কিছু করার ছিল না। আমরা চেষ্টা করেছি, বুকের রক্ত দিয়েছে মানুষ, দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছে। এখন আসুন আমরা সকলে মিলে দেশের জন্য কী করতে পারি, এটিতে আমরা থাকি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এখন নিজেদের ব্যক্তিগত দাবি-দাওয়া নিয়ে পড়ে থাকার সময় নয়, বরং ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে টেনে তুলতে কার কী কর্তব্য আছে তা ভাবার সময় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, কুয়ালালামপুর থেকে রাস্তাগুলো অনেক পরিষ্কার লেগেছে আমার কাছে এবং এই পরিষ্কার করার কাজটি কিন্তু আমার দেশের ভাইয়েরা করছে। আমার কথা হচ্ছে, আমার দেশের ভাইরা যদি এখানে পারে তাহলে আমরা দেশে কেন পারব না?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সামনে একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। তবে এখানে একটি বিরাট তবে আছে। তবে হচ্ছে যে, আমাদেরকে এর জন্য পরিশ্রম করতে হবে, আমাদেরকে এর জন্য কষ্ট করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে যে আমাদেরকে এর জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
প্রবাসীদের আইনি সুবিধা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ আইন ও প্রবাসীদের জটিলতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মানি বা না মানি এখানে তো আপনাকে এ দেশের আইনে চলতে হবে। এখানে আপনি আবদার করলে তো চলবে না। আগামীকাল উনাদের (মালয়েশিয়া সরকার) সঙ্গে আমরা কথা বলব। আমরা সেগুলা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করব, তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করব। তবে তারা তো আর তাদের দেশের আইনের বাইরে যাবে না। সেই আইনের ভেতরে থেকে যতটুকু আমরা আমাদের প্রবাসীদের জন্য সুবিধা আদায় করতে পারি বা সুবিধা তৈরি করতে পারি, আমরা সেটা অবশ্যই করব।’
সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশ গঠনে বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখননসহ নানা কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। আমি প্রধানমন্ত্রী, আমি চাইলে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে হয়ত অনেক কিছুর প্রতিশোধ নিতে পারি। কিন্তু আমি যদি সেটা করি, তাতে উপকার কী হবে, বলতে পারেন? কারো উপকার হবে না। তাই এই প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’
উপস্থিত প্রবাসীদের উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ আপনারা প্রবাসী। অবশ্যই দেশের প্রতি আপনাদের দাবি আছে, পাশাপাশি, দেশের প্রতি আপনাদের কর্তব্যও আছে।’
তিনি বলেন, ‘ প্রবাসী হিসেবে আপনার যেমন দেশের প্রতি কর্তব্য আছে, দেশি হিসেবে আমাদেরও দেশের প্রতি কর্তব্য আছে। আসুন আমাদের কি দাবি আছে সেটা থেকে বেরিয়ে এসে চিন্তা করি দেশের প্রতি আমাদের কী কর্তব্য আছে। আমরা দেশ থেকে কি নেবো এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁকে প্রথম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘ আমি আমাদের প্রবাসী ভাইদের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে এ দেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে কথা বলব। চেষ্টা করব এ দেশের আইনের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চটা আদায় করতে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে উপস্থিত সবাইকে বলব, আপনি প্রবাসী, হ্যাঁ আপনি প্রবাসী। আমিও তো দেশি। আপনার যেরকম দেশের ওপরে দাবি আছে, আমার ওপরে দেশের উপরে দাবি আছে। রাইট। আসেন না কথাটাকে ‘চেইঞ্জ’ করি আমরা।
তিনি বলেন, দাবি কথাটা কেন আমরা বারে বারে বলি? কেন আমরা ভিন্নভাবে চিন্তা করি না? আমরা দাবিটাকে ভুলে গিয়ে কেন আমরা বলি না, প্রবাসী হিসেবে আপনার যেরকম দেশের প্রতি কর্তব্য আছে, দেশি হিসেবে আমরাও তো দেশের প্রতি কর্তব্য আছে। আসুন আমাদের কি দাবি আছে সেটা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা চিন্তা করি আমাদের কি কর্তব্য আছে দেশের প্রতি?
তিনি বলেন, ‘আমরা কি নেব দেশ থেকে, এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মানি বা না মানি এখানে তো আপনাকে এই দেশের আইনে চলতে হবে। এখানে আপনি আবদার করলে তো চলবে না। আমাদেরকে তো এই দেশের আইনে চলতে হবে।
মালয়েশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসীদের কী কী অসুবিধা আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলবেন তারা। তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।
“কিন্তু তারা তো আর তার দেশের আইনের বাইরে যাবে না, তারা তাদের দেশের আইনের ভেতরে থাকবে। সেই আইনের ভেতরে থেকে যতটুকু আমরা আমাদের প্রবাসীদের জন্য সুবিধা আদায় করতে পারি বা সুবিধা তৈরি করতে পারি, আমরা সেটা অবশ্যই করব।”
এ সময়ে প্রবাসীরা করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যকে স্বাগত জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার হাই কমিশনার মঞ্জুরুল করিম। ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মালয়েশিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক ডিএম মোশাররফ হোসেন।
দুইদিনের সরকারি সফরে সোমবার (২২ জুন) সকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















