শুক্রবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৫:৩৪ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ : দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টায় বেবিচক

রিপোর্টারের নাম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

বিশেষ প্রতিনিধি
ভূয়া করোনা সনদ নিয়ে বিদেশ গিয়ে ধরা পড়া যাত্রীদের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। একে একে বন্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। বাংলাদেশের যাত্রীদের বিরুদ্ধে আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। একদিকে আকাশপথে যাত্রীর সংকট, এর মধ্যে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপে বিপর্যয়ের মুখে বিমান। সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, ইতালিতে বাংলাদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিষয়ে দেশটির সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এত বড় কঠোর সিদ্ধান্তের কারণও জানতে চাওয়া হয়েছে। শুধু ইতালি নয়, জাপানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, চীনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে দুই এয়ারলাইন্স। এছাড়া প্রত্যাহারের পর দ্বিতীয়বার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তুরস্ক এবং বাংলাদেশিদের জন্য কড়া বিধিবিধান প্রস্তুত করে দিয়েছে সংযুক্ত আরব-আমিরাত। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এসব ঘটনায় অবশ্যই আমাদের দেশের ল্যাকিংস আছে। তা না হলে তারা কীভাবে বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে? দেশে জাল করোনা রিপোর্ট দেয়াসহ যেসব ঘটনা ঘটেছে, বিশ্বের দেশগুলো তা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। এতে করে বাংলাদেশিদের ওপর বিভিন্ন দেশের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। করোনায় এমনিতে উন্নত দেশগুলো সংকটের মধ্যে আছে, এর মধ্যে বাংলাদেশিদের ঢুকতে দিয়ে কেউ আর সংকট বাড়াতে চাইছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভিডিও কনফারেন্সে ইতালির সিভিল এভিয়েশন জানিয়েছে, দেশটি স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতালির স্বাস্থ্য বিভাগের অবজারভেশন অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা সেদেশে গিয়ে ঠিকমতো কোয়ারেন্টিন মানছেন না। তারা বাইরে চলাফেরা করছেন। তাদের কোনোমতেই কোয়ারেন্টিনে বাধ্য করা যাচ্ছে না। তাই দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, বাংলাদেশি প্রবাসীরা ইতালির ক্ষতি করছেন। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা। বাংলাদেশি প্রবাসীদের এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত সরকারও। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেবিচক বিদেশগামীদের জন্য আরও কঠোর বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুন আরোপ করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ গমনকারীদের জন্য ‘করোনা নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নেয়া হচ্ছে আরও পদক্ষেপ। বেবিচক সূত্র জানায়, যাত্রীদের খামখেয়ালিপনার কারণে এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো। যাত্রীদের জন্য বেবিচক আরও কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্ক্রিনিংয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে মেডিকেল অফিসার চাওয়া হয়েছে। এতদিন এ দায়িত্বপালন করত বেবিচকের সিকিউরিটি অফিসাররা।
একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এ বিষয়ে আমরা এখনও তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখিনি। তবে সরকারের উচিত করোনা সার্টিফিকেটগুলো কাগজে বা হার্ডকপিতে না রেখে সম্পূর্ণ অনলাইনে করে দেয়া। কারণ কাগজে রিপোর্ট দিলে তা ঘষামাজার সুযোগ থাকে। অনলাইনে এমনভাবে রিপোর্ট দিতে হবে যাতে এনআইডি নম্বর দিলেই রিপোর্ট চলে আসে। এতে একজন প্রবাসী যে দেশেই যাবে সেদেশের ইমিগ্রেশন পুলিশও সহজে তার রিপোর্টটি দেখে নিতে পারবে। এভাবে করলে জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব। যদি এখন থেকেই উদ্যোগ নেয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের বিদেশযাত্রা সুখকর হবে না।
একের পর এক দেশ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসার বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, স্ক্রিনিং, হেলথ কার্ড পূরণসহ বাংলাদেশ থেকে যে প্রক্রিয়ায় বিমানযাত্রীরা বিদেশে যাচ্ছেন, এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন (আইকাও) স্বীকৃত। এই প্রক্রিয়া ঠিকই আছে। তবে বিদেশে গিয়ে ঠিকমতো কোয়ারেন্টিনে না থাকলে আমাদের কিছু করার থাকে না। এছাড়া সব যাত্রী বাধ্যতামূলক টেস্ট করে গেলে সেদেশে গিয়ে আক্রান্তের সংখ্যাটা কমে যাবে, দেশের ভাবমূর্তিও উন্নতি হবে। তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে মিডিয়ায় যেভাবে এককভাবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, তা দুঃখজনক। আমাদের জানা দরকার, ইতালি কেবল বাংলাদেশের নাগরিকদের নয়, বরং তারা ১৩টি দেশের নাগরিকদের সেদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। যেসব দেশে এ হার উর্ধ্বমুখী তাদের ইতালিতে প্রবেশ করতেই দেয়া হচ্ছে না। আমরা বিমানবন্দরের বহির্গমন গেটে স্ক্রিনিংয়ের জন্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চেয়েছি। স্বাস্থ্য অধিদফতর ২-৩ জন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দেবে বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। তারা আসলে স্ক্রিনিং আরও ভালোভাবে করা হবে।
এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার বিদেশি গণমাধ্যমের এক খবরে বলা হয়েছে, ১৩ জুলাই ইতালির রোমে মোট ২৪ জন নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন। যার মধ্যে ২২ জনই বিদেশ থেকে ফিরেছেন। ওই ২২ জনের মধ্যে ২০ জনের বাংলাদেশ থেকে আসা ফ্লাইটের সাথে সংযোগ রয়েছে। বাকি দুজনের মধ্যে একজন ফিলিপাইন এবং অন্যজন ব্রাজিল হতে আগত। রোমের স্বাস্থ্য বিভাগ-১ অঞ্চলে, গত ২৪ ঘন্টায় নতুন একজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ওই ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক। ঢাকা থেকে আসা ফ্লাইটের সাথে যার সংযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ-২ অঞ্চলে, উক্ত সময়ে নতুন ১৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন যারা সবাই বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজন। ‘ঢাকা থেকে আসা ফ্লাইট’ এর ঘটনার পর তাদের পরীক্ষা করা হয়েছিল। রোমের স্বাস্থ্য বিভাগ-৩ অঞ্চলে, নতুন ২ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এদের একজন বাংলাদেশের নাগরিক, ঢাকা থেকে আসা ফ্লাইটের সাথে যার সংযোগ রয়েছে। আরেকজন ৮৩ বছর বয়সী এক নারী যার পরিবারকে আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ-৬ অঞ্চলে, গত ২৪ ঘন্টায় একজন শনাক্ত হয়েছেন যিনি ফিলিপাইন থেকে ইতালি ফিরেছেন। খবরে বলা হয়, লাৎজিও অঞ্চলে ৮৯২ জন সক্রিয় করোনা রোগী রয়েছেন। এদের মধ্যে ৬৯০ জন বাসায় আইসোলেশনে আছেন। ১৯১ রয়েছেন হাসপাতালে। অন্য ১১ জন আছেন হাসপাতালেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আবহাওয়া

%d bloggers like this:
%d bloggers like this: