দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপি জিয়াউর রহমানের দল, বেগম খালেদা জিয়ার দল। আমরা এমন একটি দল, যারা সেই কাজ করতে চাই, যাতে মানুষের উপকার হয়। আমরা খাল কাটা খনন শুরু করলাম। সারা বাংলাদেশে আমরা এটা করব।
সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে দিনাজপুরের কাহারোলের বলরামপুরে সাহাপাড়া খাল খননের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদেরকে পরিকল্পনা করতে হবে এবং আমাদেরকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে যে, বিভিন্ন রকম কথাবার্তা বলে কারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। পারবেন? কে পারবেন? খেয়াল রাখতে হবে। অনেকে আছেন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কিন্তু বিভ্রান্ত করতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের রাজনীতি কৃষকের উপকার করা। আমাদের রাজনীতি মা বোনদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে এলাকার মানুষ, দেশের মানুষ, গ্রামের মানুষ কীভাবে ভালো চিকিৎসা পেতে পারে সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরা, কীভাবে লেখাপড়া করে মানুষ হতে পারে। সেটি হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কী করে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। সেটি কৃষিতেই হোক, সেটি শিল্পতে হোক, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু এই কাজগুলো যদি করতে হয় আমি কিন্তু একা পারবো না। কাকে লাগবে সাথে? কাকে লাগবে? জনগণকে সাথে লাগবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনে যেমন আপনারা ধানের শীষের সাথে ছিলেন, নির্বাচনের সময় যেমন আপনারা আমাদেরকে সমর্থন দিয়েছেন, এখনো কিন্তু আপনাদের সমর্থন ছাড়া এই কাজগুলো করতে পারব না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সমর্থন ছাড়া দেশে উন্নয়নের কাজ করা সম্ভব নয়, কারণ আমরা বিশ্বাস করি জনগণই হচ্ছে আমাদের সকল ক্ষমতার উৎস। এই দেশের মালিক কারা? কারা দেশের মালিক? জনগণ।
তারেক রহমান বলেন, কয়েক দিন আগে নির্বাচনে সবাই ভোট দিয়েছেন। নতুন এবং আগে যারা ভোটার ছিলেন তারা এত বছর ভোট দিতে পারেনি। আমরা নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমরা জানি বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে থাকেন। কৃষির সঙ্গে অনেকে জড়িত। আমরা বিশ্বাস করি কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এজন্য আমরা মন্ত্রিসভার বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাহাপাড়ায় খাল খনন শেষ হলে এ এলাকার ৩১ হাজার কৃষক পানি পাবে এবং ১২০০ হেক্টর জমি সেচের সুবিধা হবে। প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ সরাসরি এই খাল থেকে সুবিধা পাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবসময় সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বিশ্বাসী। জনকল্যাণ ও কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যেই সরকার সারাদেশে খাল খনন ও সংস্কারের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, আমরা যারা বিএনপি করি, এই দলের কাজ হচ্ছে এমন কাজ করা যা করলে মানুষের উপকার হবে এবং মানুষ খুশি হবে। আমরা চেষ্টা করি সেই কাজগুলোই করতে এবং সে কারণেই আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি, আনুষ্ঠানিকভাবে আজকে আমরা এই সাহাপাড়া খালটি আমরা খনন করতে যাচ্ছি।
প্রায় ১২ কিলোমিটার লম্বা এই খাল খননের কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে পারলে তার ফলাফল কেমন হবে এ বিষয়েও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সম্পূর্ণভাবে যখন কাজ শেষ করব, তখন প্রায় ৩১ হাজার কৃষক এখান থেকে পানি পাবে। প্রায় ১২০০ হেক্টর জমি এই খালে যে পানি থাকবে, সেই পানির সেচ সুবিধার মধ্যে আসবে। সাড়ে তিন লাখ মানুষ এই খালের পানির সুবিধা পাবে, এই খালের পানি বিভিন্নভাবে তারা ব্যবহার করতে পারবে। শুধু তাই নয়, এখন যেই ফসল উৎপাদন হচ্ছে, তার থেকে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন বেশি ফসল উৎপাদিত হবে।
