নিজস্ব প্রতিবেদক :
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ফ্যাসিস্ট ও আগের সরকারের ঋণের বোঝা নিয়ে কাজ করেছি। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পারফেক্ট নয়। তারপরও আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য দুই বছর প্রয়োজন।
রোববার (২১ জুন) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বাজেট ডায়ালগ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট ও আগের সরকারের ঋণের বোঝা নিয়ে কাজ করেছি। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পারফেক্ট নয়। তারপরও আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য দুই বছর প্রয়োজন। অল্প টাকা দিয়ে হলেও ট্যাক্স নেটের আওতায় আসতে হবে দেশের মানুষকে। তবে এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সরকার ১ হাজার ৩০০ প্রজেক্ট নিজেদের স্বার্থে তৈরি করেছিল, যার অনেকটাই আমরা বাতিল করেছি। অনেক প্রকল্প ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ হওয়া যা কোনো কাজে আসছে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, লোকাল ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে প্রাইভেট সেক্টর টিকতে পারে না। সেখানে সরকারের জন্য তা কষ্টদায়ক। তবে সরকার এই খাত থেকে অর্থ নেয়া থেকে বের হয়ে আসবে।
বর্তমান বাজেটকে পারফেক্ট না উল্লেখ করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার বাজেটের নানা দিক এখনও খতিয়ে দেখছে। এই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে। কর ও জিডিপির অনুপাত ভালো না। পুরো বিশ্বে বর্তমানে বিদেশি ঋণ কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের বাজেট ঘোষণা করতে হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগের সরকার শুধু ৫০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিলই রেখে গেছে। তার উপর মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে ব্যয় বেড়েছে। ফলে মানুষের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমরা নতুনভাবে দেখছি। এনবিআরের পলিসি বিভাগ আমলাদের দিয়ে চলবে না। সেখানে কর বিশেষজ্ঞরা দায়িত্ব পাবেন।
তিনি বলেন, আমাদের এনবিআরকে সচল করতে হবে। অনেকে ট্যাক্স না দেয়াটাকে ভালো কিছু ভাবেন। এই মানসিকতা থাকলে দেশ এগোবে না। যে কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য রফতানি করতে চাইলেই বন্ড সুবিধা পাবেন। আর বন্ড না নিলে কর সুবিধা দেওয়া হবে ।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তন, ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর শর্ত কঠোর হওয়ায় প্রচলিত অর্থায়ন পদ্ধতি আর আগের মতো সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। এই বাস্তবতায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা ধীরে ধীরে একটি মার্কেট-বেইজড ফাইন্যান্সিং সিস্টেমের দিকে যেতে চাই, যেখানে বন্ড মার্কেটসহ বিভিন্ন বিকল্প অর্থায়ন উৎস কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। কারণ অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে।
স্থানীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা, যার ফলে বেসরকারি খাত অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার যখন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং সুদের হার বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উদ্যোক্তা ও শিল্প খাতের ওপর, যা অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতিগত অবস্থানে এসেছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই প্রবণতা আগের তুলনায় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি একদিনে বা এক বাজেটেই পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়; বরং ধাপে ধাপে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বাজেট বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু বাজেট প্রণয়ন করলেই লক্ষ্য অর্জিত হয় না, বরং এর সঠিক ও কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অর্থ ছাড় প্রক্রিয়া এবং মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো এবং স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয়।
এ জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি প্রসঙ্গে আমীর খসরু বলেন, এই প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় কোনো পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিকে উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়নি, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষ থাকে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে পিএমটি (প্রক্সি মিনস টেস্ট) পদ্ধতির মাধ্যমে, যেখানে একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা, বসবাসের ধরন, সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মানসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর একটি, যা বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকার ধীরে ধীরে তা অতিক্রম করার চেষ্টা করছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে কিছু ত্রুটি ধরা পড়লেও সেগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধনের কাজ চলমান রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ সরাসরি নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে, যাতে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং সামাজিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা পরিবার কাঠামোর ভেতরে নারীর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য এই দুই খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য। সরকার ধাপে ধাপে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ধীরে ধীরে অর্জন করতে হবে। শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতা উন্নয়ন বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতের শিল্প, কৃষি, সেবা খাত এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
দক্ষতা উন্নয়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের পর বড় একটি অংশ কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় প্রবেশ করে, বাংলাদেশেও একই ধরনের কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং তারা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।’
ঋণের চাপ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে, যা অতীতের আর্থিক দায়ভার বহন করার ফল। এই চাপ থাকা সত্ত্বেও সরকার অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থার দিকে এগোতে চায়।
এই সংলাপে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেন। সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানউল্লাহ, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ এ রাজ্জাক প্রমুখ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















