স্পোর্টস ডেস্ক :
চরম ব্যাকফুটে থাকা অবস্থা থেকে সালমান আলি আঘার দারুণ সেঞ্চুরিতে ঘুরে দাঁড়ায় পাকিস্তান। দুলতে থাকা ম্যাচ চলে আসে শেষ ওভারের রোমাঞ্চে। সেখানে বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে স্নায়ুচাপ ধরে রাখেন এর আগে খরুচে বল করা রিশাদ হোসেন। শাহীন আফ্রিদিকে হতাশায় ডুবিয়ে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।
রোববার (১৫ মার্চ) মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছে ১১ রানে। আগে ব্যাট করে বাংলাদেশের ২৯০ রানের পুঁজির পিছু ছুটতে গিয়ে ১৭ রানে ৩ উইকেট হারালেও সালমানের সেঞ্চুরিতে ২৭৯ রানে থামে পাকিস্তানের ইনিংস।
এতে তিন ম্যাচ সিরিজ ২-১ ব্যবধানে নিশ্চিত করল স্বাগতিক। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে র্যাঙ্কিংয়ে নয়েও উঠল মেহেদী হাসান মিরাজের দল।
এর মাধ্যমে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে-তে টানা সিরিজ জেতার নজিরও গড়ল বাংলাদেশ। সবশেষ ২০১৫ সালে একে অপরের বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ-পাকিস্তান। সেবার পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ।
২৯১ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে শুরুটাই ভালো হয়নি পাকিস্তানের। বাংলাদেশের দুই পেসার তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানার দাপুটে বোলিংয়ে শুরুতেই তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে সফরকারীরা।
প্রথম ওভারে তাসকিনের বাড়তি লাফানো দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বিদায় নেন সাহিবজাদা ফারহান। দ্বিতীয় ওভারে নাহিদ রানার বলে নান্দনিক এক শটে ছক্কা মারেন মাজ সাদাকাত। দুই বল পরই বাউন্সারে তাকে ফিরিয়ে প্রতিশোধের হুঙ্কার ছোড়েন নাহিদ।
পরের ওভারে তাসকিনের আরেকটি দারুণ ডেলিভারি এলোমেলো করে দেয় মোহাম্মাদ রিজওয়ানের স্টাম্পস।সেই ধাক্কা সামলে কিছুটা লড়াই করেন অভিষিক্ত মুহাম্মাদ গাজি ঘোরি ও তৃতীয় ম্যাচ খেলতে নামা আব্দুল সামাদ। চতুর্থ উইকেটে অর্ধশত রানের জুটি গড়েন দুই নবীন।
জুটি ভাঙতে নাহিদকে ফেরানো হয় আক্রমণে। নতুন স্পেলের প্রথম ওভারেই ১৪৫.৭ কিলোমিটার গতির বল সামলাতে না পেরে বোল্ড হয়ে যান ঘোরি (৩৯ বলে ২৯)।একটু পরে মুস্তাফিজুর রহমান নতুন স্পেলে ফিরে বিদায় করেন সামাদকে (৪৫ বলে ৩৪)।
৮২ রানে ৫ উইকেট হারানো দল লড়াইয়ে ফেরে পরের জুটিতে। সাবধানী শুরুর পর ক্রমে রানের গতিতে দম দেন সালমান। রিশাদ হোসেনের বাজে বোলিং কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান বাড়ান তিনি। অভিষেকে সম্ভাবনার ঝলক দেখান সাদ মাসুদ। জুটি জমে ওঠে দারুণ। এই জুটি ৭৯ রানে থামে মাসুদের অনভিজ্ঞতায়। মুস্তাফিজকে ক্রিজে ছেড়ে বেরিয়ে খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান ২১ বছর বয়সী লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার (৪৪ বলে ৩৮)।
সালমান এরপর আরেকটি কার্যকর জুটি গড়েন ফাহিম আশরাফের সঙ্গে। এই জুটি পুরোপুরিই ছিল সালমানময়। নিজের সহজাত ব্যাটিং দমিয়ে রেখে স্রেফ উইকেট আঁকড়ে রাখেন ফাহিম।
ফাহিম টিকে থাকলে শেষ দিকে বিপজ্জনক হতে পারতেন। তাকে বোল্ড করে দেন তাসকিন (২০ বলে ৯)। এবার সালমান সঙ্গী পান আফ্রিদিকে। আরেকটি জুটি জাগিয়ে তোলে পাকিস্তানের আশা। দুজনের দারুণ ব্যাটিংয়ে জুটির ফিফটি আসে ৪৬ বলে।
নাহিদ রানার বলে দারুণ শটে ছক্কায় সালমান শতরানে পৌঁছে যান ৮৯ বলেই। ওয়ানডেতে তার তৃতীয় শতরান এটি।
বাংলাদেশ তখন প্রবল শঙ্কায়। স্পিনের একটি ওভার তখনও বাকি। তবে সালমানকে আউট করার আশায় পেসারদের দিয়েই চালিয়ে নিতে থাকেন অধিনায়ক মিরাজ। তাতে কাজ হয়। তাসকিনের শেষ ওভারে স্লোয়ার বলে ছক্কার চেষ্টায় মিড উইকেটে ধরা পড়েন সালমান। প্রায় ম্যাচ জয়ের উদযাপনেই মেতে ওঠে বাংলাদেশ।