খাল খনন কেন জরুরি এ বিষয়ে বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে যে খালগুলো আগে ছিল প্রায় সকল খাল ভরাট হয়ে গিয়েছে। আমি আসার পথে বিভিন্ন জায়গায় দেখলাম নদীর পর্যন্ত ভরাট হয়ে গিয়েছে। নদীর মধ্যে কিছু চাষবাসের কাজ হচ্ছে। ছোট ছোট কালভার্ট ব্রিজ যখন পার হয়ে আসলাম দেখলাম যে অনেকগুলো খাল প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছে। এই এলাকায় খবর নিয়ে জানলাম, বর্ষার মৌসুমেও খরা হয়, অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা এই বর্ষার পানিকে কাজে লাগাতে চাই।
বিএনপির রাজনীতি মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তনের রাজনীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে যে মাসে ৫ হাজার টাকা আয় করে আমরা চাই তার আয় আগামী দুই চার বছরের মধ্যে যাতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় পৌঁছে। যে ২ হাজার টাকা ইনকাম করে আমরা চাই এমন পদক্ষেপ নিতে যার মাধ্যমে তার ইনকামটা ডবল হবে। এটাই হচ্ছে আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য। এটাই হচ্ছে শহীদ জিয়ার রাজনীতি। এটাই হচ্ছে খালেদা জিয়ার রাজনীতি এবং এটাই হচ্ছে আপনাদের নির্বাচিত বিএনপি সরকারের রাজনীতি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিরাট একটা দেশ। এই দেশে ২০ কোটি মানুষ বাস করে। এই মানুষগুলোর জন্য খাবার দাবারের ব্যবস্থা, আমরা এত মানুষের খাবার কি বিদেশ থেকে আনা সম্ভব? বিদেশ থেকে আনা সম্ভব না। এই খাবার আমাদেরকে এই দেশেই উৎপাদন করতে হবে।
খালের দুই পাশে বৃক্ষরোপণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, সাহাপাড়ার খালের পাড়ে প্রায় সাত হাজার গাছ লাগানো হবে। পাশাপাশি মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য খালের পাশ দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হবে, যাতে এলাকার মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে অনেক এলাকায় খাল ও নদীতে পানি না থাকায় কৃষকদের গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই মাটির ওপরে থাকা পানিকে সংরক্ষণ করা এবং পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা জরুরি।
কৃষকদের সহায়তায় নতুন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাবেন। শিগগিরই এর পাইলট প্রকল্প শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের চার কোটি পরিবারের মায়েদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে দেশের সব এলাকার মা-বোনদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোতে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন তারেক রহমান। এ বিষয়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাত বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ঈদের পর তাদের নিয়ে বৈঠক করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়সহ এ এলাকায় কৃষি-নির্ভর মিল ও শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এতে স্থানীয় তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তারেক রহমান বলেন, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নত করা। তিনি বলেন, মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় করা মানুষের আয় যেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়—এমন নীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোই বিএনপির রাজনীতির লক্ষ্য। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কৃষকের বন্ধু ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারও কৃষকের পাশে থাকতে চায়।
দেশের উন্নয়নে জনগণের সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণই দেশের মালিক এবং জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম সফল করা সম্ভব নয়। তাই দেশ গড়ার এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশ গড়ার একটি নতুন উদ্যোগের সূচনা হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে মানুষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।
দিনাজপুরের সাহাপাড়ায় খাল খননের কাজ সম্পন্ন হলে আবারও এলাকাটি পরিদর্শনে আসবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী এবং এই কর্মসূচি সফল করতে এলাকাবাসীকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সাদিক রিয়াজ চৌধুরী, দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি 




















