বিনোদন ডেস্ক :
ঈদে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সিনেমা ‘দম’-এর মূল অনুপ্রেরণা মো: নূর ইসলাম ৪ এপ্রিল বিকেলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন তার জীবনের সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা। রেদওয়ান রনি পরিচালিত এবং আফরান নিশো অভিনীত এই সিনেমাটি ২০০৮ সালে আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে অপহৃত নূর ইসলামের অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত।
‘দম’ সিনেমাটি দেখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মো: নূর ইসলাম ও তার স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন। নূর ইসলাম সিনেমাটিকে আন্তর্জাতিক মানের বলে উল্লেখ করেন একই সঙ্গে তিনি আফরান নিশোর অভিনয়কে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ বলে অবিহিত করেন। সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন তার অপহরণ সময়ের কিছু পরিস্থিতি ও অনুভূতির কথা।
শনিবার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিনেমার প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। নিশোর এই আবেগপ্রবণ মুহূর্তটি তার ভক্তমহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিজের অভিনীত চরিত্র এবং বাস্তব জীবনের নূরের লড়াই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন নিশো। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, দেখুন, দিনশেষে আমিও তো রক্ত-মাংসের গড়া মানুষ। এইটুকু বলার পরেই তিনি স্তব্ধ হয়ে যান এবং অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন।
চরিত্রের ভেতরে প্রবেশের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিশো জানান, তিনি কেবল অভিনয় করেননি, বরং গল্পের গভীরতা বোঝার জন্য নূরের গ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সেখানে নূরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাটানো সময় এবং তাদের জীবনের সংগ্রামের গল্প তাকে মানসিকভাবে প্রবল নাড়া দিয়েছে।
গলা ধরে আসা কণ্ঠে নিশো বলেন: ‘আমিও তো রক্তমাংসের মানুষ। নূরের জীবনের সেই কষ্টগুলো খুব কাছ থেকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। তাদের সেই জীবনযুদ্ধ এবং সত্য গল্পটাই আমাকে এই সিনেমার প্রতি টেনে এনেছে।’
চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে পুরোপুরি ভেঙে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন বলে জানান নিশো। দর্শকদের প্রতি তার আকুল আবেদন, তারা যেন প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ‘দম’ দেখেন এবং নূরের জীবনের আসল লড়াইটা উপলব্ধি করেন।
নূর ইসলাম জানান তাকে হত্যার জন্য গাধার পিঠে বসিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ঠিকমতো পানিও খেতে পারছিলেন না। গাধা হাঁটতে শুরু করলে স্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করেন। নূর ইসলাম জানান ওরা তাকে জবাই করার জন্য প্রস্তুত ছিল এবং তিনি খুব জোরে জোরে দোয়া ইউনুস পড়ছিলেন। হঠাৎ তিনি অনুভব করেন তার সারা শরীর গরম হয়ে গেছে এবং এক ঐশ্বরিক শক্তি অনুভব করেন। চার ঘণ্টা ধরে তাকে হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শেষে কমান্ডারের নির্দেশে ওরা তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় এবং জানায় তার ওপর আল্লাহর রহমত আছে তাই তাকে আর মারা যাবে না।
নূর ইসলাম ১৮ বছর পর কৃতজ্ঞতা জানান সে সময়ের আপামর জনসাধারণ টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি। তিনি বিশ্বাস করেন সব ধর্মের মানুষের দোয়া এবং মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই তিনি আজ বেঁচে আছেন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নূর ইসলাম বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের উদ্দেশে বলেন এই ৮৪ দিনের ঘটনা দুই ঘণ্টা আট মিনিটের সিনেমায় পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে তিনি চান বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ জানুক মানুষের দোয়ায় বরকত আছে। