Dhaka রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আবেগ নয়, চলতে হবে সাংবিধানিক পথে : সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্র কোনো আবেগ (ইমোশন) দিয়ে চলে না; রাষ্ট্র চলে সংবিধান, আইন ও কানুন দিয়ে। সরকার ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা কোনো অবৈধ বা আরোপিত আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে।’

রোববার (১৫ মার্চ) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত এক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘জুলাই সনদ’ কার্যকরের বিষয়ে সংসদে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তারই প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই জবাব দেন।

বক্তব্যের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদীয় রীতিনীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা আনতে হলে কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বা ৬৮ ধারা অনুযায়ী নোটিশ দেয়ার বিধান রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা এমন কোনো নোটিশ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

বিরোধীদলীয় নেতার পঠিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন সংক্রান্ত কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। অথচ গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা এই আদেশটি না কোনো অধ্যাদেশ, না কোনো আইন। এটি একটি অদ্ভুত বিষয়।

তিনি আরও বলেন, এই আদেশের ওপর ভিত্তি করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেয়া এবং রাষ্ট্রপতির কাছে অধিবেশন আহ্বানের দাবি অসাংবিধানিক।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণভোটে জনগণের রায়কে আমরা সম্মান করি। কিন্তু আদেশের মাঝখানে জবরদস্তিমূলকভাবে এমন কিছু প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা জুলাই সনদের রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ ছিল না। চারটি ভিন্ন প্রশ্নের জন্য একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা যৌক্তিক ছিল না।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। সংবিধানে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সংস্কার পরিষদের শপথ বা অন্যান্য বিষয় আসবে।

তিনি বলেন, গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ অপশন থাকলেও মাঝপথে একটি আদেশের মাধ্যমে চারটি জটিল প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। ব্যালটের প্রশ্নগুলো পড়ার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল এবং চারটি প্রশ্নের জন্য আলাদা আলাদা ‘হ্যাঁ/না’ অপশন ছিল না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সংবিধান সংস্কারের বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোটের সার্টেন পোরশন কেন আনকন্সটিটিউশনাল ডিক্লেয়ার করা হবে না, সেই মর্মে রুলও জারি করা হয়েছে শুনলাম। এখানে হয়তো জুডিসিয়ারি মতামত দিবে, বাট জুডিসিয়ারির মতামত এই সভরেন পার্লামেন্টের ওপরে কখনো বাইন্ডিং না। কিন্তু সংসদ এমন কোনো আইন করতে পারে না যা বিচার বিভাগে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল বা অসাংবিধানিক হয়ে যায়। সুতরাং আমাদের উভয় দিকে লক্ষ্য রেখে বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে- মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে কনস্টিটিউশনাল ম্যানডেট, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য।

তিনি বলেন, কিন্তু আরেকটা আইন হয়েছে গণভোটের জন্য, এটা আমরাও প্রস্তাব করেছিলাম- যেহেতু আইনি ভিত্তি চেয়েছেন সবাই। ফলে জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে জনগণ কী বলে আমরা দেখি। সেখানে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে সই হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে যেটা সই হয়েছে। তার ওপর ভিত্তি করে জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে এ দেশের জনগণ আছে কি নাই সেই প্রশ্নে গণভোট হওয়া যেতে পারে। এবং সেটা একদিনে হবে না দুই দিনে হবে, সেই বাহাস অনেকদিন হয়েছে, অতঃপর একদিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জন করে সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেও সেই ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার দাবি বিরোধী দল করেছে বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্র কোনও আবেগ দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে সংবিধান ও আইন দিয়ে চলে বলেও সংসদে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভাষণ দিয়েছেন। আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুরা সেই ভাষণ শুনতে চাননি, তারা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য তারা ৫০ ঘণ্টা বরাদ্দ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। যদি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা হয়, তবে সংখ্যানুপাতে সময় বরাদ্দ করা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে যে ‘আরোপিত আদেশের’ কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনও সুযোগ নেই। রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে নয়, সংবিধান ও আইন মেনেই পরিচালিত হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ জবাব দেন।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা কোনও অবৈধ বা আরোপিত আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন সংক্রান্ত কোনও বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা যায় না। অথচ গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ কোনও অধ্যাদেশ বা আইন নয়।

