Dhaka শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন রূপে ফ্যাসিবাদ এলে কঠিন পরিণতির হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ১০:২৩:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২০২ জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

নতুন কোনো পোশাক পরে যদি ফ্যাসিবাদ আসে তবে তার পরিণতি ৫ আগস্টের মতো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ঢাকা-১৫ আসনের মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় আয়োজিত নির্বাচনি জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।

জামায়াত আমির বলেন, এ দেশে আমরা ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ যদি আজ নতুন কোনো পোশাক পরে আমাদের সামনে আসে, তবে ৫ আগস্টের মতো একই পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে। বহু ত্যাগ আর কোরবানির বিনিময়ে আজকের এই অবস্থান।

শফিকুর রহমান বলেন, যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, আজ তাদের আর দেখা যাচ্ছে না—এটা একটা বড় শান্তি। যারা ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছেন, তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, ফ্যাসিবাদের সময়ে আমরা-আপনারা যে কষ্ট ভোগ করেছি, সেই কষ্ট মেহেরবানি করে আর কেউ জনগণকে দেবেন না।

তিনি বলেন, আমাদের সমাজে আজ যত বৈষম্য, দুঃশাসন আর দুর্নীতি—তার মূল কারণ হলো ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি। যদি দেশে ইনসাফ থাকতো তবে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা আর ডাকাতরা জনগণের সম্পদ লুট করে ব্যাংক খালি করে দিয়ে দেশ থেকে নিরাপদে পালানোর সুযোগ পেত না। তারা বিদেশে বেগমপাড়া গড়তে পারত না, বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসের রাজ্য কায়েম করতে পারত না। এই কালো টাকা দিয়েই আবার সন্ত্রাস কেনা হয় আরও বেশি কালো টাকা বানানোর জন্য।

মিরপুরসহ সারা দেশে চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ট্যাক্সের বাইরেও কিন্তু বেসরকারি একটা ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে, হকারের কাছে, এমনকি যে রাস্তার ধারে বসে, ভাইবোন ভিক্ষা করে তার কাছ থেকেও ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না। চাঁদা আমরা নেব না, চাঁদা দেব না। দুর্নীতি করব না, দুর্নীতি কাউকে করতে দেবো না। ইনসাফ সবার জন্য। টাকার মূল্যে ইনসাফ আর বিক্রি হবে না।

তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দুই হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে বলেন, ওই রকম কার্ডের কোনো ওয়াদা আমরা দিচ্ছি না।

২ হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনো কিছু কি সমাধান হবে, এমন প্রশ্ন তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুই হাজারের কার্ডে আবার এক হাজারের ভাগ বসবে কি না— বলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ। খাজনা আগে তারপর অন্যটা? দুই হাজারে এক হাজারের খাজনা আগে আমাকে দিয়ে দাও! এমন কাল্পনিক কিছু চরিত্র এঁকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, সরকারের হাতে যাবে, বেকারের হাতে নয়— এমন চিত্র কি আমরা দেখিনি?

তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বড় ভারী। এই প্রতীক ইনসাফের। আর সমাজের সব ধরনের বৈষম্য ও দুঃশাসনের কারণ ইনসাফ না থাকা। ইনসাফ যদি থাকত, তাহলে সমাজে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ও ব্যাংক ডাকাতরা নিরাপদে জনগণের সম্পত্তি লুটপাট করে দেশ থেকে পালানোর সুযোগ পেত না; দেশে দেশে বেগমপাড়া তৈরি করতে পারত না। বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে পারত না। কারণ এই কালো টাকা সন্ত্রাসের পেছনেও ব্যয় হয় আরও কালো টাকা বানানোর জন্য।

তিনি বলেন, আমি অনেকের মাথায় আজকে লাল টুপি দেখতে পাচ্ছি, যা গত সাড়ে ১৫ বছরে রক্তে লাল বাংলাদেশের করুণ চিত্র। সারা বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে ছোপ ছোপ রক্ত আর সারি সারি লাশের দেশে পরিণত হয়েছিল। বহু মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, বহু বোন তাঁর স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন, বহু কচি শিশু তার বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়েছে।