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নিজের ভেতরে যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্বাস আছে দম আছে ততক্ষণ পর্যন্ত হার মানা যাবে না।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নূর ইসলামের স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন। তার স্বামী বেঁচে আছেন এটা বিশ্বাস করা এবং বাংলাদেশে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার লড়াইটা করেছেন তিনি। ঘুরেছেন সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি অফিসে অফিসে। সবাই একসময় হাল ছেড়ে দিলেও হাল ছাড়েননি আনোয়ারা পারভীন। তিনি জানান তার মনে হতো নূর বেঁচে আছেন। তার বিশ্বাস ছিল নূর যদি মারা যান তবে তিনি টের পাবেন। অনেকেই মনে করত তিনি পাগল হয়ে গেছেন বা বেশি বেশি করছেন কিন্তু তার কেমন লাগত সেটা তিনি বোঝাতে পারবেন না। সবাই তো ধরেই নিয়েছিল নূর আর ফিরবেন না। কিন্তু সাংবাদিকরা তাকে অনেক সাহায্য করেছেন। নূর যে বেঁচে আছেন সেটা আরও দৃঢ় হয় সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যে। ওই সময় তিনি কত বিভিন্ন অফিসে গিয়েছেন এবং তারা বিরক্ত হয়েছেন কিন্তু তার আর কিছু করার ছিল না।
বড় পর্দায় মো. নূর ইসলামের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো সিনেমায় যার নাম থাকে শাহজাহান ইসলাম নূর এবং পূজা চেরি অভিনয় করেছেন স্ত্রীর চরিত্রে। সংবাদ সম্মেলনে আফরান নিশো অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। এই অভিনেতা জানান নূর ভাই এবং তার স্ত্রীকে এখন হয়তো সবাই ভালোই দেখছেন কিন্তু তাদের ভেতরে এখনো সেই সব দিনের কথা স্পষ্ট। নিশো জানান তারা যখন এই দম্পতির সঙ্গে কথা বলেছেন বা সময় কাটিয়েছেন তখন সেই ক্ষোভ ও হাহাকারটা দেখেছেন। ১৮ বছর আগের ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাগুলো এখনো তাদের হুবহু মনে আছে কারণ সেগুলো এখনো জীবন্ত। সিনেমার পর্দায় সবটুকু যন্ত্রণার চিত্রায়ণ করা সম্ভব নয় কারণ সেই অভিজ্ঞতার তীব্রতা দর্শকদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই তারা একটা সর্বজনীন জায়গা থেকে কাজটি করেছেন। মো. নূর ইসলাম ও আনোয়ারা পারভীন যখন কথা বলছিলেন তখন অনেকবারই চোখ ছলছল করে উঠেছে পূজার এবং গলা ধরে এসেছে। সেই অনুভূতিগুলো কাটিয়ে পূজা জানান তারা বাস্তব জীবনের নায়ক ও নায়িকা এবং নিজের চরিত্রের অনুপ্রেরণা তিনি তাদের কাছ থেকেই নিয়েছেন।
২০২৩ সালে মো. নূর ইসলামের গল্পটি পড়েন নির্মাতা রেদোয়ান রনি। সে সময় তিনি সিনেমা নির্মাণের জন্য অন্য একটি গল্প নিয়ে এগোচ্ছিলেন কিন্তু এই ঘটনাটি তাকে এতটাই বিচলিত করে যে এই গল্পটি নিয়েই তিনি নির্মাণ করে ফেলেন তার নতুন সিনেমা। সংবাদ সম্মেলনে রেদোয়ান রনি জানান গল্পটি যখন প্রথম পড়েছেন তখন তিনি কেঁদেছেন এবং যখন প্রথম নূর ভাইয়ের সঙ্গে গল্প শোনার জন্য বসেছেন তখন দুজন একসঙ্গে কেঁদেছেন। নূর ভাই তাকে তার ডায়েরিটা দিয়েছিলেন এবং সেটা পড়লে বোঝা যায় কেন এটি দমের গল্প এবং কেন এটি বাংলাদেশের বা বাংলাদেশির জিতে যাওয়ার গল্প। সেটাই তারা পর্দায় তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তার একটা টেনশন ছিল নূর ভাই সিনেমাটি দেখে কী বলবেন। সিনেমা দেখে এসে তিনি যখন তাদের জড়িয়ে ধরেছেন তখন রনি চিন্তামুক্ত হয়েছেন।
‘দম’ সিনেমা প্রযোজনা করেছে এসভিএফ আলফাআই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড এবং চরকি। এসভিএফ আলফাআই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার শাকিল দর্শকদের এবং সিনেমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এমন অদম্য সাহসিকতার একটি গল্প ও বাংলাদেশের গল্প যেন সবাই দেখতে পারে সেজন্য সারা দেশেই সিনেমাটি পরিবেশিত হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি। তিনি আরও জানান ২৪ এপ্রিল থেকে সিঙ্গেল স্ক্রিনেও মুক্তি পাবে ‘দম’। নির্মাতা রেদোয়ান রনির সঙ্গে ‘দম’ সিনেমার চিত্রনাট্য করেছেন সৈয়দ আহমেদ শাওকী আলআমিন হাসান নির্ঝর মো. সাইফুল্লাহ রিয়াদ এবং রবিউল আলম রবি।
বিনোদন ডেস্ক 
