এই আদেশের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়া এবং রাষ্ট্রপতির কাছে অধিবেশন আহ্বানের দাবি অসাংবিধানিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যালটে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ লেখা ছিল। কিন্তু এই আদেশটা মাঝখানে জারি করে আরেকটা প্রশ্ন ওখানে ইনট্রোডিউস করে দেওয়া হয়েছে, গণভোট দেওয়া হলো চারটা প্রশ্ন। যে প্রশ্নের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্ন জুলাই জাতীয় সনদে সমঝোতা হয়নি। ব্যালটে একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ ছিল। আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হলো যেটা আমার পড়তে লাগছে সাড়ে তিন ঘণ্টা। জনগণ সেটা পড়ে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ দিয়েছে কি না আমি জানি না। তবে চারটা ভোট, চারটা প্রশ্ন, সেই প্রশ্নের মধ্যে একটা অ্যানসার দিতে বলা হয়েছে- ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলুন। কিন্তু চারটা ভোটের তো চারটা প্রশ্ন থাকা উচিত ছিল যে আমরা কোন কোন প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বলবো, কোন কোন প্রশ্নে ‘না’ বলবা; সেই অপশনও ছিল না। আমি সেই লম্বা বাহাসে যাচ্ছি না। তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সেই গণভোট এই আইন অনুসারে- সেই রায় অনুসারে সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে, সংবিধানে সংশোধন আসতে হবে। সংবিধানে যদি সেটা আমরা গ্রহণ করি, তারপরে সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য তখন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হবে, সেটা তখনকার ব্যাপার হবে।

তিনি বলেন, ১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিন। আজ হয়তো আইনমন্ত্রী সেগুলো বিশেষ কমিটিতে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করতে পারেন, তারপরে সেটা স্ক্রুটিনি হবে, রিপোর্ট পেশ হবে। সময় আছে ৩০ দিন। এটা কোনো কার্যদিবস নয়, পঞ্জিকা দিবস। ৩০ দিনের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো সম্পর্কে আমাদেরকে ফয়সালা করতে হবে। এখন সেই অধ্যাদেশগুলো ফয়সালা করতে গিয়ে ১৫ দিন এখন লম্বা ছুটিতে, ২৯ তারিখের আগে আপনি সেশন করতে পারছেন না আজকের পরে। তখন এগুলো করতে করতে এই সেশন চলে যাবে। তারপরের সেশনে আপনার বাজেট অধিবেশন। বাজেট অধিবেশনের সময় যদি আপনারা অ্যালাউ করেন যে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে এই হাউস সিদ্ধান্ত নেয়, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, তখন বাজেটের এই সেশনের মধ্যেও সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি করে তারা এই জুলাই জাতীয় সনদকে সেখানে ধারণ করে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিল উত্থাপন করতে পারে। সেই বিলটা তারপরে আলোচনা হবে, পাস হবে, সেটা তখন সেই সেশনে করা যায় কি না আপনারা সিদ্ধান্ত নিবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, আমি পজিটিভলি যাচ্ছি, আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে। তো আমরা সেভাবে যাই। আমি বিরোধীদলের নেতাকে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে এই প্রস্তাব দিতে চাই যে- আসুন আমরা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে এই বিষয়ে আলোচনা করি, কখন সংবিধান সংশোধনের জন্য আমরা বিল উত্থাপন করতে পারবো। জুলাই জাতীয় সনদকে আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছি যে জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে সই হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সেটা কোনো সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন; সেটাও আমরা ডিবেট করি আলোচনা করি।

সবশেষে বিরোধীদলীয় নেতাকে কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসুন, আমরা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করি। আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছি যে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি শব্দকে আমরা সম্মান করি। আসুন, আমরা সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে বিল গ্রহণ করি এবং সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাই।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন ৫ সিটির প্রশাসক