কিন্তু নাটকের তখনও বাকি! ৪৯তম ওভারে মুস্কাফিজকে দুটি ছক্কা মেরে দেন আফ্রিদি। ম্যাচ জমে ওঠে আবার। ওভারের পঞ্চম বলে আফ্রিদির শট গিয়ে লাগে মুস্তাফিজের হাঁটুতে। ব্যাথায় পিচে পড়ে যান তিনি। লম্বা সময় ধরে মাঠেই চিকিৎসা চলে তার। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে শেষ বলটি করতে ছোটেন তিনি। ওই ডেলিভারিতেই ছক্কার চেষ্টায় বিদায় নেন হারিস রউফ।
শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ১৪ রানের। রিশাদ হোসেন আর সাইফ হাসানের একজনকে বেছে নিতে হতো। আগের ৬ ওভারে ৫৪ রান দিলেও বিশেষজ্ঞ বোলার রিশাদকেই বেছে নেন অধিনায়ক। হতাশ করেননি এই লেগ স্পিনার।
প্রথম বলটি করেন তিনি গুগলি। ডিফেন্স করেন আফ্রিদি। পরের বলে হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ দেন তিনি, যা নিতে পারেননি রিশাদ। তৃতীয় বলে দুটি রান নিতে পারেন আফ্রিদি। চতুর্থ বলে আরেকটি গুগলিতে ব্যাটে-বলেই করতে পারেননি ব্যাটসম্যান।
২ বলে যখন প্রয়োজন ১২ রান, তখন আরেকটু নাটকীয়তা। রিশাদের লেগ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে ওয়াইডের সঙ্কেত দেন আম্পায়ার। বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। রিপ্লেতে দেখা যায়, আফ্রিদির ব্যাটের একদম মাথায় হালকা ছুঁয়ে ড়েলে বল। যেটির মানে, বৈধ ডেলিভারি এবং রান নেই। নিশিচত হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়। শেষ বলেও ব্যাটে ছোঁয়াতে পারেননি আফ্রিদি, স্টাম্পিং করেন লিটন। উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে মিরাজ ও তার দল।
বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল বোলার তাসকিন আহমেদ। একাই চারটি উইকেট নেন তিনি। মুস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন তিনটি উইকেট। এছাড়া নাহিদ রানা দুটি ও রিশাদ একটি উইকেট নেন।
এর আগে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাট করার আমন্ত্রণ জানান পাকিস্তানের অধিনায়ক শাহীন শাহ আফ্রিদি। ব্যাট করতে নেমে উড়ন্ত সূচনা পায় বাংলাদেশ। উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১০৫ রান। ইনিংসের ১৯তম ওভারে শাহীন আফ্রিদিকে এগিয়ে এসে খেলতে গিয়ে বলের লাইন মিস করে বোল্ড হন সাইফ। সাজঘরে ফেরার আগে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৫৫ বলে ৩৬ রান।
দুর্দান্ত শুরুর পর সাইফের মতো ইনিংস বড় করতে পারলেন না নাজমুল হোসেন শান্ত। হারিস রউফের করা বলে আউট হওয়ার আগে করেন ২৭ রান।
এদিকে অভিষেক সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। মাত্র ৪৭ বলে ফিফটি করেছিলেন তিনি। পরের ফিফটি করতে খেলেছেন ৪৯ বল। সবমিলিয়ে ৯৮ বলে তিন অঙ্ক ছুঁয়েছেন। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির পর আর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তামিম। আবরারের কিছুটা খাটো লেংথের বলে কাট করতে গিয়ে কাভারে শাহিন আফ্রিদির হাতে ধরা পড়েন তিনি। তার ব্যাট থেকে এসেছে ১০৭ বলে ১০৭ রান। ইনিংসে ৬টি চার ও ৭টি ছক্কার মার ছিল।
চতুর্থ উইকেটে দারুণ জুটি উপহার দেন লিটন কুমার দাস ও তাওহীদ হৃদয়। এসময় দুজন মিলে তোলেন ৬৮ রান। তাতেই বড় সংগ্রহের দিকে এগিয়ে যায় দল। হারিস রউফের বলে আউট হওয়ার আগে ৪১ রান করেন লিটন দাস। আর পরের উইকেটে নেমে রানের দেখা পাননি রিশাদ হোসেন। প্রথম বলেই বোল্ড হন তিনি।এরপর আফিফকে নিয়ে ইনিংস শেষ করেন তাওহীদ হৃদয়। তিনি অপরাজিত থাকেন ৪৪ বলে ৪৮ রানে। আর ৫ রানে অপরাজিত থাকেন আফিফ।
পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি উইকেট নেন হারিস রউফ। আবরার ও শাহিন শাহ আফ্রিদি নেন একটি করে উইকেট।
স্পোর্টস ডেস্ক 
























