নিজস্ব প্রতিবেদক :
অন্তর্বর্তী সরকার একটা সুষ্ঠু, নিরাপদ ও ভালো নির্বাচন উপহার দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
প্রেস সচিব বলেন, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল। সেদিন কোনো বিশৃঙ্খলা দেখিনি। মনোনয়ন যে কম পড়েছে তাও নয়।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আশা করছি অন্তর্বর্তী সরকার ভালো নির্বাচন উপহার দেবে। গণভোট নিয়ে ভোটারদের উৎসাহ জাগবে। সে অনুযায়ী যা যা দরকার করা হচ্ছে।
শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের ভোটাররা যথেষ্ট সচেতন। গণভোটের বিষয় সরকার প্রচারণা চালাচ্ছে। ভোটের গাড়ি সারা দেশে ঘুরছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে একটি যুগান্তকারী অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
প্রেস সচিব বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশটি গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছিল। গতকাল এর গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এটি সরকারের একটি ঐতিহাসিক অর্জন।” তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি হিসাবে দেশে তামাকের প্রভাবে প্রতি বছর ১ লাখ ৩ হাজারের বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতেই এই কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, নতুন এই অধ্যাদেশে তামাকের ব্যবহার কমাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে— বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হওয়া ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও সমজাতীয় উদীয়মান তামাক পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় ও ব্যবহার বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা যাবে। তামাকজাত পণ্যের মোড়ক বা প্যাকেটের অন্তত ৭৫ শতাংশ অংশজুড়ে রঙিন সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। পাবলিক প্লেসে ধূমপানের পরিধি ও সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট ও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে আরও সুরক্ষা পাবে।
অধ্যাদেশে আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। জরিমানা ও কারাদণ্ড বৃদ্ধির পাশাপাশি দোষী ব্যক্তিদের লাইসেন্স বাতিল এবং মালামাল জব্দের ক্ষমতাও প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো তামাকজাত পণ্য বাজারে এলে তা গেজেটের মাধ্যমে এই আইনের আওতায় আনার ক্ষমতাও সরকারের হাতে রাখা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শহীদ হওয়ার পর রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের পরিচয় শনাক্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। কবরস্থানটি থেকে উত্তোলন করা ১১৮টি মরদেহের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেছে।
প্রেস সচিব বলেন, রায়েরবাজার কবরস্থানে অনেককে সমাহিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে উত্তোলিত মরদেহগুলোর মধ্যে আটজনকে সফলভাবে শনাক্ত (আইডেন্টিফাই) করা হয়েছে। তাদের পরিবারকেও বিষয়টি ইতোমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।” এই বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় খুব শিগগিরই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে বলে তিনি জানান।
শহীদদের পরিচয় শনাক্ত করার এই জটিল কাজটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পন্ন করা হচ্ছে। শফিকুল আলম জানান, বসনিয়া যুদ্ধের সময় সেব্রেনিৎসায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যার পর তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে যারা কাজ করেছিলেন, সেই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ডিএনএ স্যাম্পলের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে পরিচয় শনাক্ত করতে দেশীয় কয়েকজন বিশেষজ্ঞকেও দক্ষ করে তোলা হয়েছে।
প্রেস সচিব উল্লেখ করেন, সেব্রেনিৎসার ঘটনার পর যেভাবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিতভাবে মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছিল, বাংলাদেশেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য কাজ হলেও সরকার প্রতিটি শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
