নিজস্ব প্রতিবেদক :
জ্বালানি সংকটের বিপদ এড়াতে সম্প্রতি নির্ধারিত দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধের সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
রোববার (০৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কথা বলেন।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে সন্ধ্যা ৬টায় দেশের সব দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চেয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা।
তারা বলছেন, প্রয়োজনে সকাল ৯টার পরিবর্তে বেলা ১১টায় দোকানপাট খুলতে চান। তবে সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে রাত ৮টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চান তারা।
ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দোকান মালিক সমিতি আমাদের কাছে একটি আবেদন করেছিল- যাতে তাদের কমপক্ষে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দেই। যদিও মন্ত্রিসভা বৈঠকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে প্রধানমন্ত্রী দোকান মালিক সমিতির আবেদন এবং অনুরোধ বিবেচনা করে পুনর্মূল্যায়ন করে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অবশ্যই জরুরি সেবা যারা দেয়, তারা এর আওতার বাইরে থাকবে।
তিনি বলেন, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে দোকান মালিক সমিতির প্রতিনিধিকে ডেকে এই বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছি। আজ থেকেই এটি কার্যকর হবে এবং আমরা সেই অনুযায়ী অফিস আদেশ জারি করব।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেখুন, জনগণ ও সরকারের মধ্যে একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি থাকে—তারই প্রতিফলন এখানে দেখা গেছে। অর্থাৎ, কেবিনেট একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দোকান মালিক সমিতি যখন তাদের বক্তব্য তুলে ধরলেন, সরকার সেটিকে বিবেচনায় নিয়েছে। এটাও বলেছি যে আগামী পহেলা বৈশাখ এবং আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার সময়ও আমরা এ বিষয়ে নমনীয় থাকব’ বলেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে সবাইকে বলব- আমরা নিজ বাসাবাড়িতে, নিজ কর্মস্থলের জন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হই। আমরা যদি জ্বালানি সাশ্রয়ী করি তাহলে ইনশাল্লাহ আগামী দিনে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
সরকার দেশে জ্বালানি তেলের তিন মাসের মজুত নিশ্চিতে কাজ করছে বলে জানিয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী তিন মাসের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। এপ্রিল মাসের ডিজেলের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কিছু অসাধু চক্র দেশে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, যাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তারা অনেকেই ফোর্স মেজর (চুক্তি পালন করতে না পারলে দায় মুক্তি সংক্রান্ত ধারা) ডিক্লেয়ার করেছে। এজন্য জ্বালানি সংগ্রহে আমাদের নতুন নতুন উৎস অনুসন্ধান করতে হয়েছে। আমরা কিছু ভালো সোর্স পেয়েছি। তাদের অনেকের সঙ্গে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। যদি এটা বাস্তবায়ন হয় আমরা প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে আগামী তিন মাসের জ্বালানি সংগ্রহ করার জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এটা ডিজেলের ক্ষেত্রে। আর পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে আনুমানিক তিন মাসের মতো আমরা কিন্তু নিশ্চিত করতে পেরেছি, অর্থাৎ আমাদের কাছে সেটা রেডি।
পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহার করি, তাহলে পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন থাকবে না। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, পেট্রল পাম্পে যে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে, তা মূলত অকটেন ও ডিজেলের জন্য। অকটেনের চাহিদা মোট চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ, পেট্রলেরও প্রায় ৬ শতাংশ—অর্থাৎ মোট ১২ শতাংশ। বাকি ৮৮ শতাংশ চাহিদা খুবই স্বাভাবিকভাবে পূরণ হচ্ছে। সে কারণে সামগ্রিক কোনো সংকট আমরা দেখছি না।
কিছু জায়গায় অসৎ উদ্দেশ্যে কিছু ঘটনা ঘটছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার তার মেশিনারিজ নিয়ে কাজ করছে। আজ সকালেও আমরা দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছি। সেখানে আলোচনা হয়েছে কীভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিপিসি এবং পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কোম্পানির পক্ষেও যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তা সংশোধন করে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও মসৃণ করার চেষ্টা চলছে, যাতে জনদুর্ভোগ কমে এবং জনগণও দায়িত্বশীল আচরণ করে।
তিনি বলেন, এ ধরনের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব কিছুদিন থাকতে পারে। সে কারণেই আমরা তিন মাসের জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা করছি। ডিজেলের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হচ্ছে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি। শুধু জ্বালানি আনলেই হবে না, সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে। আমরা সমান্তরালভাবে সেই সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর যেমন বিএডিসি, রেলওয়ে—এমনকি প্রয়োজনে বেসরকারি খাতের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর অব্যবহৃত সংরক্ষণ ক্ষমতাও ব্যবহার করা হবে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লেখা চিঠির বিষয় জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রীর একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। সেখানে আমাদের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, আমরা আশাবাদী।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, তিন মাসের মজুত আছে মানে এই নয় যে আমরা এক মাসেই তা শেষ করে ফেলব। আমাদের একটি নির্ধারিত চাহিদা আছে। এই সময় সাশ্রয়ী হওয়া এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা খুব জরুরি। সরকার যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, শেষে আমি বলতে চাই, এপ্রিল মাসের জন্য ডিজেল, পেট্রল, অকটেন, এলএনজি, এলপিজি, জেট ফুয়েল এবং ফার্নেস অয়েল সব ধরনের জ্বালানির চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তিন মাসের সংরক্ষণ নীতিও বাস্তবায়নের পথে। পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া চলছে।
নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদ্যমান অব্যবহৃত সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চলমান এই সাময়িক সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
কৃষকদের তেল পেতে কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা সমাধানে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তেল সরবরাহে কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের বিষয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখাতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















