নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা মহানগর ও শহরতলীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং পদ্ধতিতে বাস পরিচালনার লক্ষ্যে দুই দিনব্যাপী সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিক নেতা, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সভায় নতুন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চের মাঠ প্রাঙ্গণ (গুলিস্তান) এলাকায় এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সভার দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যৌথ আয়োজনে দুই দিনব্যাপী এ সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সভার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে আরবানটেক মুভ লিমিটেড।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকবে। কাউন্টার ও ই-টিকিটিংয়ের মাধ্যমে ভাড়া আদায় করা হবে এবং নগদ লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। রুটভিত্তিক কোম্পানির আওতায় নির্ধারিত সময় ও রোটেশন অনুযায়ী বাস চলবে। যাত্রার শুরু ও শেষ স্থানে কাউন্টার থাকবে। এতে চালক, শ্রমিক ও মালিক তিন পক্ষই ন্যায্য আয়ের নিশ্চয়তা পাবে।
সভাপতি ও প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, নগর ও শহরতলীর বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৫-১৬ মাসে পুলিশ প্রশাসন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী একটি সুস্থ, শৃঙ্খলিত ও জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাস্তবতায় দেখা গেছে বাসের নির্দিষ্ট রুট নেই, চালকদের কাজের সময় নির্ধারিত নয়, কম্পানি ও মালিকের মধ্যে সুস্পষ্ট চুক্তির অভাব রয়েছে এবং যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট স্টপেজ না থাকায় প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতামূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে যাত্রী ও পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নগদ অর্থ লেনদেনের কারণে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যার দায় গিয়ে পড়ছে মালিক, শ্রমিক ও পুলিশের ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং পদ্ধতিতে বাস পরিচালনাই এই সংকট থেকে উত্তরণের কার্যকর পথ। নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে যাত্রী ওঠানামা, নির্ধারিত কাউন্টার থেকে যাত্রা শুরু ও শেষ, রুটভিত্তিক সময়সূচি ও রোটেশন পদ্ধতিতে বাস ছাড়ার মাধ্যমে যানজট কমানো এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন চালু হলে চাঁদাবাজির সুযোগও বন্ধ হবে।
মো. সাইফুল আলম বলেন, এই নতুন ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা এক পয়সাও কমানো হবে না। বরং যানজট কমলে ট্রিপ বাড়বে, চালকদের আয় বাড়বে এবং কাজের চাপ কমবে। মালিকদের মালিকানা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং কম্পানির মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে আয় বণ্টন করা হবে। একদিনের প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হতে পারে, যা পরদিনই আয়ের মাধ্যমে ফেরত পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, ডিএমপি কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে এই কার্যক্রম শুরু হলে প্রথম তিন মাস নিয়ম মেনে চলা যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না। নির্দিষ্ট স্টপেজ ও নিয়ম মানলে কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতন করতে মাইকিং, গণবিজ্ঞপ্তি, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালানো হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, এই উদ্যোগ কোনো একক সংগঠনের সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। সবাই একযোগে সহযোগিতা করলে ঢাকায় একটি সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও সম্মানজনক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাঁচ দিনের পরীক্ষামূলক অনুশীলনের পর ষষ্ঠ দিন থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ই-টিকিটিং চালুর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
প্রধান অতিথি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, এই ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে সড়কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ প্রশাসন সব সময় কাজ করে যাচ্ছে। এতে মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। চালক ও মালিকদের উৎসাহ দিতে আমরা সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করব। কেউ হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বক্তারা আরো বলেন, নগদ লেনদেন বন্ধ হলে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির সুযোগ থাকবে না। নিয়ম ভাঙলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করার ব্যবস্থাও রাখা হবে।
বক্তারা বলেন, ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাস চলাচলে কোনো নির্দিষ্ট রুট, শৃঙ্খলা, স্টপেজ কিংবা আধুনিক টিকিটিং ব্যবস্থা না থাকায় যানজট, দুর্ঘটনা, যাত্রী হয়রানি ও চাঁদাবাজি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং পদ্ধতি ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
তারা জানান, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৫-১৬ মাস ধরে পুলিশ প্রশাসন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, ডিটিসিএ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) মো. সরওয়ার। সভাপতি ও প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির খান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