তিনি বলেন, ইতিহাসের কলঙ্ক রচনা করে বাংলাদেশের জায়গায়-জায়গায় আয়নাঘর গড়ে তোলা হয়েছিল। আয়নাঘরের মজলুমরাও এখানে আছেন। সেনা কর্মকর্তা হয়ে, উচ্চ আদালতের আইনজীবী হয়েও রক্ষা পাননি। রাজনৈতিক নেতারাও রক্ষা পাননি। বহু মা আজও তার সন্তানকে ফিরে পাননি।

তিনি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখানে উপস্থিত অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষ বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। কেউ কেউ তো জীবনেও ভোট দিতে পারেননি। যারা ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল তারা ভোট ডাকাত। আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান?

ঢাকা-১৫ আসনের এ সংসদ সদস্য প্রার্থী বলেন, যারা নিজেদের দলের লোকদের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি, সন্ত্রাস এবং পাথর মেরে বা গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যার কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। আর যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই জাতিকে দেখাক, জাতির তাদের মতলব বুঝতে মোটেই অসুবিধা হবে না।

তিনি বলেন, আমি কারও সমালোচনা করতে চাই না। সামনে-পেছনে তাকিয়ে এখন শান্তি পাই যে, যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল এবং যারা মূল দোসর ছিল, এখন তাদের দেখতে পাই না। এখন আছেন তারা যারা ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিলেন। তাদের সবার প্রতি বিনয়ী অনুরোধ—ফ্যাসিবাদের কারণে আপনারা ও আমরা যে কষ্ট ভোগ করেছি, সেই কষ্ট জনগণকে দেবেন না। কিন্তু এখনো অনেকে দিচ্ছেন। আমরা দেখতে চাই এগুলো বন্ধ হবে। যদি বন্ধ না হয়, তাহলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ দুটো ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন, আর অনেকগুলো ‘না’ ভোট দেবেন ইনশাআল্লাহ। একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট হচ্ছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, ঘুনে ধরা রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত, জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য। সবার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য মাঠে নেমেছে ১০ দলীয় সমঝোতার জোট। এই ১০ দলকে বিজয়ী করার অর্থ হচ্ছে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট; এর অর্থ হচ্ছে চাঁদাবাজ, দখলদার, ফ্যাসিবাদ, ব্যাংক ডাকাত এবং যারা মা-বোনদের ইজ্জতের ওপর হাত দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট। সব মিলিয়ে একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট হবে।

এ সময় তিনি ১০ দলীয় জোটের অন্যতম সঙ্গী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন। এরপর একে একে তিনি নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী কর্নেল(অব.) আব্দুল বাতেন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান, ঢাকা-১৪ আসনের ১০ দলীয় জোটের জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।

মিরপুর এলাকার খণ্ডিত বর্ণনা তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, এই এলাকার তিনটি খাল এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পাশ দিয়ে গেলে মাথাব্যথা করবে, যে কেউ অসুস্থ হবেন। ড্রেনগুলো সব মশা-মাছির আস্তানা। রাস্তা ও লাইটপোস্ট দেখার কেউ নেই। ভাঙা রাস্তা তো আছেই; তার ওপর সন্ত্রাস ও মাদক এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আল্লাহর ইচ্ছায় এবং আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনের ভোটে জামায়াতে ইসলামী যদি এখানে বিজয় লাভ করে, তবে কথা দিচ্ছি—আপনাদের সাথে নিয়ে এবং পাশে থেকে সব সমস্যার সমাধান আমরা করব।

মিরপুরে মানসম্মত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মনিপুর হাইস্কুল সারাদেশে শ্রেষ্ঠ হাইস্কুলে পরিণত হয়েছিল। সেটি ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল, তা আপনারা জানেন। শুধু মনিপুর হাইস্কুল নয়, এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শ্রেষ্ঠ মানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। কীভাবে বিশ্বমানের শিক্ষাদান নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

