Dhaka সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিজেরা বাঁচতে এখন রোহিঙ্গাদের দ্বারস্থ মিয়ানমারের জান্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। সাত বছর আগে যে জাতিগত নিধন অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, এখন সেই রোহিঙ্গাদের কাছেই সহায়তা চায় মিয়ানমারের জান্তা।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, জাতিগত নির্মূলের প্রায় সাত বছর পর রোহিঙ্গাদের সাহায্য কামনা করেছে জান্তা।

রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার থেকে বিবিসি জানতে পেরেছে যে, তাদের মধ্যে অন্তত ১০০ জনকে সাম্প্রতিক সপ্তাহে যুদ্ধরত জান্তার পক্ষে লড়াই করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য তাদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

রাখাইনের রাজধানী সিত্তওয়ের কাছে বাও দুফা ক্যাম্পে বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সি মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি ভীত ছিলাম, কিন্তু আমাকে যেতে হয়েছিল।’

মোহাম্মদের তিনটি বাচ্চা রয়েছে। বাও দুফা ক্যাম্পে অন্তত দেড় লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

মোহাম্মদ জানান, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ক্যাম্পের এক নেতা গভীর রাতে তার কাছে এসে বলেন, তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এগুলো সেনাবাহিনীর আদেশ। এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছিল।

নির্মম বাস্তবতা হলো, মোহাম্মদের মতো অনেক রোহিঙ্গারই কোনো নাগরিকত্ব নেই। এমনকি সম্প্রদায়ের বাইরে যাওয়াও তাদের বারণ। এমন আরো অনেক বৈষম্যের শিকার তারা।

বিবিসি বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে কথা বলেছে যারা নিশ্চিত করেছে যে, সেনা কর্মকর্তারা ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরছেন এবং তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য রিপোর্ট করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে তাদেরকে অস্ত্র চালানোর সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। আর সেনাবাহিনীতে যুক্ত করতে রোহিঙ্গা পুরুষদেরকে খাবার, নিরাপত্তা এবং সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রাখাইনে বহু বছর ধরে সংগ্রাম করে বসবাস করে আসছিলেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তবে ২০১২ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে অস্থায়ী শিবিরে থাকতে বাধ্য করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে এই জনগোষ্ঠীর ওপর নির্মম হত্যা, ধর্ষন, ও অগিকাণ্ড ঘটানোর কাজ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে বর্তমানে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমার।

সেই সময় রাখাইনের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিলেও এখনও সেখানে ৬ লাখ রোহিঙ্গা মানবেতর জীবন যাপন করছে। এখন তাদেরই সাহায্য নিতে চাচ্ছে মিয়ানমার জান্তা।

মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করা প্রতাপশালী সেই সেনাবাহিনী এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে পেরে উঠছে না জান্তা। শহরের পর শহর হাতছাড়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় জান্তার হয়ে লড়াই করতে রোহিঙ্গাদের জোর করে বাহিনীতে যুক্ত করার চেষ্টা করছে সামরিক জান্তা।

শুধু রাখাইনেই নয়, দেশের আরও কয়েকটি স্থানেও যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে জান্তা বাহিনী। অনেক সেনা সদস্য হতাহত হওয়ার পাশাপাশি আত্মসমর্পণও করেছে অনেকে। কিছু সেনা সদস্য পক্ষ ত্যাগ করে বিদ্রোহী দলেও যোগ দিয়েছে, এদের শুন্যস্থান পূরণ করা সেনাবাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, এ কারণেই হয়ত কামানের গোলার মুখে ঠেলে দিতে তাদেরকে আবারও লক্ষ্যে পরিণত করা হচ্ছে। মোহাম্মদ জানিয়েছেন, তাকে সিত্তওয়ের ২৭০ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বন্দুকে গুলি ভরা এবং ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আমাদেরকে। বন্দুকের বিভিন্ন অংশ খোলা ও ফের সংযোজন কীভাবে করতে হয় তাও দেখিয়েছে।’

আক্ষেপ করে মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি কেন লড়াই করছি বুঝতে পারছিলাম না। তারা যখন একটি রাখাইন গ্রামের দিকে গুলি করতে বলে আমি গুলি করি।’

১১ দিন লড়াইয়ের পর তাদের রসদ ভাণ্ডারে গোলা এসে পড়ে। খাবারের সংকট দেখা দেয়। অনেক রোহিঙ্গা যোদ্ধাকে মরতে দেখেছেন মোহাম্মদ। গোলায় আহত হন তিন নিজেও। পরে তাকে সিত্তওয়েতে নিয়ে আসা হয়।

তবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে রোহিঙ্গা যুবকদের ব্যবহার করার কথা অস্বীকার করেছে। বাহিনীটির মুখপাত্র জেনারেল জাও মিন তুন বলেছেন, রোহিঙ্গাদের যুদ্ধে পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, তাই আমরা তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করতে বলেছি।

কিন্তু বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সিত্তওয়ের কাছে পাঁচটি ভিন্ন শিবিরের সাতজন রোহিঙ্গা যুবকের সবাই মোহাম্মদের মতো একই কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, অন্তত ১০০ রোহিঙ্গাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

