নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলেও অন্য শাখা চলতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে হাম চিকিৎসা প্রোটোকল ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু প্যাথলজির নয়, মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তবে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের অন্য শাখা থাকলে তা চলতে বাধা নেই।
মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বদ্ধ ঘরে অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের শিশুরা। অবহেলা ছিল ডাক্তার, নার্স এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তাই ও ছয় শিশুর মৃত্যুর দায় নিতেই হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে কেবল হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। কেউ অপরাধ করলে সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এ সময় স্বাস্থ্যসেবা খাতে রোগীদের সেবার মান বৃদ্ধি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে ডাক্তার ও নার্সদের সহযোগিতায় হামের বিরুদ্ধে শক্ত দেয়াল তৈরি করতে সরকার সক্ষম হয়েছে বলে জানান তিনি। সেইসঙ্গে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে সব ডাক্তারকে আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর উল্লেখ করে তিনি বলেন, অক্সিজেন সংকট ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে কয়েকটি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতাল প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে অবহেলা বা গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। রোগীর জীবন নিয়ে দায়িত্বহীন আচরণ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আসতেই হবে। সরকার এ ধরনের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সামগ্রিক মান নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, দেশের স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত সেবার মান এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এজন্য চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আরও দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
একই অনুষ্ঠানে হাম প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালে নবজাতক ও শিশুদের জন্য নিরাপদ চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। অক্সিজেন প্রবাহের জন্য ভেন্টিলেশন ব্যবস্থাও ছিলো না হাসপাতালটিতে। নবজাতকদের শ্বাসকষ্ট হলেও কোনো ডাক্তার তখন দায়িত্বে ছিলেন না। ডেকেও নার্সদের সাড়া মেলেনি।
মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, সেই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সরকারের দায়িত্ব।
এছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকারের নির্দেশনা ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কেউ পার পাবে না। অনিয়ম ও অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি। কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে তা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘দেশে পরিবর্তন আনতে হবে, আর সেই পরিবর্তন আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, চিকিৎসা একটি মানবিক ও মহৎ পেশা। রোগীদের প্রতি দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতা ছাড়া মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি চিকিৎসকদের রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, করোনাকালে দেশের চিকিৎসক ও নার্সরা অসাধারণ সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাদের অবদানের কারণেই বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম মৃত্যুহার বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসকদের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বিনিয়োগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কে. এম. মজিবুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপ¯ি’ত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহীন রহমান চৌধুরী এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মেহেরুন নেসা।
অনুষ্ঠানে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারহানা হক হাসপাতাল-সংক্রান্ত একটি উপস্থাপনা দেন। তিনি ক্লিনিক্যাল গাইডলাইনটি বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. জুবাইদা রহমানকে উৎসর্গ করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