নিজেকে কেবল জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে নয়; বরং গত ৫৪ বছরে দফায় দফায় স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে যে মানুষগুলো আপনজন হারিয়েছেন, ডা. শফিকুর রহমান নিজেকে তাদেরই একজন হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমি আজ গুম হওয়া পরিবারের সদস্য হয়ে এবং শিক্ষাবঞ্চিত ও পথ হারানো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পক্ষ থেকে এখানে দাঁড়িয়েছি।

শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে স্মরণ করে তিনি বলেন, “তার কণ্ঠ ছিল আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এবং যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। যারা তা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু হাদি হারিয়ে যায়নি; এখন ১৮ কোটি মানুষই হাদি। সে ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

তিনি হাদীর রুহকে সাক্ষী রেখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, হাদী, তোমাকে কথা দিচ্ছি ভাই— তুমি যে স্বপ্ন নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিলে, আমরা সে লড়াই থামাব না।

তিনি আরও বলেন, আমরা তরুণ ও যুবসমাজকে কেবল স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হতে শেখানো সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা দিতে চাই না। আমরা চাই তাদের প্রফেশনাল, নৈতিক, দায়বদ্ধ এবং দক্ষ করে গড়ে তুলতে। আমরা তাদের খয়রাতি অনুদান দিতে চাই না; বরং তাদের হাতকে দক্ষ ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলে সম্মানিত করতে চাই, যাতে তারা দেশ গড়ার কাজে বুক ফুলিয়ে অংশ নিতে পারেন।

জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- ১০ দলীয় জোট সঙ্গী দল গণতান্ত্রিক পার্টির(জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ডা. মোবারক হোসেন ও অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, ১০ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতের ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী কর্ণেল আব্দুল বাতেন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকির, আয়নাঘর হতে গুম ফেরত ঢাকা-১৪ আসনের ১০ দলীয় জোটের জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ময়মনসিংহে মিনি বাস উল্টে চালকের সহকারীসহ নিহত ২

নতুন রূপে ফ্যাসিবাদ এলে কঠিন পরিণতির হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের

প্রকাশের সময় : ১০:২৩:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

নতুন কোনো পোশাক পরে যদি ফ্যাসিবাদ আসে তবে তার পরিণতি ৫ আগস্টের মতো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ঢাকা-১৫ আসনের মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় আয়োজিত নির্বাচনি জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।

জামায়াত আমির বলেন, এ দেশে আমরা ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ যদি আজ নতুন কোনো পোশাক পরে আমাদের সামনে আসে, তবে ৫ আগস্টের মতো একই পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে। বহু ত্যাগ আর কোরবানির বিনিময়ে আজকের এই অবস্থান।

শফিকুর রহমান বলেন, যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, আজ তাদের আর দেখা যাচ্ছে না—এটা একটা বড় শান্তি। যারা ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছেন, তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, ফ্যাসিবাদের সময়ে আমরা-আপনারা যে কষ্ট ভোগ করেছি, সেই কষ্ট মেহেরবানি করে আর কেউ জনগণকে দেবেন না।

তিনি বলেন, আমাদের সমাজে আজ যত বৈষম্য, দুঃশাসন আর দুর্নীতি—তার মূল কারণ হলো ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি। যদি দেশে ইনসাফ থাকতো তবে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা আর ডাকাতরা জনগণের সম্পদ লুট করে ব্যাংক খালি করে দিয়ে দেশ থেকে নিরাপদে পালানোর সুযোগ পেত না। তারা বিদেশে বেগমপাড়া গড়তে পারত না, বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসের রাজ্য কায়েম করতে পারত না। এই কালো টাকা দিয়েই আবার সন্ত্রাস কেনা হয় আরও বেশি কালো টাকা বানানোর জন্য।