নিজেরা বাঁচতে এখন রোহিঙ্গাদের দ্বারস্থ মিয়ানমারের জান্তা

প্রকাশের সময় : ১১:৩৪:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ এপ্রিল ২০২৪

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। সাত বছর আগে যে জাতিগত নিধন অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, এখন সেই রোহিঙ্গাদের কাছেই সহায়তা চায় মিয়ানমারের জান্তা।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, জাতিগত নির্মূলের প্রায় সাত বছর পর রোহিঙ্গাদের সাহায্য কামনা করেছে জান্তা।

রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার থেকে বিবিসি জানতে পেরেছে যে, তাদের মধ্যে অন্তত ১০০ জনকে সাম্প্রতিক সপ্তাহে যুদ্ধরত জান্তার পক্ষে লড়াই করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য তাদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

রাখাইনের রাজধানী সিত্তওয়ের কাছে বাও দুফা ক্যাম্পে বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সি মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি ভীত ছিলাম, কিন্তু আমাকে যেতে হয়েছিল।’

মোহাম্মদের তিনটি বাচ্চা রয়েছে। বাও দুফা ক্যাম্পে অন্তত দেড় লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

মোহাম্মদ জানান, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ক্যাম্পের এক নেতা গভীর রাতে তার কাছে এসে বলেন, তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এগুলো সেনাবাহিনীর আদেশ। এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছিল।

নির্মম বাস্তবতা হলো, মোহাম্মদের মতো অনেক রোহিঙ্গারই কোনো নাগরিকত্ব নেই। এমনকি সম্প্রদায়ের বাইরে যাওয়াও তাদের বারণ। এমন আরো অনেক বৈষম্যের শিকার তারা।

বিবিসি বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে কথা বলেছে যারা নিশ্চিত করেছে যে, সেনা কর্মকর্তারা ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরছেন এবং তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য রিপোর্ট করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে তাদেরকে অস্ত্র চালানোর সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। আর সেনাবাহিনীতে যুক্ত করতে রোহিঙ্গা পুরুষদেরকে খাবার, নিরাপত্তা এবং সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রাখাইনে বহু বছর ধরে সংগ্রাম করে বসবাস করে আসছিলেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তবে ২০১২ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে অস্থায়ী শিবিরে থাকতে বাধ্য করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে এই জনগোষ্ঠীর ওপর নির্মম হত্যা, ধর্ষন, ও অগিকাণ্ড ঘটানোর কাজ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে বর্তমানে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমার।

সেই সময় রাখাইনের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিলেও এখনও সেখানে ৬ লাখ রোহিঙ্গা মানবেতর জীবন যাপন করছে। এখন তাদেরই সাহায্য নিতে চাচ্ছে মিয়ানমার জান্তা।

মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করা প্রতাপশালী সেই সেনাবাহিনী এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে পেরে উঠছে না জান্তা। শহরের পর শহর হাতছাড়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় জান্তার হয়ে লড়াই করতে রোহিঙ্গাদের জোর করে বাহিনীতে যুক্ত করার চেষ্টা করছে সামরিক জান্তা।

শুধু রাখাইনেই নয়, দেশের আরও কয়েকটি স্থানেও যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে জান্তা বাহিনী। অনেক সেনা সদস্য হতাহত হওয়ার পাশাপাশি আত্মসমর্পণও করেছে অনেকে। কিছু সেনা সদস্য পক্ষ ত্যাগ করে বিদ্রোহী দলেও যোগ দিয়েছে, এদের শুন্যস্থান পূরণ করা সেনাবাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, এ কারণেই হয়ত কামানের গোলার মুখে ঠেলে দিতে তাদেরকে আবারও লক্ষ্যে পরিণত করা হচ্ছে। মোহাম্মদ জানিয়েছেন, তাকে সিত্তওয়ের ২৭০ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বন্দুকে গুলি ভরা এবং ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আমাদেরকে। বন্দুকের বিভিন্ন অংশ খোলা ও ফের সংযোজন কীভাবে করতে হয় তাও দেখিয়েছে।’

আক্ষেপ করে মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি কেন লড়াই করছি বুঝতে পারছিলাম না। তারা যখন একটি রাখাইন গ্রামের দিকে গুলি করতে বলে আমি গুলি করি।’

১১ দিন লড়াইয়ের পর তাদের রসদ ভাণ্ডারে গোলা এসে পড়ে। খাবারের সংকট দেখা দেয়। অনেক রোহিঙ্গা যোদ্ধাকে মরতে দেখেছেন মোহাম্মদ। গোলায় আহত হন তিন নিজেও। পরে তাকে সিত্তওয়েতে নিয়ে আসা হয়।

তবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে রোহিঙ্গা যুবকদের ব্যবহার করার কথা অস্বীকার করেছে। বাহিনীটির মুখপাত্র জেনারেল জাও মিন তুন বলেছেন, রোহিঙ্গাদের যুদ্ধে পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, তাই আমরা তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করতে বলেছি।

কিন্তু বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সিত্তওয়ের কাছে পাঁচটি ভিন্ন শিবিরের সাতজন রোহিঙ্গা যুবকের সবাই মোহাম্মদের মতো একই কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, অন্তত ১০০ রোহিঙ্গাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।