নিজস্ব প্রতিবেদক :
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, এই সরকার এসে ভারতের আধিপত্য থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে। ভারতের যে আগ্রাসী একটা ভূমিকা ছিল সব জায়গায়, সেখান থেকে স্বাধীন কন্ঠে কথা বলতে পারছে।
তিনি বলেন, অবশ্যই সমালোচনার কিছু কিছু যৌক্তিক দিক আছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাটা নির্দয় পর্যায়ে চলে যায়। ১০টা জিনিসের যদি সরকার ৪টা জিনিস করে, ৪টা করেছে সেটা বলেন, এরপর যে ৬টা করতে পারে নাই সেটার জন্য সমালোচনা করেন। কিন্তু এরকম কিছুই দেখবেন না।
আওয়ামী লীগের কিছু সন্ত্রাসীর জামিন হয়েছে, এর দায় বিচারপতিদের বলে মন্তব্য কওে আইন উপদেষ্টা বলেন, প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ছিল তাদের অপসারণ করা। আওয়ামী লীগের আমলে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে আমরা সমালোচনা করেছি, এখন কেন তাকে নিয়ে কথা বলেন না বলেও প্রশ্ন রাখেন তিনি।
আসামিদের হাইকোর্টে দেয়া জামিন নিয়ে আইন উপদেষ্টাকে দোষ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় বাতিল হলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক নাকি আইনমন্ত্রীকে দোষ দিয়েছিলেন? শামসুদ্দিন মানিকের উদ্ভট কর্মকাণ্ডের জন্য কি তাকে নাকি আইনমন্ত্রীকে দোষ দিয়েছিলেন? তাহলে এখন কেন আইনমন্ত্রীকে দোষ দেন? যেটার সঙ্গে আইনমন্ত্রীর কোনো সম্পর্কই, সেগুলোর ক্ষেত্রে কিছু করারও নেই।
আইন উপদেষ্টাকে দুইটি কারণে দোষ দেয়া হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রথমত ভিউ ভালো হয়, ব্যবসাটা ভালো হয়, মনিটাইজেশন হয়। আসিফ নজরুল নামে একটা গালি দিলে একটু টাকা আসে। আর আরেকটি হচ্ছে, এখানে বিশেষ একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে। আমাকে দুর্বল করলে বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন সহজ হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিন-চারজন উপদেষ্টা বিভিন্ন সময় পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলে বলেন, এই অন্যায় আক্রমণ, অন্যায় সমালোচনা, সারাক্ষণ গালাগালি, অশ্লীল অশ্রাব্য গালাগালি, প্রাণনাশের আশঙ্কা অবর্ণনীয় জীবন— এই জীবন কে উপভোগ করে? প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘এটা একটা দল। একজন পদত্যাগ করলে আরেকজনের মনোবল নষ্ট হবে, আরও দাবি আসবে, আমরা কোনো কাজ করতে পারবো না। শুধু কাজ করে যাও।’ সেজন্য কাজ করে যাচ্ছি। যতদিন বাংলাদেশে থাকবো, সব কিছুর উত্তর দেবো।
বিচার বিভাগের সংস্কারের কথা উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, এখন বিচার বিভাগে পদ সৃষ্টি, বদলি, পদোন্নতি, বাজেট অ্যালোকেশনসহ সবকিছু উচ্চ আদালতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কি সংস্কার না? রাষ্ট্রের এত বড় একটা অঙ্গের বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটা কোনো সংস্কার না? এটা কি আপনাদের মনে হয় না বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় একসময় ভূমিকা রাখবে? সংস্কার ম্যাজিক লাইট না যে সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, আমরা একটা গুম কমিশন করেছি। এটা অসাধারণভাবে কাজ করেছে। এই কমিশনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা একটা হিউম্যান রাইটস কমিশন ল করেছি। আমি আপনাদের প্রত্যয়ের সঙ্গে বলি, দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো হিউম্যান রাইটস আইনের চেয়ে আমাদের আইনটা বেটার হয়েছে। আমরা এই আইন অনুযায়ী অচিরেই হিউম্যান রাইটস কমিশনে নিয়োগ দিতে যাচ্ছি। এটা কি কোনো সংস্কার না? আমাদের এই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা ম্যানেজমেন্ট একটা বিশাল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কিছু কাজের বিবরণ দিয়ে শ্রোতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন উত্থাপন করে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের যে রিজার্ভ বেড়েছে, আমাদের যে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আছে, আমাদের যে ব্যাংকিং খাতে ভগ্নপ্রায়, বিধ্বস্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং আস্থা ফিরে এসেছে এগুলি কোনো সাফল্য না? আমাদের যে ২০ হাজারেরও বেশি হয়রানিমূলক মামলা, যেখানে প্রায় ৫ লাখ আসামি ছিল বিরোধীদলের, ভিন্নমতের। সেই মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। এগুলো কি কোনো সাফল্য না?
তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত ১৬ মাসে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিং কার বিরুদ্ধে হয়েছে? আমার বিরুদ্ধে হয়েছে, চ্যালেঞ্জ করে বললাম। প্রথম চার মাসে শুধু চারটা ডেডিকেটেড ভিডিও করা হয়েছে আমাকে টার্গেট করে।
আইন উপদেষ্টা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ১৫ বছর ছিলাম পাকিস্তানের দালাল, ওভার নাইট আমি ভারতের দালাল হয়ে গেছি। আমার আমেরিকায় বাড়ি আছে, আমার পরিবার চলে গেছে অলরেডি আমেরিকায়। প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে বলেছি আজ থেকে ছয় মাস আগে, কেউ খুঁজে বের করতে পারেনি। যেই মিথ্যুক, যে যে বদমাইশ এগুলো প্রচার করেছে, তাদের কেউ কিছু বলেছেন? এর চেয়ে বড় সাইবার বুলিং হয়? একটা মানুষ যার জীবনে সততা সবচেয়ে বড় অহংকার, তার বিরুদ্ধে এই ধরনের ক্যাম্পেইন করা হয়েছে।
জুলাইয়ের মামলাগুলোয় জামিনের ব্যাপারে তার হাত নেই দাবি করে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে যত জামিন হয়েছে জুলাইয়ের ঘটনায়, এই জামিনের ৯০ শতাংশ হয়েছে হাইকোর্ট থেকে। হাইকোর্টে যে জামিন দেয়, জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি কোনো ভুল থাকে সেটা বিচারকের দোষ। বিচারকদের অনেকেই আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া, তাদের সরানোর দায়িত্ব ছিল প্রধান বিচারপতির অধীনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। এখানে আইনমন্ত্রী কিছু করতে পারেন না। আমি কি হাইকোর্টের বিচারককে সরাতে পারি?
তিনি বলেন, হাইকোর্টের বিচারক জামিন দিলে আমি কি হাইকোর্টের বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি? হাইকোর্টের বিচারক যদি অন্যায়ভাবে জামিন দেন, এটা হাইকোর্টের বিচারকের দোষ। আর হাইকোর্টের বিচারকের নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছে প্রধান বিচারপতি। তাহলে প্রধান বিচারপতিকে আপনারা প্রশ্ন করেছেন? হাইকোর্টে যতগুলো জামিন হয়েছে, সবগুলা আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনি যদি সত্যি এসব বন্ধ করতে চান, তাহলে আপনি যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন না কেন?
রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য দায় দেওয়া হয় মন্তব্য করে আসিফ নজরুল বলেন, এই দায়টা আমার ওপর দুইটা কারণে দেয়। একটা হচ্ছে ভিউ ভালো হয়, ব্যবসাটা ভালো হয়, মনিটাইজেশন হয়। আসিফ নজরুলের নামে একটা গালি দিলে একটু টাকা আসে। আরেকটা হচ্ছে- এখানে বিশেষ একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে। আসিফ নজরুলকে দুর্বল করলে বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন সহজ হয়।
সবাইকে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ইসলাম ধর্মে আছে, সবচেয়ে বড় গুণের একটা হচ্ছে আত্মসমালোচনা করা। আসেন আমরা সবাই আত্মসমালোচনা করি। সবাই সবার মতামত, সবার সীমাবদ্ধতা, শক্তিমত্তা বুঝার চেষ্টা করি। এভাবেই যদি আমরা অগ্রসর হই, আগামীতে আমরা ধীরে ধীরে সংস্কারের পথে অগ্রসর হতে পারবো।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