মিরপুরসহ সারা দেশে চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ট্যাক্সের বাইরেও কিন্তু বেসরকারি একটা ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে, হকারের কাছে, এমনকি যে রাস্তার ধারে বসে, ভাইবোন ভিক্ষা করে তার কাছ থেকেও ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না। চাঁদা আমরা নেব না, চাঁদা দেব না। দুর্নীতি করব না, দুর্নীতি কাউকে করতে দেবো না। ইনসাফ সবার জন্য। টাকার মূল্যে ইনসাফ আর বিক্রি হবে না।

তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দুই হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে বলেন, ওই রকম কার্ডের কোনো ওয়াদা আমরা দিচ্ছি না।

২ হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনো কিছু কি সমাধান হবে, এমন প্রশ্ন তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুই হাজারের কার্ডে আবার এক হাজারের ভাগ বসবে কি না— বলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ। খাজনা আগে তারপর অন্যটা? দুই হাজারে এক হাজারের খাজনা আগে আমাকে দিয়ে দাও! এমন কাল্পনিক কিছু চরিত্র এঁকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, সরকারের হাতে যাবে, বেকারের হাতে নয়— এমন চিত্র কি আমরা দেখিনি?

তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বড় ভারী। এই প্রতীক ইনসাফের। আর সমাজের সব ধরনের বৈষম্য ও দুঃশাসনের কারণ ইনসাফ না থাকা। ইনসাফ যদি থাকত, তাহলে সমাজে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ও ব্যাংক ডাকাতরা নিরাপদে জনগণের সম্পত্তি লুটপাট করে দেশ থেকে পালানোর সুযোগ পেত না; দেশে দেশে বেগমপাড়া তৈরি করতে পারত না। বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে পারত না। কারণ এই কালো টাকা সন্ত্রাসের পেছনেও ব্যয় হয় আরও কালো টাকা বানানোর জন্য।

তিনি বলেন, আমি অনেকের মাথায় আজকে লাল টুপি দেখতে পাচ্ছি, যা গত সাড়ে ১৫ বছরে রক্তে লাল বাংলাদেশের করুণ চিত্র। সারা বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে ছোপ ছোপ রক্ত আর সারি সারি লাশের দেশে পরিণত হয়েছিল। বহু মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, বহু বোন তাঁর স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন, বহু কচি শিশু তার বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়েছে।

তিনি বলেন, ইতিহাসের কলঙ্ক রচনা করে বাংলাদেশের জায়গায়-জায়গায় আয়নাঘর গড়ে তোলা হয়েছিল। আয়নাঘরের মজলুমরাও এখানে আছেন। সেনা কর্মকর্তা হয়ে, উচ্চ আদালতের আইনজীবী হয়েও রক্ষা পাননি। রাজনৈতিক নেতারাও রক্ষা পাননি। বহু মা আজও তার সন্তানকে ফিরে পাননি।

তিনি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখানে উপস্থিত অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষ বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। কেউ কেউ তো জীবনেও ভোট দিতে পারেননি। যারা ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল তারা ভোট ডাকাত। আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান?

ঢাকা-১৫ আসনের এ সংসদ সদস্য প্রার্থী বলেন, যারা নিজেদের দলের লোকদের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি, সন্ত্রাস এবং পাথর মেরে বা গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যার কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। আর যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই জাতিকে দেখাক, জাতির তাদের মতলব বুঝতে মোটেই অসুবিধা হবে না।

তিনি বলেন, আমি কারও সমালোচনা করতে চাই না। সামনে-পেছনে তাকিয়ে এখন শান্তি পাই যে, যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল এবং যারা মূল দোসর ছিল, এখন তাদের দেখতে পাই না। এখন আছেন তারা যারা ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিলেন। তাদের সবার প্রতি বিনয়ী অনুরোধ—ফ্যাসিবাদের কারণে আপনারা ও আমরা যে কষ্ট ভোগ করেছি, সেই কষ্ট জনগণকে দেবেন না। কিন্তু এখনো অনেকে দিচ্ছেন। আমরা দেখতে চাই এগুলো বন্ধ হবে। যদি বন্ধ না হয়, তাহলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ দুটো ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন, আর অনেকগুলো ‘না’ ভোট দেবেন ইনশাআল্লাহ। একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট হচ্ছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, ঘুনে ধরা রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত, জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য। সবার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য মাঠে নেমেছে ১০ দলীয় সমঝোতার জোট। এই ১০ দলকে বিজয়ী করার অর্থ হচ্ছে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট; এর অর্থ হচ্ছে চাঁদাবাজ, দখলদার, ফ্যাসিবাদ, ব্যাংক ডাকাত এবং যারা মা-বোনদের ইজ্জতের ওপর হাত দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট। সব মিলিয়ে একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট হবে।

