নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি জুলাই সনদ থেকে সরে যায়নি, আঁকড়ে ধরেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেছেন বিএনপি জুলাই সনদ থেকে সরে গেছে। আমি বলতে চাই বিএনপি জুলাই সনদ থেকে সরে যায়নি, বিএনপি জুলাই সনদ আঁকড়ে ধরেছে।
এ সময় জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রক্রিয়াকে ‘ফ্রডুলেন্ট’ বা প্রতারণামূলক বলে আখ্যা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সংসদকে অবজ্ঞা করে বাইরে ভিন্ন পন্থায় সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, ‘জুলাই সনদের মূল দলিলের সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এমন আদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কীভাবে দেয়? ১৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ যখন কোনো গণভোট হয়নি, তখন কোন এখতিয়ারে ব্লু পেপারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম তৈরি করা হলো? এটি সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন সম্ভব নয়। বড় সংস্কারের জন্য জনগণের সরাসরি রায় বা গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটিতে এসে সংবিধান সংশোধনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে পুঁজি করে কোনো বিশেষ দলের ‘রাজনৈতিক ব্যবসা’ এবং বিরোধী দলের গঠিত ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র কঠোর সমালোচনাও করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরোধী দল এনসিপিকে ইঙ্গিত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে ‘উজিরে খামখা’ বা মন্ত্রী সেজে থাকার সুখ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে প্রকৃত দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, একটি দল দীর্ঘ দিন ৭১’র চেতনা বিক্রি করতে করতে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আবার জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে নতুন করে ব্যবসার চেষ্টা চলছে। জুলাই বিপ্লব কোনো একক দলের নয়, এটি এ দেশের সকল মানুষের ত্যাগের ফসল। এই চেতনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কারের দোহাই দিয়ে নির্বাচন বিলম্বিত করার অপচেষ্টা বিএনপি বরদাশত করবে না। সংবিধান থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও ভাষণ সংক্রান্ত বিতর্কিত বিধানগুলো কেন এখনো সরানো হয়নি, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
জাতীয় সংসদে আওয়ামী আমলে ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার ও এ অর্থ দিয়ে ২৪টি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব ছিল বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দিয়ে ২৪টি পদ্মা সেতু বা ১৪টি মেট্রোরেল নির্মাণ করা সম্ভব ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৫ বছরে লুটপাটের যে মহোৎসব চলেছে তার চিত্র শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে। পাচার হওয়া এই বিশাল অংকের অর্থ ফেরত আনার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। কে বড় মুক্তিযোদ্ধা সেই বাহাস না করে দেশের সম্পদ রক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।’
ব্যাংক দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগে ব্যাংক দখল হতো গোয়েন্দা সংস্থার ভয় দেখিয়ে, আর এখন অনেকে ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে দখল করছে। এই স্টাইল বদলালেও লুণ্ঠন তো বন্ধ হয়নি। লুণ্ঠনের এই ধারা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াত ও এনসিপির সমর্থনে ছিলো দাবি করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ছিলো ভেতরে-বাইরে এই দুই (জামায়াত-এনসিপি) দলের সমর্থনে। একদল ছিলো যমুনার অভ্যন্তরে অন্যদল ছিলো যমুনার কিনারে। তারা এখন বলতে পারে যে ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতিকে এজন্যই ধন্যবাদ জানাই যে তিনি ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সরকারবিহীন অবস্থায় রাষ্ট্রের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিরোধীদলীয় চিফ হুইফসহ আরও কয়েকজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আছেন যারা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে তারা তখন স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। আগে যা ভালো ছিলো তা হঠাৎ করে এখন মন্দ হলো কীভাবে? এটা তো স্ববিরোধীতা।
তিনি জামায়াত ও এনসিপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ছিলো ভেতরে-বাইরে এই দুই দলের সমর্থনে। একদল ছিলো যমুনার অভ্যন্তরে অন্যদল ছিলো যমুনার কিনারে। তারা এখন বলতে পারে যে আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যঙ্গ করে বলেন, আমার নতুন দলের নতুন বন্ধুরা নতুন বন্দোবস্তের নতুন রাজনীতি করছে পুরোনো বন্দোবস্তের আদলে। জুলাই যোদ্ধারা আওয়ামী যোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যায় চট্টগ্রামে এসব আমি বলতে চাচ্ছি না। সুতরাং বন্দোবস্ত নতুন হলে রীতি-নীতিও নতুন হতে হবে।
দীর্ঘ ১৯ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, গুম ও নির্বাসনের স্মৃতিচারণ করে আবেগঘন কণ্ঠে এক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, গুম হওয়া মানুষ আর ফিরে না আসা স্বজনদের যে হাহাকার, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। শহীদদের রক্ত আর জনগণের ত্যাগের বিনিময়ে যে গণতান্ত্রিক বিজয় অর্জিত হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই কলঙ্কিত হতে দেওয়া যাবে না।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ তার পরিবারের অনিশ্চিত দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, সাড়ে ৯ বছরের নির্বাসন ও বিদেশের জেলখানায় কাটানো সময়গুলো তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইলিয়াস আলীর মতো গুম হওয়া নেতাদের পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের সন্তানরা আজও বাতায়ন খুলে বাবার জন্য অপেক্ষা করে। তাদের সেই অশ্রুর মর্যাদা দিতে হলে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র গড়তে হবে যেখানে আর কোনো মানুষ গুম হবে না, কারও অধিকার হরণ করা হবে না। ২০২৬-এর এই নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি যেন বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচার ভিত্তিক হয়, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন, তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। এটি এখন সংসদীয় আইনে সাব্যস্ত। এই জাতীয় ইস্যু নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করা জাতির জন্য সম্মানজনক নয়।
যারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইতিহাসের আকাশে যারা তারা হয়ে আছেন, তাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘আমি আজকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম, আমাদের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের শিশু মুক্তিযোদ্ধা। তাকে আমি স্বাগত জানাই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ মন্তব্যে সংসদ সদস্যদের হাসির রোল পড়ে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে সম্মান প্রদর্শন করতে কসুর করি না মাননীয় স্পিকার।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান দাবি করেন, সেটা আমার ভালো লাগে। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও ওই পাড়ে আছেন।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