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আবেগ নয়, চলতে হবে সাংবিধানিক পথে : সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৩:০৫:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্র কোনো আবেগ (ইমোশন) দিয়ে চলে না; রাষ্ট্র চলে সংবিধান, আইন ও কানুন দিয়ে। সরকার ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা কোনো অবৈধ বা আরোপিত আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে।’

রোববার (১৫ মার্চ) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত এক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘জুলাই সনদ’ কার্যকরের বিষয়ে সংসদে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তারই প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই জবাব দেন।

বক্তব্যের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদীয় রীতিনীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা আনতে হলে কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বা ৬৮ ধারা অনুযায়ী নোটিশ দেয়ার বিধান রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা এমন কোনো নোটিশ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

বিরোধীদলীয় নেতার পঠিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন সংক্রান্ত কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। অথচ গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা এই আদেশটি না কোনো অধ্যাদেশ, না কোনো আইন। এটি একটি অদ্ভুত বিষয়।

তিনি আরও বলেন, এই আদেশের ওপর ভিত্তি করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেয়া এবং রাষ্ট্রপতির কাছে অধিবেশন আহ্বানের দাবি অসাংবিধানিক।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণভোটে জনগণের রায়কে আমরা সম্মান করি। কিন্তু আদেশের মাঝখানে জবরদস্তিমূলকভাবে এমন কিছু প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা জুলাই সনদের রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ ছিল না। চারটি ভিন্ন প্রশ্নের জন্য একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা যৌক্তিক ছিল না।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। সংবিধানে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সংস্কার পরিষদের শপথ বা অন্যান্য বিষয় আসবে।

তিনি বলেন, গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ অপশন থাকলেও মাঝপথে একটি আদেশের মাধ্যমে চারটি জটিল প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। ব্যালটের প্রশ্নগুলো পড়ার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল এবং চারটি প্রশ্নের জন্য আলাদা আলাদা ‘হ্যাঁ/না’ অপশন ছিল না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সংবিধান সংস্কারের বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোটের সার্টেন পোরশন কেন আনকন্সটিটিউশনাল ডিক্লেয়ার করা হবে না, সেই মর্মে রুলও জারি করা হয়েছে শুনলাম। এখানে হয়তো জুডিসিয়ারি মতামত দিবে, বাট জুডিসিয়ারির মতামত এই সভরেন পার্লামেন্টের ওপরে কখনো বাইন্ডিং না। কিন্তু সংসদ এমন কোনো আইন করতে পারে না যা বিচার বিভাগে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল বা অসাংবিধানিক হয়ে যায়। সুতরাং আমাদের উভয় দিকে লক্ষ্য রেখে বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে- মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে কনস্টিটিউশনাল ম্যানডেট, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য।

তিনি বলেন, কিন্তু আরেকটা আইন হয়েছে গণভোটের জন্য, এটা আমরাও প্রস্তাব করেছিলাম- যেহেতু আইনি ভিত্তি চেয়েছেন সবাই। ফলে জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে জনগণ কী বলে আমরা দেখি। সেখানে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে সই হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে যেটা সই হয়েছে। তার ওপর ভিত্তি করে জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে এ দেশের জনগণ আছে কি নাই সেই প্রশ্নে গণভোট হওয়া যেতে পারে। এবং সেটা একদিনে হবে না দুই দিনে হবে, সেই বাহাস অনেকদিন হয়েছে, অতঃপর একদিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জন করে সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেও সেই ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার দাবি বিরোধী দল করেছে বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্র কোনও আবেগ দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে সংবিধান ও আইন দিয়ে চলে বলেও সংসদে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভাষণ দিয়েছেন। আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুরা সেই ভাষণ শুনতে চাননি, তারা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য তারা ৫০ ঘণ্টা বরাদ্দ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। যদি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা হয়, তবে সংখ্যানুপাতে সময় বরাদ্দ করা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে যে ‘আরোপিত আদেশের’ কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনও সুযোগ নেই। রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে নয়, সংবিধান ও আইন মেনেই পরিচালিত হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ জবাব দেন।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা কোনও অবৈধ বা আরোপিত আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন সংক্রান্ত কোনও বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা যায় না। অথচ গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ কোনও অধ্যাদেশ বা আইন নয়।

এই আদেশের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়া এবং রাষ্ট্রপতির কাছে অধিবেশন আহ্বানের দাবি অসাংবিধানিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যালটে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ লেখা ছিল। কিন্তু এই আদেশটা মাঝখানে জারি করে আরেকটা প্রশ্ন ওখানে ইনট্রোডিউস করে দেওয়া হয়েছে, গণভোট দেওয়া হলো চারটা প্রশ্ন। যে প্রশ্নের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্ন জুলাই জাতীয় সনদে সমঝোতা হয়নি। ব্যালটে একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ ছিল। আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হলো যেটা আমার পড়তে লাগছে সাড়ে তিন ঘণ্টা। জনগণ সেটা পড়ে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ দিয়েছে কি না আমি জানি না। তবে চারটা ভোট, চারটা প্রশ্ন, সেই প্রশ্নের মধ্যে একটা অ্যানসার দিতে বলা হয়েছে- ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলুন। কিন্তু চারটা ভোটের তো চারটা প্রশ্ন থাকা উচিত ছিল যে আমরা কোন কোন প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বলবো, কোন কোন প্রশ্নে ‘না’ বলবা; সেই অপশনও ছিল না। আমি সেই লম্বা বাহাসে যাচ্ছি না। তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সেই গণভোট এই আইন অনুসারে- সেই রায় অনুসারে সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে, সংবিধানে সংশোধন আসতে হবে। সংবিধানে যদি সেটা আমরা গ্রহণ করি, তারপরে সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য তখন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হবে, সেটা তখনকার ব্যাপার হবে।

তিনি বলেন, ১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিন। আজ হয়তো আইনমন্ত্রী সেগুলো বিশেষ কমিটিতে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করতে পারেন, তারপরে সেটা স্ক্রুটিনি হবে, রিপোর্ট পেশ হবে। সময় আছে ৩০ দিন। এটা কোনো কার্যদিবস নয়, পঞ্জিকা দিবস। ৩০ দিনের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো সম্পর্কে আমাদেরকে ফয়সালা করতে হবে। এখন সেই অধ্যাদেশগুলো ফয়সালা করতে গিয়ে ১৫ দিন এখন লম্বা ছুটিতে, ২৯ তারিখের আগে আপনি সেশন করতে পারছেন না আজকের পরে। তখন এগুলো করতে করতে এই সেশন চলে যাবে। তারপরের সেশনে আপনার বাজেট অধিবেশন। বাজেট অধিবেশনের সময় যদি আপনারা অ্যালাউ করেন যে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে এই হাউস সিদ্ধান্ত নেয়, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, তখন বাজেটের এই সেশনের মধ্যেও সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি করে তারা এই জুলাই জাতীয় সনদকে সেখানে ধারণ করে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিল উত্থাপন করতে পারে। সেই বিলটা তারপরে আলোচনা হবে, পাস হবে, সেটা তখন সেই সেশনে করা যায় কি না আপনারা সিদ্ধান্ত নিবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, আমি পজিটিভলি যাচ্ছি, আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে। তো আমরা সেভাবে যাই। আমি বিরোধীদলের নেতাকে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে এই প্রস্তাব দিতে চাই যে- আসুন আমরা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে এই বিষয়ে আলোচনা করি, কখন সংবিধান সংশোধনের জন্য আমরা বিল উত্থাপন করতে পারবো। জুলাই জাতীয় সনদকে আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছি যে জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে সই হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সেটা কোনো সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন; সেটাও আমরা ডিবেট করি আলোচনা করি।

সবশেষে বিরোধীদলীয় নেতাকে কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসুন, আমরা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করি। আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছি যে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি শব্দকে আমরা সম্মান করি। আসুন, আমরা সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে বিল গ্রহণ করি এবং সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাই।