যশোর জেলা প্রতিনিধি :
আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনকে দেশপ্রেমিক ও দেশবিরোধীদের লড়াই হিসেবে উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, একটি চক্র এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নিয়ে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। ভোট গণনায় দেরি করার উসিলায় কারচুপির চেষ্টা করা হলে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করতে হবে।
সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে যশোর সদর উপজেলার উপশহর কলেজ মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি একথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একটি দল ৫ আগস্টের পর থেকে মা-বোনদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে এবং তাদের ঘরে বন্দি রাখতে চাচ্ছে। তারা সাধারণ মানুষের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। যারা মানুষকে এমন অসৎ প্রস্তাব দেয়, তারা কীভাবে ‘সৎ লোকের শাসন’ কায়েম করবে?
তারেক রহমান বলেন, একটি দলের প্রধান বিদেশি মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ক্ষমতায় গেলে তারা নারীদের কোন চোখে দেখবেন। অথচ গতরাতেই সেই নেতা কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। যে দল নারীদের নিয়ে এমন আপত্তিকর কথা বলে, তারা ক্ষমতায় গিয়ে দেশবাসীকে ভালো কিছু দিতে পারবে না। তাদের আসল চরিত্র ধরা পড়ে যাওয়ায় এখন তারা ‘অ্যাকাউন্ট হ্যাক’ হওয়ার মতো জলজ্যান্ত মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের অ্যাকাউন্ট থেকে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য প্রচার প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা জাতির সামনে বলছেন আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন আপনাদের হ্যাক-ম্যাক কিচ্ছু হয় নাই। বাচাঁর জন্য আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন। যারা নির্বাচনের আগে জনগণের সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারেন তারা নির্বাচনের পরে কী পরিমাণ মিথ্যা কথা বলতে পারে এটি আমাদের সহজেই বোধগম্য।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, একটি দল সকাল-বিকাল মিথ্যা কথা বলে। এদের কারণে একাত্তরে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। ফলে তাদেরকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী এদেশের নারীদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়। সে কারণে দলটির সবথেকে বড় নেতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। আবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে লক্ষ-কোটি কর্মজীবী মা-বোনদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছেন। এখন তারাই আবার নিজেদের নারী কর্মীদেরকে গ্রামে গ্রামে মা-বোনেদের কাছে পাঠাচ্ছে তাদের এনআইডি নাম্বার আর বিকাশ নাম্বার নেওয়ার জন্য। এরা হয়তো কাউকে কিছু টাকা বিকাশ করেও দেবে। কিন্তু, এরপর আর তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের (জামায়াতের) নারী কর্মীরাওতো ঘর থেকে বের হয়ে তাদের দলের কাজে যায়। তাহলে আমরা কি এখন প্রশ্ন করতে পারি না তাদের নারী কর্মীদের কাছে যে, আপনাদের দলের নেতা দেখুন আপনাদের সম্পর্কে কী নোংড়া চিন্তা করেন।
তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় নবী নবী করিম (স.) এর স্ত্রী বিবি খাদিজা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী নারী। বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের যে বাহিনী ছিল তাদের লোক লস্কর, যত রকম সরঞ্জাম ছিল যুদ্ধের খাবার-দাবার সকল কিছুর আয়োজন করেছিল হযরত খাদিজা (রা.) তার অবস্থান থেকে। শুধু তাই নয় বদরের যুদ্ধে যে সকল মুসলমান সৈনিকেরা আহত হয়েছিল তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও হযরত আয়েশার মাধ্যমে করা হয়েছিল সেদিন। যে নার্সিং সিস্টেম এখন আমরা দেখি সেই নার্সিং সিস্টেম সেই সময় হযরত আয়েশার নেতৃত্বেই হয়েছিল। আমরা গতকাল দেখেছি এই রাজনৈতিক দলটির (জামায়াতে ইসলাম) এই নেতাটি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি কর্মজীবী নারী, কর্মজীবী মা, কর্মজীবী মেয়ে সন্তান সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর একটি কথা বলেছেন।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা নিজেদের দেশের মানুষকে এইভাবে আপত্তিকর বিশ্লেষণে বিশ্লেষণ করে তাদের কাছ থেকে জনগণ ভালো কিছু আশা করতে পারে? তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব নয়।
শুধু তাই নয়, এই আপত্তিকর কথা বলার পরে যখন তারা দেখলো বাংলাদেশের সকল মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে, তখন তারা বললো তাদের অ্যাকাউন্ট নাকি হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এইটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। কারণ, সেই বক্তব্য দেওয়ার পরে তারা আরো অনেক বক্তব্য দিয়েছে। অর্থাৎ তারা জাতির সামনে জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা বলেছে।
