নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সতর্ক করে বলেছেন, দেশে চলমান তথাকথিত মব কালচার এবং দাবি আদায়ের নামে রাস্তাঘাট অবরোধ করে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা বরদাস্ত করা হবে না।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অধিবেশনে বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের সময়ের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সময়ের ‘মব কালচার’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মব কালচারের শিকার হয়ে ২৫০-৩০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এমনকি আমি নিজেও ২১ ফেব্রুয়ারির ভুক্তভোগী। এই কালচার বন্ধে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর স্পষ্ট উচ্চারণ করেছি— বাংলাদেশে কোনো রকমের মব কালচার আর থাকবে না। দাবি আদায়ের জন্য মহাসড়ক বা সড়ক অবরোধ করার যে প্রবণতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেখা গিয়েছে, সেটাকে আমরা আর কখনো অ্যালাউ করব না। মব এবং সুসংগঠিত অপরাধের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সবকিছুকে মব বলা ঠিক হবে না। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে হামলা বা ভাঙচুর করা সুসংগঠিত পরিকল্পিত অপরাধ। এর বিরুদ্ধে মামলা হয়, তদন্ত হয় এবং আসামিদের বিচারের আওতায় আনা হয়।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণের দাবি থাকবেই, তবে তা জানাতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দফতরে স্মারকলিপি দেওয়া, সেমিনার করা বা জনসমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। আমরা বাকস্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করব। কিন্তু মবের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ও জয়নুল আবদিন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের ইনডেমনিটি দেওয়ার বিষয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। এই অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে ১৩৩টি অধ্যাদেশের সঙ্গে এটিও মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২০ তারিখ কমিটিতে এসব নিয়ে আলোচনা হবে। সর্বসম্মতিক্রমে ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’টি সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করে পাস করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন বলেও তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘আওয়ামী চক্রান্তকারী গোষ্ঠী’র বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যারা হানাদার বাহিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালিয়েছে, জনতার প্রতিরোধের মুখে তাদের কেউ কেউ হয়তো প্রাণ হারিয়েছে। কারণ, ওটা ছিল একটি রণক্ষেত্র। সেখানে জুলাইযোদ্ধাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে সারা দেশের মানুষ একমত।
হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের স্পেসিফিক মামলা হয়েছে। কিছু মামলা আইসিটি আইনে এবং কিছু সাধারণ আইনের অধীনে আদালতে রয়েছে। এগুলোর তদন্ত ও চার্জশিট প্রদানের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু মামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছে এবং তা টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগে উল্লেখ করে সুষ্ঠু বিচারকাজের পরিবেশ তৈরিতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে—তারা পুলিশের পোশাক পরুক অথবা যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হোক, যে বাহিনীর পোশাকই পরুক না কেন, তারা সবাই অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। যদি কারো বিরুদ্ধে মামলা না হয়ে থাকে, তবে আপনারা করবেন। প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং বিচার বিভাগ যথাযথভাবে এর বিচার করবে।
বিএনপির সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ছাত্র অভ্যুত্থান সংগঠিত হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত যে সমস্ত গায়েবি মামলা, মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা এবং যে সমস্ত গুম, খুন, অপহরণসহ অনাচার-অবিচার এ দেশের জনগণের ওপরে হয়েছে, তার সঙ্গে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পুলিশ বাহিনীর কিছু কিছু সদস্য তাদের সেই নির্দেশ পালন করেছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে প্রথম কাজ হিসেবে কিছু মামলা প্রত্যাহার করেছি। সরকারি দল, বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কিছু মিথ্যা মামলা আবেদনের প্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে সব মামলা ছিল না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যে সমস্ত মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, সেই মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য ওই কমিটির কাছে আবেদন করা যাবে। কমিটি বাছাই করে সেটি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। এরপর আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি যে পরামর্শ দেবে, সেই মতে সিআরপিসি ৪৯৪ অনুসারে মামলা প্রত্যাহারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, পুলিশের তৃণমূলের সদস্যদের যখন তদন্ত করতে পাঠানো হয়, কোনো খরচ থানা থেকে দেওয়া হয় না। যেটা দেওয়া হয়, সেটা খুবই অপ্রতুল। এ জন্য পুলিশের একটা সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে, ‘ম্যানেজ করে নাও।’ এই ম্যানেজ করতে গিয়ে পুলিশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে যে বাজেট দেওয়া হয়, তা খরচের চেয়ে কম হওয়ার কারণে ব্যবসায়ী বা এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত মানুষের কাছ থেকে অর্থ ওঠাতে হয়। হাসনাত তাঁর প্রশ্নে জানতে চান, পুলিশকে তাদের রুটিন দায়িত্বগুলো পালনে যথাযথ বরাদ্দ দেওয়া হবে কি না?
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীকে আরও বেশি কর্মক্ষম ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য যথাযথ বাজেট দেওয়ার বিষয়ে তিনি আগামী অধিবেশনে প্রস্তাব রাখবেন। এটা সত্য যে পুলিশের যে পরিমাণ রিসোর্স বা বাজেট দরকার, দেশের অর্থনীতি হয়তো তা দিতে পুরোপুরি সক্ষম নয়। তবে সরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশের ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, যাতে পুলিশ ‘ম্যানেজ করার কালচার’ থেকে বেরিয়ে আসে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















