নিজস্ব প্রতিবেদক :
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে কি না, তা ফারাক্কা চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী (এলজিইডি) ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শনিবার (১৬ মে) ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, যে কারণে এ বছর চুক্তি শেষে এটি নবায়নে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করেই ফারাক্কা ব্যারাজ চুক্তি নবায়ন করা হবে।
তিনি দাবি করেন, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এর পর নতুন চুক্তি করতে হলে তা দীর্ঘমেয়াদি ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী হতে হবে।
পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে দেশের স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে তিনি সরকারের গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, জাতীয় স্বার্থে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারত সরকারের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, অবিলম্বে এই চুক্তি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আলাপ করে তাদের অভিপ্রায় ও চাওয়া অনুযায়ী সম্পাদন করতে হবে। এটা হচ্ছে আমাদের খুব পরিষ্কার কথা। অন্যথায়, যে কথাটা অনেকেই বলেছেন, ভারতের সঙ্গে যে সুসম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার সুযোগ এসেছে, সেটা নির্ভর করবে ভারতের এই গঙ্গা চুক্তি বা ফারাক্কা চুক্তি সম্পাদনের ওপর। এ কথা আমরা বিশ্বাস করি এবং সেই আহ্বান আমরা তাদের কাছে জানাতে চাই।
সরকারবিরোধী অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে।
ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে ফারাক্কা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমাধানে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় দুই দেশের সুসম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ফারাক্কা এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক। তিনি বলেন, গঙ্গা বা পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে দেশের মানুষ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
মির্জা ফখরুল বলেন, মাওলানা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সারাজীবন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন। তিনি কখনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। ফারাক্কা লংমার্চের মাধ্যমে তিনি দেশের মানুষকে সংগঠিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। তখনই মাওলানা ভাসানী বিষয়টি উপলব্ধি করে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন এবং একটি কার্যকর চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেদিন উপলব্ধি করেছিলেন যে, জনগণকে সামনে নিয়ে যদি একটা শক্তি পৃথিবীতে দেখানো যায় এবং তারপর সেটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা হয়, তাহলে তা অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। তিনি সেই কাজটাই করেছিলেন। যার ফলে তিনি যে চুক্তি করেছিলেন, সেই চুক্তিটা নিঃসন্দেহে অনেকাংশে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে গিয়েছিল।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের যে, যখন এই চুক্তিটি প্রথম হয়, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তিনি যখন এই চুক্তি অর্থাৎ পানি আসার জন্য অনুমতি দেন বা চালু করার অনুমতি দেন, তখন থেকেই কিন্তু এই দেশের সর্বনাশটা শুরু হয়। শহীদ জিয়া চুক্তি করেছেন, পরবর্তীকালে আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া চুক্তি করেছেন এবং শেখ হাসিনাও চুক্তি করেছেন। কিন্তু প্রধান বিষয় যেটা আমাদের নীতি নির্ধারকরা বলেছেন, এখানে চুক্তি কয়েক বছরের জন্য হলে চলবে না। এই চুক্তিটা হতে হবে ইনফিনিট (অনির্দিষ্টকালের জন্য) এবং পরবর্তী চুক্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত এর কার্যকারিতা থাকতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই চুক্তি শেষ হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি যদি এক্সটেনশন (নবায়ন) না হয় এবং পানি আসার ব্যবস্থা যদি নিশ্চিত না হয়, আজকে পদ্মা ব্যারেজ– অথবা আপনারা যাই বলুন, সেটি নির্মিত হওয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি আরেকটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, যা সমস্ত ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে, অর্থাৎ অন্যান্য যে সমস্ত শক্তি বা দেশগুলো আছে তাদের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিএনপির মহাসচিব বলেন, তারেক রহমানের সরকার জনগণের সরকার। আজকে এই সরকারের বিরুদ্ধে কিছু কিছু শক্তি অপপ্রচার চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশের যে স্থিতিশীলতা আছে, সেই স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করবার একটা পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এই সম্পর্কে আমরা যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তাদেরকে অনেক বেশি সজাগ হতে হবে। শুধু সজাগ নয়, আমাদেরকে সংগঠিত হতে হবে, যাতে কোনো রকম চক্রান্ত আমাদের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পরিপূর্ণ করার জন্য যে সরকার এসেছে, তার স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে না পারে।
তিনি বলেন, আমরা দেখলাম কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বিভিন্নভাবে এই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছেন এবং আজকে আবার স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করবার চেষ্টা করছেন। আমরা আজকের এই আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট বলতে চাই সবাইকে যে, বাংলাদেশের জনগণ– যারা বুকে রক্ত দিয়ে গণতন্ত্রকে অর্জন করেছে। তারা কখনোই, কোনোভাবেই কোনো রকম চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রকে এখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য আব্দুল মইন খান। এছাড়া, বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























