Dhaka বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনী ইশতেহার : ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চিত্র জানালেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে ইশতেহার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন তিনি।

বুধবার (১ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

লিখিত জবাবে ইশতেহার বাস্তবায়নের খাতভিত্তিক চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী-

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফ

প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা প্রদানে সরকার কৃষক কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে এটি পাইলটিং করা হবে।

এছাড়া, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।

ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বেই ৯ হাজার ১০২ জন উপকারভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্মানী পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৯৫ জন ইমাম, ২ হাজার ৯৭৫ জন মুয়াজ্জিন, ২ হাজার ৬০৪ জন খাদেম এবং হিন্দু মন্দিরের ১১৪ জন পুরোহিত, ৮৩ জন সেবাইত এবং বৌদ্ধ বিহার/প্যাগোডার ১৫ জন অধ্যক্ষ ও ১৬ জন উপাধ্যক্ষ রয়েছেন।

ই-হেলথ কার্ড 

খুলনা জেলায় পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় ২৫ লাখ ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

২০ হাজার কিমি খাল খনন ও বনায়ন

আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কাবিখা, কাবিটা ও টিআরের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন বা সংস্কার করবে। পাশাপাশি, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেড় কোটি চারা উৎপাদন করা হয়েছে, যা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।

শিক্ষায় প্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতা

কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে এবং ৩ হাজার ৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইতালিয়ান ও জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পেপ্যাল চালু ও হাইটেক পার্ক

হাইটেক বা সফটওয়্যার পার্ক এবং আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম শুরুতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সবুজ বনায়ন কর্মসূচি

পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়ন সৃজনের জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি ৫০ লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত চারাসমূহ চলতি বছর আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।

বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস

এ অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে এবং ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইটালিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুন, ২০২৬ এর মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

খেলার মাঠ

সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাই-টেক বা সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপাল এর কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে বেতন কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া ভাতা’ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যার মধ্যে প্রথম ধাপে ১২৯ জন আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি

ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ০৩ লক্ষ হতে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পূর্বেই সার্টিফিটেক অব এলিজিলিটি (সিওই) এর ভিত্তিতে এ ঋণ প্রদান সহজীকরণ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আতিকুর রহমান মোজাহিদের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে ভুটানের রাজা কুড়িগ্রামে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর প্রেক্ষিতে, ভুটানি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের যোগাযোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় বেজা কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার মাধবরাম মৌজায় ‘কুড়িগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল-১’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ভুটানের রাজার আগ্রহের ভিত্তিতে জিটুজি যৌথ উদ্যোগের অধীনে বেজা উক্ত স্থানে একটি ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে।

জমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি সম্পর্কে সংসদ নেতা বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার জন্য বেজার অনুকূলে ১৫০ দশমিক ০৭ একর খাস জমি এবং ৬৯ দশমিক ৫৭ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত বেজা উক্ত মৌজায় ১৩৩ দশমিক ৯২ একর জমির মালিকানা লাভ করেছে। এছাড়া, একই মৌজায় আরও ৬১ দশমিক ৮৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

ভুটানের রাজার বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভুটানের রাজা ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ থেকে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। সফরকালে তিনি প্রস্তাবিত ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ এলাকা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে জিটুজি ভিত্তিতে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
বর্তমান কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ এর জন্য ভুটান সরকার কর্তৃক দ্রুত ডেভেলপার কোম্পানি নিয়োগ এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভা আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে বেজা।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম এই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে আধুনিক, ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার। এই কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন এই সহায়তা প্রদান করা হলেও, দারিদ্রতার হার কাঙ্ক্ষিত রূপে হ্রাস পায়নি এবং জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটেনি। দেখা গেছে, কোনো পরিবারের মাকে এ জাতীয় সহায়তা প্রদান করা হলে সহায়তাটি পরিবারের শিশুসহ অন্যান্য সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যবহার হয় এবং অর্থের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় এর সুযোগ হ্রাস পায়। এ কারণে ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে প্রদান করা হবে। এতে একদিকে যেমন সহায়তাটি সরাসরি পরিবারের সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হবে, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ডটি পরিবারে নারী প্রধানের নামে হওয়ায় পরিবারের সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারে সিদ্ধান্ত প্রদান ও মর্যাদা বৃদ্ধি তথা পরিবার ও সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে।

তারেক রহমান বলেন, গত ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলার তিন সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরও ৩০ হাজারটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। আগামী চার বছরের মধ্যে দেশব্যাপী চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।

কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার হওয়া এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।

তারেক রহমান বলেন, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি দেশের (মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত) সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএলএটি) স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। অপর ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মামলাগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।

সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অপরদিকে, আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ হাজার ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

