মানবতাবিরোধী অপরাধ : ইনুর বিরুদ্ধে রায় ৩০ জুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে জুলাই আন্দোলন দমনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী, বলপ্রয়োগে উসকানি এবং কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে ফোনকলের পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আগামী ৩০ জুন ঘোষণা করা হবে।

সোমবার (২২ জুন) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রের সঙ্গে রয়েছে এক হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র। এছাড়া রয়েছে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট। এ মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে হাসানুল হক ইনুকে।

আটটি অভিযোগে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলন দমনের নির্দেশনার পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার

অভিযোগে বলা হয়, হাসানুল হক ইনু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেন।

১৪ দলের সভায় উপস্থিত থেকে উসকানি

আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর উপস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন করে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে হাসানুল হক ইনু নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা দিয়েছেন।

কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোন

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ জুলাই দুপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পূর্বের নির্যাতনকে অনুমোদন করেন। এই নির্দেশনার পর কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের সদস্য এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডাররা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।

এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। রাইসুল হকসহ অসংখ্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারী আহত হন এবং অনেককে আটক করে নির্যাতন করা হয়।

আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ

অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানো, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা এবং উসকানি প্রদান করেন।

এরই অংশ হিসেবে ২০ জুলাই দুপুরে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে হামলা এবং গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তকে তিনি অনুমোদন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।

গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার

অভিযোগে বলা হয়, ২৭ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন।

একই সঙ্গে সরকারের জারি করা কারফিউ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বৈধতা

অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় হাসানুল হক ইনু উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে কারফিউ বহাল রাখা, দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার এবং নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি ও নির্দেশনা প্রদান করেন।

এর অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি ও গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা

অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কুষ্টিয়া জেলার সর্বস্তরের জনগণের পাশাপাশি নিরীহ-নিরস্ত্র শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ রাস্তায় নেমে আসেন।

সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার হাজারো নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে সেখান থেকে চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগত অধস্তন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা ও নির্দেশের প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান আতার নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী অজয় সুরেখা, মানব চাকী, আতিকুর রহমান অনিক, শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জ, রাশিদুল ইসলাম বিপ্লব, তৈয়ব বাদশা, তাইজাল আলী খান, স্বপন কুমার গং পুলিশের ছত্রছায়ায় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে) নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালাতে থাকে।

এই গুলিবর্ষণের ফলে দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বক চত্বর থেকে আনুমানিক ৫০ গজ উত্তরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী রাস্তার আড়ং-এর সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুত্তাকিন, মো. উসামা, তুলাপট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

মানবতাবিরোধী অপরাধ : ইনুর বিরুদ্ধে রায় ৩০ জুন

প্রকাশের সময় : ০১:৪৬:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে জুলাই আন্দোলন দমনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী, বলপ্রয়োগে উসকানি এবং কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে ফোনকলের পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আগামী ৩০ জুন ঘোষণা করা হবে।

সোমবার (২২ জুন) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রের সঙ্গে রয়েছে এক হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র। এছাড়া রয়েছে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট। এ মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে হাসানুল হক ইনুকে।

আটটি অভিযোগে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলন দমনের নির্দেশনার পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার

অভিযোগে বলা হয়, হাসানুল হক ইনু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেন।

১৪ দলের সভায় উপস্থিত থেকে উসকানি

আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর উপস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন করে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে হাসানুল হক ইনু নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা দিয়েছেন।

কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোন

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ জুলাই দুপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পূর্বের নির্যাতনকে অনুমোদন করেন। এই নির্দেশনার পর কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের সদস্য এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডাররা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।

এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। রাইসুল হকসহ অসংখ্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারী আহত হন এবং অনেককে আটক করে নির্যাতন করা হয়।

আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ

অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানো, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা এবং উসকানি প্রদান করেন।

এরই অংশ হিসেবে ২০ জুলাই দুপুরে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে হামলা এবং গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তকে তিনি অনুমোদন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।

গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার

অভিযোগে বলা হয়, ২৭ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন।

একই সঙ্গে সরকারের জারি করা কারফিউ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বৈধতা

অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় হাসানুল হক ইনু উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে কারফিউ বহাল রাখা, দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার এবং নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি ও নির্দেশনা প্রদান করেন।

এর অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি ও গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা

অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কুষ্টিয়া জেলার সর্বস্তরের জনগণের পাশাপাশি নিরীহ-নিরস্ত্র শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ রাস্তায় নেমে আসেন।

সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার হাজারো নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে সেখান থেকে চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগত অধস্তন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা ও নির্দেশের প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান আতার নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী অজয় সুরেখা, মানব চাকী, আতিকুর রহমান অনিক, শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জ, রাশিদুল ইসলাম বিপ্লব, তৈয়ব বাদশা, তাইজাল আলী খান, স্বপন কুমার গং পুলিশের ছত্রছায়ায় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে) নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালাতে থাকে।

এই গুলিবর্ষণের ফলে দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বক চত্বর থেকে আনুমানিক ৫০ গজ উত্তরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী রাস্তার আড়ং-এর সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুত্তাকিন, মো. উসামা, তুলাপট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।