Dhaka বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফেনীতে স্কুল শিক্ষার্থী নাশিতকে হত্যায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

ফেনী জেলা প্রতিনিধি : 

ফেনীতে মুক্তিপন না পেয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন নাশিতকে হত্যা করে স্কুল ব্যাগে পাথর ভরে মরদেহ ডোবায় ফেলে দেওয়ার দায়ে ৩ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ. এন. এম মোরশেদ খান এ রায় দেন।

নিহত শিক্ষার্থী নাশিত ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার জয়পুর গ্রামের আনসার আলী ফকির বাড়ির মাঈন উদ্দিন সোহাগের ছোট ছেলে। পরিবারের সঙ্গে ফেনী পৌরসভার একাডেমি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- আশ্রাফ হোসেন তুষার, মোবারক হোসেন ওয়াসিম ও ওমর ফারুক রিপাত। আশ্রাফ ছাগলনাইয়া উপজেলার নিজপানুয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন চৌধুরীর ছেলে ও ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। মোবারক ফেনী পৌরসভার বারাহিপুর এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক। আর রিপাত লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার কামালপুর এলাকার দুদু মিয়া বাড়ির মো. শাহ আলমের ছেলে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার আতিকুল আলম সড়কে কোচিং ক্লাস শেষ করে স্থানীয় বায়তুল খায়ের জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় নাশিত।

নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে পূর্বপরিচিত আসামি তুষার ও তার সহযোগীরা নাশিতকে অপহরণ করে শহরতলির দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় নিয়ে জুসের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে। পরে নাশিতের ছবি তুলে তার বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠিয়ে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। একপর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ রেললাইনের পাশে ফেলে দেয়। লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে সেজন্য ওই শিক্ষার্থীর স্কুল ব্যাগে পাথর ভরে চাপা দেন তারা।

এ ঘটনায় নাশিতের বাবা মাদিন উদ্দিন সোহাগ ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ফেনী মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তারপর দুই দিন ধরে একটি মোবাইল নম্বর থেকে নাশিতের বাবাকে কল করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে নিহতের বাবা সোহাগ পুলিশকে তুষার নামে এক কিশোরকে সন্দেহের কথা জানান। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেদিন রাতে তুষারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলে তার দেওয়া তথ্যমতে দেওয়ানগঞ্জ এলাকার একটি ডোবা থেকে নাশিতের স্কুল ব্যাগসহ লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তুষারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন তুষার ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের নিজপানুয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন চৌধুরীর ছেলে। তিনি ফেনী পৌর ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তুষার আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সহ-প্রচার সম্পাদক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জিয়া স্মৃতি সংসদের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। গ্রেপ্তার মোবারক হোসেন ওয়াসিম ফেনী পৌরসভার বারাহিপুর এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে। পেশায় তিনি সিএনজিচ অটোরিকশাচালক। অন্যজন ওমর ফারুক রিফাত লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার কামালপুর এলাকার দুধমিয়া বাড়ির মো. শাহ আলমের ছেলে।

২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালতে নাশিতকে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত।

নাশিতের বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগ বলেন, আসামিরা আমার স্কুল পড়ুয়া সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট। দ্রুত সময়ের মধ্যে রায় কার্যকরের দাবি করছি।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি মো. শাহাব উদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলায় ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে সবাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ৬ জানুয়ারি আসামি পরীক্ষা ও ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘোষিত এ রায় আইনের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হলেন ৪০ কর্মকর্তা

ফেনীতে স্কুল শিক্ষার্থী নাশিতকে হত্যায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশের সময় : ০৪:১৭:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

ফেনী জেলা প্রতিনিধি : 

ফেনীতে মুক্তিপন না পেয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন নাশিতকে হত্যা করে স্কুল ব্যাগে পাথর ভরে মরদেহ ডোবায় ফেলে দেওয়ার দায়ে ৩ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ. এন. এম মোরশেদ খান এ রায় দেন।

নিহত শিক্ষার্থী নাশিত ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার জয়পুর গ্রামের আনসার আলী ফকির বাড়ির মাঈন উদ্দিন সোহাগের ছোট ছেলে। পরিবারের সঙ্গে ফেনী পৌরসভার একাডেমি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- আশ্রাফ হোসেন তুষার, মোবারক হোসেন ওয়াসিম ও ওমর ফারুক রিপাত। আশ্রাফ ছাগলনাইয়া উপজেলার নিজপানুয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন চৌধুরীর ছেলে ও ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। মোবারক ফেনী পৌরসভার বারাহিপুর এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক। আর রিপাত লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার কামালপুর এলাকার দুদু মিয়া বাড়ির মো. শাহ আলমের ছেলে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার আতিকুল আলম সড়কে কোচিং ক্লাস শেষ করে স্থানীয় বায়তুল খায়ের জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় নাশিত।

নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে পূর্বপরিচিত আসামি তুষার ও তার সহযোগীরা নাশিতকে অপহরণ করে শহরতলির দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় নিয়ে জুসের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে। পরে নাশিতের ছবি তুলে তার বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠিয়ে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। একপর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ রেললাইনের পাশে ফেলে দেয়। লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে সেজন্য ওই শিক্ষার্থীর স্কুল ব্যাগে পাথর ভরে চাপা দেন তারা।

এ ঘটনায় নাশিতের বাবা মাদিন উদ্দিন সোহাগ ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ফেনী মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তারপর দুই দিন ধরে একটি মোবাইল নম্বর থেকে নাশিতের বাবাকে কল করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে নিহতের বাবা সোহাগ পুলিশকে তুষার নামে এক কিশোরকে সন্দেহের কথা জানান। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেদিন রাতে তুষারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলে তার দেওয়া তথ্যমতে দেওয়ানগঞ্জ এলাকার একটি ডোবা থেকে নাশিতের স্কুল ব্যাগসহ লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তুষারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন তুষার ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের নিজপানুয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন চৌধুরীর ছেলে। তিনি ফেনী পৌর ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তুষার আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সহ-প্রচার সম্পাদক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জিয়া স্মৃতি সংসদের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। গ্রেপ্তার মোবারক হোসেন ওয়াসিম ফেনী পৌরসভার বারাহিপুর এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে। পেশায় তিনি সিএনজিচ অটোরিকশাচালক। অন্যজন ওমর ফারুক রিফাত লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার কামালপুর এলাকার দুধমিয়া বাড়ির মো. শাহ আলমের ছেলে।

২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালতে নাশিতকে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত।

নাশিতের বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগ বলেন, আসামিরা আমার স্কুল পড়ুয়া সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট। দ্রুত সময়ের মধ্যে রায় কার্যকরের দাবি করছি।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি মো. শাহাব উদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলায় ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে সবাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ৬ জানুয়ারি আসামি পরীক্ষা ও ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘোষিত এ রায় আইনের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।