তারেক রহমান বলেন, যারা জনজণের সামনে প্রকাশ্যে মিথ্যা কথা বলতে পারেন তারা আর যাই হোক জনগণের বন্ধু হতে পারেনা। তাদের দলেওতো নারী কর্মী আছে বলে শুনেছি।
তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে, দেশের যদি উন্নয়ন করতে হয়, দেশকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ রাখলে চলবে না। আজকে যে গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানুষ গর্ব করে সেই শিল্প বাংলাদেশের নারীরা চালাচ্ছেন। এই শিল্পে অন্তত ৫০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের প্রতিদিনকার কষ্টের ফলে আজ সারা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প একটা বিখ্যাত শিল্পে পরিণত হয়েছে।

সেজন্যই এই নারী সমাজকে শুধু সহযোগিতা না, তাদেরকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারে থাকাকালে বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছিল। আজ দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার দল হিসেবে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি আমরা আপনাদের সমর্থনে ১২ তারিখের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারলে বিএনপি সকল মায়েদের কাছে, সকল গৃহিনীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেবো। যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ফ্যামিলির ন্যুনতম একজন মা বা গৃহিনী সরকারের কাছ থেকে একটা সুযোগ পাবেন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি পুরুষের পাশাপাশি নারীরা যদি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারে তাহলেই একমাত্র আমাদের এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। অন্যথায় কোনোভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পেছনে রেখে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারবে এটা আমরা আশা করতে পারি না। বাংলাদেশ তখনই উন্নতি করতে পারবে যখন নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করতে পারবো।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আজকে দেখতে পাচ্ছি বিগত স্বৈরাচারের সময় যেভাবে এদেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যেভাবে আমি-ডামি নির্বাচন করা হয়েছিল। যেভাবে নিশিরাতের নির্বাচন করা হয়েছিল-ওই যে দলটির কথা বললাম (জামায়াতে ইসলামী) যারা নিজের দেশের সন্তানদেরকে, নিজের দেশের নারীদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চাই এরা এখন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে কীভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। এরা এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি নাম্বার নেওয়ার জন্য, বিকাশ নাম্বার নেওয়ার জন্য।
এ প্রসঙ্গে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, এই খবর আছে আপনাদের কাছে? জবাবে জনতা বলেন, আছে।
তারেক রহমান জামায়াতকে উল্লেখ করে এই প্রসঙ্গে আরো বলেন, ‘তারা বলেন, তারা সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন। আরে ভাই আপনাদের এই প্রস্তাবটাইতো সবথেকে বড় অসৎ প্রস্তাব। আপনারা অসৎ কাজ শুরু করে কীভাবে মনে করেন যে, সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন?’
তিনি বলেন, আজকে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য, বাধাগ্রস্ত করার জন্য এরা উঠেপড়ে লেগেছে। সেজন্য আপনাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে আপনার সেই ভোটের অধিকারকে কেড়ে নিতে না পারে।
তিনি বলেন, নতুন গল্প শুনছি ইদানিং। এবার নাকি ভোট গণনা করতে অনেক সময় লাগবে। এদেশের মানুষ হয়তো এক যুগ ভোট দিতে পারেনি, কিন্তু ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের একেবারে যে নাই তা না। এদেশের মানুষ একানব্বই সালে ভোট দিয়েছে, ছিয়ানব্বই সালে ভোট দিয়েছে, ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গণনা করতে কেনম সময় লাগে বাংলাদেশের মানুষের সেই ধারণা আছে। কাজেই যদি কেউ ভোট গণনা করতে দেরি হবে উছিলাতে সুযোগ নিতে চাই তাহলে আপনাদেরকে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
জনসভায় তারেক রহমান ঘোষণা করেন, জনতার রায়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারলে সকল কৃষকের দশ হাজার টাকার কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। একইসাথে কৃষকদেরকে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হবে এবং স্বল্পসুদে কৃষিঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

যুবক-যুবতীদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য আইটি পাক স্থাপর্নসহ একাধিক বিকল্প গড়ে তোলা হবে। আখ চাষ বৃদ্ধি ও বন্ধ চিনিকল খুলে দেওয়া হবে। যশোরের ফুল যাতে বিদেশে রপ্তানি হতে পারে তার জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদার করা হবে।
তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উলাশী খাল খনন কর্মসূচির উল্লেখ করে বলেন, বিএনটি আবার ক্ষমতায় যেতে পারলে উলাশী খাল পুনরায় খননসহ দেশে হাজার হাজার খাল খনন করে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে। জিয়াউর রহমানের আমলে চালু হওয়া জিকে প্রকল্প আবার সচল করারও প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