মোবাইল ফোন আমদানিতে ট্যাক্স নিয়ে শফিকুল আলম বলেন, মোবাইল ফোন আমদানিতে ট্যাক্স কমানো হয়েছে। আগে কাস্টমস ডিউটি ছিল ২৫ শতাংশ। এখন তা ১০ শতাংশ করা হয়েছে। দেশে উৎপাদিত ফোনের ট্যাক্স ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদ সভার সিদ্ধান্তের তথ্য তুলে ধরে প্রেস সচিব বলেন, মোবাইল ফোন আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি কমানো হয়েছে। সেটা আগে ছিল ২৫ শতাংশ। কাস্টমস ডিউটি এখন দিতে হবে ১০ শতাংশ। যারা মোবাইল ফোন এখানে (দেশে) ম্যানুফ্যাকচার করেন তাদের জন্য কাস্টমস যেটা আগে ১০ শতাংশ ছিল সেটা ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এর ফলে আশা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি আরও বেশি ব্যাপকতা পাবে। বাংলাদেশের মোবাইল ফোন ম্যানুফ্যাকচারিং করতে আরও অনেকে ইন্টারেস্টেড হবেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রচুর বিদেশ থেকে ইউজ মোবাইল ফোন আনা হয়। এনে কিছুটা রিপাবলিশ করে এটা বিক্রি করা হয়। এতে আমাদের ক্রেতা সাধারণ যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকারও অনেক ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হন। আশা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের চাহিদা বাড়বে এবং এগুলোর দামও কমে আসবে।
প্রেস সচিব বলেন, মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে আগে ট্যাক্স ইনসিডেন্স ছিল আমদানি ক্ষেত্রে ৬১.৮০ শতাংশ। এখন এটা কমে আসবে ৪৩.৪৩ শতাংশ।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দাফন করা হয়েছে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, বেগম জিয়ার জানাজায় সার্কের পাঁচ দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের নেতারা এসেছিলেন। এদের মধ্যে পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের মন্ত্রীরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
নতুন বছরের প্রথম দিনে সারা দেশে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মোট চাহিদার ৮৩ শতাংশ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে এবং আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে সরকার।
উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, সরকার এবার অনেক আগে থেকেই পাঠ্যপুস্তক যাতে সময় মতো ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়া যায় সে নিয়ে কাজ শুরু করেছিল এবং এ বিষয়ে অনেকাংশে সরকার সফল হয়েছে। আজকে ১ জানুয়ারিতে শিক্ষাবর্ষের চাহিদাকৃত প্রাথমিক এবং প্রাথমিক স্তরের ৩০ কোটি ২ লক্ষ ৫ হাজার ১০৪টি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে ২৪ কোটি ৫৯ লাখ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে, যা মোট পাঠ্যপুস্তকের ৮৩ শতাংশ। এর মধ্যে প্রাথমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ক্ষুদ্র নিগোষ্ঠীদের জন্য প্রস্তুতকৃত বইগুলো শতভাগ, ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ৯৫ শতাংশ, নবম এবং দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৮৬ শতাংশ, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৮২ শতাংশ এবং ব্রেইল পদ্ধতির ৭৭ শতাংশ বই নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সপ্তম শ্রেণির ৬৩ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণির ৫২ শতাংশ বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বছরের প্রথম দিনে। এই বছর যথেষ্ট সময় নিয়ে কাজ শুরু করার পরেও ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুতিতে কিছুটা সময় লেগেছে। প্রথম দিনে এই সময় লাগার কারণে এই দুই শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক হয়তো শিক্ষার্থীদের কাছে এখনো সবগুলো পুরোপুরি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ডিসেম্বরের ২৮ তারিখেই সবগুলো পাঠ্যপুস্তকের পিডিএফ কপি ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে যে কেউ এই পুস্তক প্রিন্ট আউট নিয়ে পড়তে সক্ষম হবেন।”
পাঠ্যপুস্তককে নির্ভুল করতে এবার নজিরবিহীন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। ১২৩টি পাঠ্যপুস্তকের ভুল শনাক্ত করে ৩০০ জনেরও বেশি অভিজ্ঞ শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে তা সংশোধন করা হয়েছে। ২১ দিনব্যাপী কর্মশালার মাধ্যমে ছাপার অস্পষ্টতা, বানান ও ভাষাগত ত্রুটিগুলো দূর করা হয়েছে। এমনকি প্রথমবারের মতো ইংরেজি সংস্করণের বইগুলোও বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় পরিমার্জন করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















