নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া প্রায় ৩.৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা) দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রোববার (২৯ মার্চ) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দীন খান এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বহুল আলোচিত এমটিএফই (মেটাভার্স বৈদেশিক মুদ্রা) প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা অর্থের একটি অংশ সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে এনেছে সিআইডি। এ পর্যন্ত ৪৪ কোটিরও বেশি টাকা উদ্ধার করে দেশে আনা হয়েছে।
জসীম উদ্দীন খান বলেন, এ প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছিল, যা উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিল অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতারণায় নিঃস্ব হওয়া সহস্র ভুক্তভোগীর এই খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করছে সিআইডি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, এটি বড় সাফল্য যে, অনেক চেষ্টা আর নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পাচার হওয়া প্রায় সাড়ে ৪৪ কোটি টাকা আমরা ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি। এ ব্যাপারে আরও তদন্ত চলছে। পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে।
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ১৪ মার্চ ‘অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থটি জমা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি জব্দ করা সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও দেশে ফেরত আনার দায়িত্বে ছিল। পরে জেপিমরগান চেজ ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থটি বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, ২০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথিপত্র প্রয়োজন হওয়ায় ২৪ মার্চ এ সংক্রান্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ রোববার (২৯ মার্চ) সিআইডির সোনালী ব্যাংকের হিসাবে অর্থ জমা হয়েছে।
সিআইডি’র তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এমটিএফই (Metaverse Foreign Exchange) নামে একটি প্ল্যাটফর্ম মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিতে বাংলাদেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সিনেমা বানানোর নামে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে হাজারও বাংলাদেশিকে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
২০২২ সালের মাঝামাঝি কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালের শুরুতে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ ডিজিটাল ডলার হিসেবে দেখানো হতো।
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ বশির উদ্দিন জানান, পুরো কার্যক্রমই ছিল নিয়ন্ত্রিত প্রতারণা। কৃত্রিমভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হতো। শুরুতে কিছু অর্থ পরিশোধ করে আস্থা তৈরি করা হলেও ২০২৩ সালের মাঝামাঝি হঠাৎ উত্তোলন বন্ধ করে প্ল্যাটফর্মটি উধাও হয়ে যায়।
সিআইডি’র ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও সাইবার পুলিশ সেন্টারের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। দেশের উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাসহ ঢাকা, বরিশাল, রাজশাহী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সাতক্ষীরার হাজারও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ বশির উদ্দিন বলেন, ‘এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয় এবং মূল হোতাসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত অর্থ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছিল। বিনিয়োগকারীদের টাকা বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেটে স্থানান্তর করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জও ছিল।’
‘পরবর্তীতে বিদেশি সংস্থার সহায়তায় এসব সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করা সম্ভব হয়।’
সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, অর্থ দেশে ফেরানোর জন্য গত বছরের নভেম্বরে ‘অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেড’-এর সঙ্গে চুক্তি করে সিআইডি। প্রতিষ্ঠানটি জব্দ করা ক্রিপ্টো সম্পদ নগদ ডলারে রূপান্তর করে বাংলাদেশে পাঠায়। এ প্রক্রিয়ায় তারা ২.৫ শতাংশ সেবা ফি গ্রহণ করে। সোনালী ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাবে এই অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ বশির উদ্দিন জানান, যেহেতু বিষয়টি এখনও বিচারাধীন, এর সমাধান হবে আদালতেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের নির্দেশনার আলোকেই ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের যাচাই-বাছাই শেষে অর্থ বণ্টন করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