মামলার হালনাগাদ তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

নির্বাচনী ইশতেহার : ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চিত্র জানালেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৪:২৯:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে ইশতেহার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন তিনি।

বুধবার (১ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

লিখিত জবাবে ইশতেহার বাস্তবায়নের খাতভিত্তিক চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী-

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফ

প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা প্রদানে সরকার কৃষক কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে এটি পাইলটিং করা হবে।

এছাড়া, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।

ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বেই ৯ হাজার ১০২ জন উপকারভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্মানী পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৯৫ জন ইমাম, ২ হাজার ৯৭৫ জন মুয়াজ্জিন, ২ হাজার ৬০৪ জন খাদেম এবং হিন্দু মন্দিরের ১১৪ জন পুরোহিত, ৮৩ জন সেবাইত এবং বৌদ্ধ বিহার/প্যাগোডার ১৫ জন অধ্যক্ষ ও ১৬ জন উপাধ্যক্ষ রয়েছেন।

ই-হেলথ কার্ড 

খুলনা জেলায় পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় ২৫ লাখ ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

২০ হাজার কিমি খাল খনন ও বনায়ন

আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কাবিখা, কাবিটা ও টিআরের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন বা সংস্কার করবে। পাশাপাশি, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেড় কোটি চারা উৎপাদন করা হয়েছে, যা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।

শিক্ষায় প্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতা

কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে এবং ৩ হাজার ৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইতালিয়ান ও জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পেপ্যাল চালু ও হাইটেক পার্ক

হাইটেক বা সফটওয়্যার পার্ক এবং আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম শুরুতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সবুজ বনায়ন কর্মসূচি

পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়ন সৃজনের জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি ৫০ লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত চারাসমূহ চলতি বছর আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।

বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস

এ অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে এবং ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইটালিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুন, ২০২৬ এর মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

খেলার মাঠ

সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাই-টেক বা সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপাল এর কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে বেতন কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া ভাতা’ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যার মধ্যে প্রথম ধাপে ১২৯ জন আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি

ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ০৩ লক্ষ হতে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পূর্বেই সার্টিফিটেক অব এলিজিলিটি (সিওই) এর ভিত্তিতে এ ঋণ প্রদান সহজীকরণ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আতিকুর রহমান মোজাহিদের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে ভুটানের রাজা কুড়িগ্রামে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর প্রেক্ষিতে, ভুটানি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের যোগাযোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় বেজা কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার মাধবরাম মৌজায় ‘কুড়িগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল-১’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ভুটানের রাজার আগ্রহের ভিত্তিতে জিটুজি যৌথ উদ্যোগের অধীনে বেজা উক্ত স্থানে একটি ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে।

জমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি সম্পর্কে সংসদ নেতা বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার জন্য বেজার অনুকূলে ১৫০ দশমিক ০৭ একর খাস জমি এবং ৬৯ দশমিক ৫৭ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত বেজা উক্ত মৌজায় ১৩৩ দশমিক ৯২ একর জমির মালিকানা লাভ করেছে। এছাড়া, একই মৌজায় আরও ৬১ দশমিক ৮৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

ভুটানের রাজার বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভুটানের রাজা ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ থেকে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। সফরকালে তিনি প্রস্তাবিত ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ এলাকা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে জিটুজি ভিত্তিতে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
বর্তমান কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ এর জন্য ভুটান সরকার কর্তৃক দ্রুত ডেভেলপার কোম্পানি নিয়োগ এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভা আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে বেজা।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম এই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে আধুনিক, ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার। এই কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন এই সহায়তা প্রদান করা হলেও, দারিদ্রতার হার কাঙ্ক্ষিত রূপে হ্রাস পায়নি এবং জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটেনি। দেখা গেছে, কোনো পরিবারের মাকে এ জাতীয় সহায়তা প্রদান করা হলে সহায়তাটি পরিবারের শিশুসহ অন্যান্য সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যবহার হয় এবং অর্থের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় এর সুযোগ হ্রাস পায়। এ কারণে ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে প্রদান করা হবে। এতে একদিকে যেমন সহায়তাটি সরাসরি পরিবারের সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হবে, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ডটি পরিবারে নারী প্রধানের নামে হওয়ায় পরিবারের সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারে সিদ্ধান্ত প্রদান ও মর্যাদা বৃদ্ধি তথা পরিবার ও সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে।

তারেক রহমান বলেন, গত ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলার তিন সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরও ৩০ হাজারটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। আগামী চার বছরের মধ্যে দেশব্যাপী চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।

কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার হওয়া এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।

তারেক রহমান বলেন, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি দেশের (মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত) সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএলএটি) স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। অপর ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মামলাগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।

সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অপরদিকে, আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ হাজার ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

মামলার হালনাগাদ তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।