এ সময় তিনি ১০ দলীয় জোটের অন্যতম সঙ্গী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন। এরপর একে একে তিনি নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী কর্নেল(অব.) আব্দুল বাতেন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান, ঢাকা-১৪ আসনের ১০ দলীয় জোটের জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।

মিরপুর এলাকার খণ্ডিত বর্ণনা তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, এই এলাকার তিনটি খাল এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পাশ দিয়ে গেলে মাথাব্যথা করবে, যে কেউ অসুস্থ হবেন। ড্রেনগুলো সব মশা-মাছির আস্তানা। রাস্তা ও লাইটপোস্ট দেখার কেউ নেই। ভাঙা রাস্তা তো আছেই; তার ওপর সন্ত্রাস ও মাদক এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আল্লাহর ইচ্ছায় এবং আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনের ভোটে জামায়াতে ইসলামী যদি এখানে বিজয় লাভ করে, তবে কথা দিচ্ছি—আপনাদের সাথে নিয়ে এবং পাশে থেকে সব সমস্যার সমাধান আমরা করব।

মিরপুরে মানসম্মত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মনিপুর হাইস্কুল সারাদেশে শ্রেষ্ঠ হাইস্কুলে পরিণত হয়েছিল। সেটি ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল, তা আপনারা জানেন। শুধু মনিপুর হাইস্কুল নয়, এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শ্রেষ্ঠ মানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। কীভাবে বিশ্বমানের শিক্ষাদান নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

নিজেকে কেবল জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে নয়; বরং গত ৫৪ বছরে দফায় দফায় স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে যে মানুষগুলো আপনজন হারিয়েছেন, ডা. শফিকুর রহমান নিজেকে তাদেরই একজন হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমি আজ গুম হওয়া পরিবারের সদস্য হয়ে এবং শিক্ষাবঞ্চিত ও পথ হারানো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পক্ষ থেকে এখানে দাঁড়িয়েছি।

শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে স্মরণ করে তিনি বলেন, “তার কণ্ঠ ছিল আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এবং যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। যারা তা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু হাদি হারিয়ে যায়নি; এখন ১৮ কোটি মানুষই হাদি। সে ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

তিনি হাদীর রুহকে সাক্ষী রেখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, হাদী, তোমাকে কথা দিচ্ছি ভাই— তুমি যে স্বপ্ন নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিলে, আমরা সে লড়াই থামাব না।

তিনি আরও বলেন, আমরা তরুণ ও যুবসমাজকে কেবল স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হতে শেখানো সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা দিতে চাই না। আমরা চাই তাদের প্রফেশনাল, নৈতিক, দায়বদ্ধ এবং দক্ষ করে গড়ে তুলতে। আমরা তাদের খয়রাতি অনুদান দিতে চাই না; বরং তাদের হাতকে দক্ষ ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলে সম্মানিত করতে চাই, যাতে তারা দেশ গড়ার কাজে বুক ফুলিয়ে অংশ নিতে পারেন।

জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- ১০ দলীয় জোট সঙ্গী দল গণতান্ত্রিক পার্টির(জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ডা. মোবারক হোসেন ও অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, ১০ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতের ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী কর্ণেল আব্দুল বাতেন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকির, আয়নাঘর হতে গুম ফেরত ঢাকা-১৪ আসনের ১০ দলীয় জোটের জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম।