রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে রাজশাহীতে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করব। আমের জন্য হিমাগার করা হবে। বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটায় রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে (ফায়ার সার্ভিস মোড় সংলগ্ন) আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের মানুষের জন্য কোনো কাজ হয়নি। মেগাপ্রকল্পের নামে দুর্নীতি হয়েছে। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হওয়া বরেন্দ্র প্রকল্প খালেদা জিয়ার শাসনামলে আরও বড় হয়েছিল, কিন্তু আজ তা বন্ধ। ক্ষমতায় এলে বরেন্দ্র প্রকল্প পুনরায় চালু করা হবে, খাল খনন করা হবে এবং পদ্মা নদী খনন করা হবে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে শুরু হওয়া খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময় দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে গৃহীত বিশাল সেচ প্রকল্পগুলো উত্তরবঙ্গের কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছিল।

তিনি আরো বলেন, পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে যে বিশাল সেচ প্রকল্পের নিজস্ব বাজেট ছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা, গত ১৬ বছরে সেটি পরিকল্পিতভাবে থামিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে আজ সেই প্রকল্প বন্ধপ্রায়। আমাদের লক্ষ্য হলো এই ঐতিহাসিক প্রকল্পটিকে আবার পূর্ণ শক্তিতে সচল করা।
বিএনপি চেয়ারম্যান উত্তরবঙ্গের কৃষকদের আশ্বস্ত করে বলেন, এই সেচ ব্যবস্থা শুধু রাজশাহীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই প্রকল্পের সুবিধা রাজশাহী থেকে শুরু করে সেই পঞ্চগড় পর্যন্ত কৃষকরা যেন পায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করব। উৎপাদন বাড়লে কৃষকের আয় বাড়বে, আর কৃষক হাসলে হাসবে বাংলাদেশ। আমরা চাই উত্তরের প্রতিটি প্রান্তরে সেচের পানি পৌঁছে যাক, যাতে আমাদের মায়েরা ও কৃষানিরা সমৃদ্ধির মুখ দেখতে পান।
তিনি পদ্মাপাড়ের মানুষের উদ্দেশে বলেন, পদ্মা ব্যারাজ করা হলে সবাই সুবিধা ভোগ করবে। রাজশাহীর আম সংরক্ষণ ও হিমাগার তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। এজন্য তিনি উত্তরাঞ্চলের প্রত্যেক আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান।

বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফেরও প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, কৃষক যদি আজকে ভালো থাকে, তাহলে অবশ্যই দেশের মানুষ ভালো থাকবে। কৃষক যদি আজকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে দেশের মানুষও সহজেই কৃষি উৎপাদিত যে সকল পণ্য আছে—সেগুলো তারা সহজেই তাদের ব্যবহারের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। এবং সেজন্যই কৃষক ভাইদেরকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা ঠিক ফ্যামিলি কার্ড যেমন মায়েদের হাতে পৌঁছে দিতে চাই, কৃষক ভাইদের জন্য আমরা কৃষি কার্ড একটি পৌঁছে দিতে চাই। প্রত্যেক কৃষক ভাইদের কাছে যার (কার্ডের) মাধ্যমে তারা ব্যাংকের ঋণসহ যার মাধ্যমে তারা সরকারের পক্ষ থেকে কীটনাশক ঔষধ, বীজ সহ সার সহ এই সুবিধাগুলো সরাসরি আমরা কৃষক ভাইদের হাতে পৌঁছে দিতে চাই।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা হিসাব-নিকাশ করে দেখেছি এবং তারপরে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত যাদের কৃষি ঋণ এই মুহূর্ত পর্যন্ত আছে, ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে আমরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করব ইনশাআল্লাহ।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, একটি মহল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে। বিগত ১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি নিশিরাতের নির্বাচন দেখেছি, গায়েব নির্বাচন দেখেছি, দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেন। পেরেছিলেন আপনারা? পারেননি আপনারা ভোট দিতে। তারা চলে গেছে যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল।
তিনি বলেন, আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করছে। ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে। কিভাবে এই নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কিভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়।
তারেক রহমান বলেন, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন যাতে কেউ বানচাল করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, সজাগ থাকতে হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। ঝগড়া, বিবাদ বা বিসংবাদে জড়াতে চাই না। তাই কারও সমালোচনা করছি না। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বলব সঠিক তদন্ত করুন। তদন্তে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা তা করব। তবে তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ এবং বিচার হতে হবে আইন অনুযায়ী। আমরা দেশে শান্তি চাই এবং সবাইকে নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।
স্মৃতিচারণ ও আত্মিক বন্ধন বক্তব্যের শুরুতে স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ ২২ বছর পর আপনাদের সাথে সরাসরি দেখা হলো। সর্বশেষ ২০০৪ সালে এসেছিলাম; বিভিন্ন উপজেলায় গিয়েছি, শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। আপনাদের সাথে আমার একটি আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান দেশ গড়েছেন, খালেদা জিয়া দেশ গড়েছেন। এই দেশই আমাদের প্রথম ও শেষ ঠিকানা। আমাদের মূলমন্ত্র করব কাজ, গড়ব দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।
রাজশাহীর উন্নয়ন ও পদ্মা ব্যারেজ বিএনপি সরকার গঠন করলে রাজশাহীতে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ আমি জনগণের কথা বলতে চাই; যে কথা বললে মানুষের উন্নয়ন ও উপকার হবে। রাজশাহীর কথা বললেই দুটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমটি পদ্মা নদী। কিন্তু দুঃখজনক হলো পদ্মা, তিস্তা কিংবা ব্রহ্মপুত্র, কোথাও আজ পর্যাপ্ত পানি নেই।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘নদীতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শহীদ জিয়া বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করার পর দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। আমরা সেই ধারা সঠিকভাবে পুনরায় চালু করতে চাই। ধানের শীষের সরকার গঠিত হলে ইনশাআল্লাহ পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের কাজ হাতে নেব। পুরোনো পরিকল্পনাগুলোকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো হবে। আর এর জন্য আপনাদের মূল্যবান ভোটে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে।’
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান রাজশাহীর শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকারত্ব নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘রাজশাহী একটি শিক্ষানগরী। এখানে অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই; শিক্ষিত যুবকরা আজ ঘরে বসে আছে। আমাদের এই দিকে নজর দিতে হবে। আমরা রাজশাহীর আইটি পার্ককে সচল করতে চাই। এছাড়া আম সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার ও বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে আম চাষিদের ভাগ্য উন্নয়নের চিন্তা আমাদের রয়েছে।’

রাজশাহী বিভাগে আম সংরক্ষণে আধুনিক হিমাগার তৈরি করার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘রাজশাহীতে আইটি পার্ক আছে কিন্তু তা কোনো কাজে আসে না। এই আইটি পার্ককে সচল করতে চায় বিএনপি। যার মাধ্যমে শিক্ষিত উচ্চ শিক্ষিত সবার জন্য আইটি সেক্টরে দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বিএনপি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য কোনো কাজ করা হয়নি, মেগারপ্রকল্প হাতে নিয়ে মেগা দুর্নীতি করা হয়েছিল, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন নাই, স্বাস্স্থ্যসেবার মান নিম্নমানে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাবে নাকি, অন্যকোনো দিকে যাবে।
জনগণের জন্য মেগা প্রজেক্ট হবে জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, তাই জনগণের প্রজেক্টের জন্য গণতন্ত্র প্রয়োজন। যেকোন মূল্যে গণতন্ত্রের ঝান্ডাকে ওপরে তুলতে হবে। কোনো অবস্থায় গণতন্ত্রের ঝান্ডা নিচে নামানো যাবে না।
কারো সমালোচনা করতে চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকলে, তবে অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সঠিক তদন্ত করতে হবে। বিএনপির কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে তা দিতে প্রস্তুত। বিএনপি দেশে শান্তি চায়। কোন ধর্ম দেখা হবে না, সবাই বাংলাদেশি। যারা শান্তিতে বিশ্বাসী তাদরকে পাশে রাখবে বিএনপি।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে কেউ দেখেনি কার কী ধর্ম। আজ দেশ গড়ার সময়েও আমরা ধর্ম দেখব না। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেশে শান্তি চাই। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সকলকে নিয়ে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন দেশের মানুষ স্বৈরাচার বিদায়ে রাজপথে নেমেছিল, তখন কেউ দেখেনি কার ধর্ম কী। তাই আজ গণতন্ত্র রক্ষা ও দেশ গড়ার কাজেও আমরা ধর্ম দেখব না, আমরা দেখব ভোটার এবং মানুষ হিসেবে তার পরিচয়।’

বিএনপি নেতা তারেক রহমান রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৩টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে ধানের শীষ ভোট চান। তারা হলেন শরীফ উদ্দীন (রাজশাহী-১), মিজানুর রহমান মিনু (রাজশাহী-২), মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন (রাজশাহী-৩), ডি এম ডি জিয়াউর রহমান (রাজশাহী-৪), নজরুল ইসলাম, আবু সাইদ চাঁদ (রাজশাহী-৫); শাহ্জাহান মিঞা (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১), আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), হারুনুর রশীদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩); ফারজানা শারমীন (নাটোর-১), এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (নাটোর-২), আনোয়ারুল ইসলাম (নাটোর-৩) ও আব্দুল আজিজ (নাটোর-৪)।
উপস্থিত নেতৃবৃন্দ জনসভায় তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবায়দা রহমান উপস্থিত ছিলেন। রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
জনসভাকে কেন্দ্র করে মাদরাসা মাঠ ও এর আশপাশের এলাকা নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি 





