বিএনপি চেয়ারম্যান ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ সকল ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের জন্য সম্মানি ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারলে এই ভাতা প্রদান করা হবে, যাতে সকল ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিরা সম্মানের সাথেই জীবন অতিবাহিত করতে পারেন।
তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক মানুষের অংশগ্রহণের উল্লেখ করে বলেন, এই দেশে যেমন মুসলমানের, তেমনি হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষের। আমরা সকল ধর্মের মানুষই একতাবদ্ধ হয়ে একাত্তরে দেশ স্বাধীন করেছি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আবার সবাই একতাবদ্ধ হয়েই কাঙ্খিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি যেখানে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যে, বাংলাদেশকে যদি সামনের দিকে বাড়াতে হয়, বাংলাদেশকে যদি সামনের দিকে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে সমগ্র জনগোষ্ঠীর এই যে অর্ধেক নারী সমাজ—তাদেরকে কখনো পেছনে রেখে সামনে এগোনো সম্ভব না। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, দেশকে পুনর্গঠন করতে হলে, দেশকে গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষ সকলকে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।”
তিনি বলেন, আমরা গতকাল দেখেছি, এই রাজনৈতিক দলটির এই নেতাটি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি কর্মজীবী নারী, কর্মজীবী মা, কর্মজীবী মেয়ে সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর একটি কথা বলেছে। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যারা নিজেদের দেশের মানুষকে এইভাবে আপত্তিকর বিশ্লেষণে বিশ্লেষণ করে, তাদের কাছ থেকে কি বাংলাদেশের জনগণ ভালো কিছু আশা করতে পারে? তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব নয়।
শনিবার বিকালে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ওই পোস্টে বলা হয়, “নারীর প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা অনুশোচনামূলক নয়- এটা নীতিগত। আমরা মনে করি না- নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটা অনুমোদন করেন না।
“আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়, তখন এটি অন্য কিছু নয় বরং অন্য রূপে পতিতাবৃত্তির মতই।”
ওই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। প্রায় ৯ ঘণ্টা পর জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের দলীয় প্রধানের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক করে’ ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তারা আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।
জামায়াতের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে যশোরের জনসভায় বিএনপি নেতা তারেক বলেন, শুধু তাই নয় প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এই আপত্তিকর কথা বলার পরে যখন তারা দেখল—বাংলাদেশের সকল মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে। তখন তারা বলল যে, তাদের অ্যাকাউন্ট বলে হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা, অ্যাকাউন্ট হ্যাক হতে পারে না। কারণ সেই বক্তব্য দেবার পরেও তারা আরও অনেক বক্তব্য দিয়েছে, অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। অর্থাৎ কী দাঁড়াল? দাঁড়াল যে- তারা সমগ্র জাতির সামনে জলজ্যান্তভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য মিথ্যে কথা বলছে। যারা জনগণের সামনে প্রকাশ্যে মিথ্যে কথা বলতে পারে, তারা আর যাই হোক জনগণের বন্ধু হতে পারে না।
এবারের নির্বাচন নিয়েও ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান।
তার কথায়, আজকে আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাচ্ছি যে, বিগত স্বৈরাচারের সময় যেভাবে এই দেশের মানুষের ভোটের অধিকারকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যেভাবে আমি-ডামি নির্বাচন করা হয়েছিল, যেভাবে নিশিরাতে নির্বাচন করা হয়েছিল; ওই যে যেই দলটির কথা বললাম—যারা নিজের দেশের সন্তানদেরকে, নিজের দেশের নারীদেরকে ঘরে আটকে রাখতে চায়, এরা এখন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে কীভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। এরা এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি নাম্বার নেওয়ার জন্য, বিকাশ নাম্বার নেওয়ার জন্য। এই খবর আছে আপনাদের কাছে? তারা বলে, তারা নাকি সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে। আরে ভাই, আপনাদের এই প্রস্তাবটাই তো সবচেয়ে বড় অসৎ প্রস্তাব! আপনারা অসৎ প্রস্তাব দিয়ে কাজ শুরু করে কীভাবে আপনারা মনে করেন যে, আপনারা সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন?

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আজকে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য, বাধাগ্রস্ত করার জন্য এরা উঠেপড়ে লেগেছে। সেই জন্য আজকে এখানে লক্ষ-জনতার উপস্থিতিতে আপনাদেরকে এবং আপনাদের মাধ্যমে সকল মা-বোন এবং সকল ভাই-বোনদেরকে, আপনাদেরকে এবং আপনাদের মাধ্যমে আপনাদের এলাকার সকল মানুষের কাছে আমি একটি আহ্বান জানাতে চাই—আপনাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে আপনার সেই ভোটের অধিকারকে কেড়ে নিতে না পারে আবার।
এবারের নির্বাচনে ভোট গণনায় সময় বেশি লাগতে পারে বলে ইসির তরফে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমান বলেন, নতুন গল্প শুনছি ইদানীং। নতুন গল্প শুনছি যে- এবার বলে ভোট গণনা করতে অনেক বেশি সময় লাগবে। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এই দেশের মানুষ হয়তো গত এক যুগ ভোট দিতে পারেনি; কিন্তু ভোট দেওয়ার যে অভিজ্ঞতা, তাদের নাই তা না। ’৯১ সালে ভোট দিয়েছে, ’৯৬ সালে ভোট দিয়েছে, ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গণনা করতে কেমন সময় লাগে, বাংলাদেশের মানুষের সেই ধারণা আছে। কাজেই যদি কেউ ভোট গণনা করতে দেরি হবে—এই উছিলা দিয়ে যদি কেউ কোনো সুযোগ নিতে চায়, প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনাদেরকে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
গত ২৩ জানুয়ারি ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ভোটগণনার ক্ষেত্রে এবার একটু সময় বেশি লাগবে। এবার ভোটাররা দুটো ব্যালটে ভোট দেবেন। এর সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের গণনা রয়েছে। এ কারণে গণনায় এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।
তারেক রহমান বলেন, আমি আগেই বলেছি—আমরা রাজনীতি করি, বিএনপি রাজনীতি করে এই দেশের মাটির জন্য, এই দেশের মানুষের জন্য। এবং সেই জন্যই বিএনপি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে আল্লাহর রহমতে যতবার সরকার গঠন করেছে, প্রত্যেক সময় বিএনপি চেষ্টা করেছে এমন কাজ করতে, যেই কাজগুলোর মাধ্যমে এই এলাকার মানুষের উন্নয়ন হয়। স্কুল-কলেজ তৈরি করা, রাস্তাঘাট তৈরি করাসহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমরা বিগত ১৫ বছর আমরা দেখেছি কীভাবে দেশের মানুষকে তার এলাকার উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে—দেশের যদি উন্নয়ন করতে হয়, দেশকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ রাখলে চলবে না। আজকে যে গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানুষ গর্ব করে, এই গার্মেন্টস শিল্প কারা চালাচ্ছে? এই গার্মেন্টস শিল্প তো বাংলাদেশের নারীরা চালাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পের মধ্যে অন্তত ৫০ লক্ষের ও বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছে। তাদের প্রতিদিনকার কষ্টের ফলেই আজ সারা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প একটি বিখ্যাত শিল্পে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, সেজন্যই প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এই নারী সমাজকে শুধু সহযোগিতা নয়, তাদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, সেই সময় তিনি বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়েছিলেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। আজ দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার দল হিসেবে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখের নির্বাচনে আপনাদের সমর্থনে আল্লাহর রহমতে বিএনপি তথা ধানের শীষ সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা বাংলাদেশের সকল মায়েদের কাছে, সকল গৃহিণীদের কাছে ঘরে ঘরে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিব। যেই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে, যেই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের গৃহিণী বা মা সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি সুযোগ বা সুবিধা পাবেন।
বিএনপি নেতা তারেক বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে, আজকে পুরুষের পাশাপাশি যদি নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারে অর্থনৈতিকভাবে, তাহলেই একমাত্র আমাদের এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। অন্যথায় কোনোভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সেজন্যই আমরা বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে আমরা আশা কোনোভাবেই করতে পারি না যে বাংলাদেশ উন্নতি করবে। বাংলাদেশ তখনই উন্নতি করবে যখন নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে আমরা ইনশাআল্লাহ কাজ করতে পারব।
