নিজস্ব প্রতিবেদক :
আসন্ন ঈদযাত্রায় সড়ককে নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও চাঁদামুক্ত রাখা হবে। ঈদযাত্রীদের কোনোরকম হয়রানি করা যাবে না। বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা যাবে না। বাড়তি ভাড়া আদায় ঠেকাতে ঢাকার সব বাস টার্মিনালে স্থাপন করা হবে ‘প্যাসেঞ্জার হেল্প ডেক্স’। যাত্রীরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম।
‘ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও চাঁদামুক্ত করার লক্ষ্যে’ এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। সভায় ময়মনসিংহ ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করা পরিবহন মালিক, চালক ও তাদের সহকারীরা অংশ নেন।
সভায় সাইফুল আলম বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এর মধ্যে অন্যতম মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী বাস টার্মিনালে ‘প্যাসেঞ্জার হেল্প ডেক্স’ স্থাপন করা। কোনো বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নিলে যাত্রীরা হেল্প ডেক্সে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
তিনি বলেন, ঈদযাত্রায় কোনো অবস্থাতেই যাত্রী হয়রানি করা যাবে না। এরই মধ্যে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রার সময় ফিটনেসবিহীন কোনো বাস সড়কে চলতে দেওয়া হবে না জানিয়ে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব বলেন, ফিটনেসবিহীন বাসের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় চালকেরা বেপরোয়াভাবে বাস চালান। এটিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বেপরোয়াভাবে আর গাড়ি চালানো যাবে না।
তিনি বলেন, মহাসড়কগুলোতে নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে চালানো যাবে না। এছাড়া একজন চালক বিরামহীনভাবে গাড়ি চালাতে পারবেন না। নিজের ও যাত্রীদের নিরাপত্তায় চালককে পর্যাপ্ত সময় বিশ্রাম নিতে হবে।
বর্তমান সরকার সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে বদ্ধপরিকর জানিয়ে সাইফুল আলম বলেন, ঈদে গণপরিবহনে চাঁদা আদায় করতে দেওয়া হবে না। চালকরা যেন নির্বিঘ্নে বাস চালাতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা হবে।
দেশের সব বাস টার্মিনালে মলমপার্টি ও ছিনতাই প্রতিরোধ, নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে সার্বক্ষণিক ভিজিলেন্স টিম কাজ করবে বলে জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় যাত্রীদের ভিড় বাড়ার সুযোগে কিছু অসাধু চক্র মলমপার্টি, অজ্ঞান পার্টি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব অপরাধ দমনে টার্মিনালগুলোতে সার্বক্ষণিক ভিজিলেন্স টিম মোতায়েন থাকবে।
তিনি বলেন, নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবহন খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অনেক সময় নারী যাত্রীরা হয়রানির শিকার হন, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই প্রতিটি টার্মিনালে নজরদারি বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কেউ যাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে পরিবহন শ্রমিক, মালিক ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সবাই দায়িত্বশীল হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং যাত্রীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন।
আসন্ন ঈদযাত্রা সহজ করতে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিআরটি লেন এবং আব্দুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়া রোড পর্যন্ত ওয়ানওয়ে (একমুখী) যান চলাচল চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার। এছাড়া ঢাকা বাইপাস রোড খোলা রাখার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হলো ফিটনেসবিহীন ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ বাস। এই বাসগুলো হাইওয়েতে নষ্ট হলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এসব বাস যাতে রাস্তায় নামতে না পারে সেজন্য বিআরটিএ এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। গতবারের মতো এবারও লক্কড়-ঝক্কড় বাস মেরামতের জায়গায় নজরদারি চালানো হবে।

বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের সহায়তায় ‘হেল্পডেস্ক’ স্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছেন কমিশনার। সেখানে বাসের ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া এবং কোনো বাসের শিডিউল বিপর্যয় হলে তা দ্রুত যাত্রীদের জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া টার্মিনালগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সিটি করপোরেশনের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ডিএমপি। তিনি বলেন, টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, এসবি এবং র্যাব মোতায়েন থাকবে। এছাড়া সন্দেহভাজন বস্তু তল্লাশিতে ডগ স্কোয়াড এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সোয়াট টিম প্রস্তুত থাকবে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে মাউন্টেন পুলিশও (অশ্বারোহী) দায়িত্ব পালন করবে।
ডিএমপি কমিশনার মালিক ও শ্রমিক সমিতিকে অনুরোধ করেছেন যাতে চালকরা একটানা ৪-৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালান এবং যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী না তোলেন। বিশেষ করে আব্দুল্লাহপুর, গাবতলী ও সায়েদাবাদে মূল সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুললে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা সহজ করতে এবং সড়কে যানজটের চাপ কমাতে আগামী ১৮ মার্চ সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। মূলত যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণত ঈদের আগে ছুটি কম থাকলে একদিনে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়েন। যদি দুই দিনের ছুটি থাকে, তবে একদিনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ লোক যাতায়াত করেন। কিন্তু ছুটি চার থেকে পাঁচ দিন হলে এই চাপ ভাগ হয়ে যায় এবং প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়বে। এর ফলে বাসগুলো যাত্রী নামিয়ে দ্রুত ফিরে এসে আবার নতুন যাত্রী নিতে পারবে, যা ঈদযাত্রাকে অনেক বেশি সহজতর করবে।
একসঙ্গে বিপুল জনস্রোত সামাল দিতে তৈরি পোশাক খাতের (গার্মেন্টস) মালিকদের প্রতি ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ১৬ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে প্রতিদিন ২০ শতাংশ হারে শ্রমিকদের ছুটি দিলে পরিবহন সংকট ও যানজট উভয়ই নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে ডিএমপি মনে করছে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেটরা সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবেন এবং মলম পার্টি বা ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে বলেও জানান ডিএমপি কমিশনার।
মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম এ বাতেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও মতবিনিময় সভায় পরিবহন শ্রমিক নেতা, বাস মালিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