সকাল থেকেই যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল থেকে দলীয় প্রার্থীসহ নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশ স্থলে আসতে শুরু করেন। এতে বেলা ১২টার মধ্যেই মাঠ পূর্ণ হয়ে যায়।
একপর্যায়ে উপশহর কলেজ মাঠ ছাপিয়ে পাশের ঈদগাহ ময়দান, উপশহর পার্ক ও বাদশা ফয়সাল ইসলামী ইনস্টিটিউটের মাঠ ছাপিয়ে আশেপাশের রাস্তা ও বাসা বাড়ির ছাদে জনসমুদ্র তৈরি হয়।
সমাবেশে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ৭ জেলার বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে ধানের শীষে ভোট চান।

প্রার্থীরা হলেন- মো. নুরুজ্জামান লিটন (যশোর-১), সাবিরা সুলতানা (যশোর-২), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩), মতিয়ার রহমান ফারাজী (যশোর-৪), রশীদ আহমাদ (যশোর-৫), মো. আবুল হোসেন আজাদ (যশোর-৬); রেজা আহাম্মেদ (কুষ্টিয়া-১), রাগীব রউফ চৌধুরী (কুষ্টিয়া-২), মো. জাকির হোসেন সরকার (কুষ্টিয়া-৩), সৈয়দ মেহেদী আহ্মেদ রুমী (কুষ্টিয়া-৪); শরীফুজ্জামান (চুয়াডাঙ্গা-১), মাহমুদ হাসান খান (চুয়াডাঙ্গা-২); মাসুদ অরুন (মেহেরপুর-১), মো. আমজাদ হোসেন (মেহেরপুর-২); মনোয়ার হোসেন (মাগুরা-১), নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২); আসাদুজ্জামান (ঝিনাইদহ-১), আব্দুল মজিদ (ঝিনাইদহ-২), মোহাম্মদ মেহেদী হাসান (ঝিনাইদহ-৩), রাশেদ খাঁন (ঝিনাইদহ-৪) ; বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম (নড়াইল-১), এ জেড এম ফরিদুজ্জামান (নড়াইল-২)।
তিনি বলেন, আজকে যারা ধানের শীষ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাদেরকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। তারা যাতে সংসদে যেতে পারে সেজন্য আপনাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখতে হবে এবং ভোট দিতে হবে। নির্বাচিত হতে পারলে এসব নেতা ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের দায়িত্ব নেবেন। আপনার এলাকা ও দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন।
বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের উলাশী খাল খননের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখে আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হলে আমরা সরকার গঠন করার সাথে সাথে আমরা উলাশী খালসহ সারা বাংলাদেশের খাল খনন শুরু করতে চাই। এছাড়া কৃষিকার্ড, তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেন তিন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা কি বাংলাদেশকে আগামী দিন গড়ে তুলতে চাই? বাংলাদেশকে যদি আগামী দিনে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে একটি কাজ , একটি স্লোগান। করব কাজ—গড়ব দেশ। সবার আগে—বাংলাদেশ। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আজ আসুন এই নির্বাচনকে শুধু নির্বাচন দেখলে হবে না। এই নির্বাচনকে দেখতে হবে রাইট এবং রংয়ের দিন হিসেবে, দেশপ্রেমিক এবং দেশবিরোধীদের দিন হিসেবে। এবং বাংলাদেশের মানুষ অতীতে কখনো ভুল করেনি, সকল সময় তারা দেশপ্রেমিকদের সমর্থন দিয়েছে। এবং তাই আমরাও আল্লাহর রহমতে আত্মবিশ্বাসী ইনশাআল্লাহ বিএনপি ১২ তারিখে আপনাদের সমর্থন পাবে। এবং আপনাদের সমর্থন নিয়েই বিএনপি শুরু করবে তার কাজ।
তারেক রহমান সোমবার খুলনার জনসভা শেষে হেলিকপ্টারে করে যশোর বিরামপুর স্কুল মাঠের হেলিপ্যাডে নামে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে। সেখান থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা গাড়িতে চড়ে উপশহর কলেজ মাঠের জনসভামঞ্চে পৌঁছান ২টা ৩০ মিনিটে। তিনি বক্তব্য শুরু করেন দুপুর ২টা ৩৯ মিনিটে। তিনি ৩৩ মিনিট বক্তব্য রাখেন যশোরের জনসভায়।
জনসভামঞ্চ থেকে নেমে তারেক রহমান জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শহীদ কয়েকজনের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
যশোর জেলা বিএনপি সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনের সঞ্চালনায় জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন তারেক রহমানের উপদেষ্টা সৈয়দ আহমেদ রুমী, কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, কুষ্টিয়ার জাকির হোসেন সরদার, নড়াইলের বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মেহেরপুরের জাভেদ মাসুদ মিল্টন এবং যশোরের মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু।
যশোর জেলা প্রতিনিধি 





















