Dhaka বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আমরা এমন সমাজ উপহার দিতে চাই, যেখানে নেতার আগে জনতা : জুবাইদা রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বিএনপি চেয়ারম্যান ও ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমাজ, এমন একটি রাষ্ট্র উপহার দিতে চাই জনগণকে, যেখানে নেতার আগে জনতা। করব কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সেজন্য আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।’

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে হাতিরঝিল অ্যাম্পিথিয়েটারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে বিএনপির নির্বাচনী পরিচালনা পেশাজীবী কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতি সুষ্ঠু পরিকল্পনার রাজনীতি। এখন আমাদের গৌরবের নতুন সূর্যোদয়। আমরা বলি, ‘‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ, ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ, ভেদাভেদের আগে সমতা, সবার জন্য সমান সুযোগ-শ্রমের মর্যাদা। আমরা সকলকে দিতে চাই শ্রমের মর্যাদা, মেধার মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক চাকরি এবং অধিকার, সুবিচার, শোষণের আগে অধিকার।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আমরা দিতে চাই শ্রমের মর্যাদা, মেধার মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক চাকরি এবং ন্যায়ভিত্তিক অধিকার।শোষণের আগে অধিকার- এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাস করি।

তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, যেখানে নেতার আগে জনতা। করবো কাজ, গড়বো দেশ- সবার আগে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আপনারা আপনাদের মূল্যবান সময় নিয়ে এখানে এসেছেন আমাদের কথা শুনেছেন এবং আপনাদের সমস্যাগুলো আমাদেরকে বলেছেন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো আপনাদের সমস্যাগুলো আরো শুনব, আরও জানব। আমরা একে-অপরকে আরও জানতে চেষ্টা করব সমস্যাগুলো কীভাবে সুষ্ঠুভাবে সমাধান করে একটি সুন্দর সমতাভিত্তিক জ্ঞানভিত্তিক শ্রমভিত্তিক রাষ্ট্র উপহার দেওয়া যায়।’

এই অনুষ্ঠানে সব পেশার মানুষজন এক সঙ্গে আসায় তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জুবাইদা রহমান বলেন, ‘এতক্ষণ আমরা শুনলাম ভাষানটেক, কড়াইল, সাততলা থেকে আগত তিনজন বোনের হৃদয় বিদারক অনেক সমস্যার কথা, শুনলাম দুইজন পোশাককর্মী ভাই ও বোনের হৃদয় বিদারক সমস্যাগুলোর কথা এবং একজন পরিবহনকর্মী ভাইয়ের কথা।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের সমস্যা অনেক। আমি-আপনি-আমাদের সকলের সমস্যা অনেক। সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব।’

সভায় উপস্থিত জনসাধারণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আজ আপনারা প্রমাণ করেছেন যে আপনারা সবাই একসঙ্গে আছেন। আপনারা আপনাদের মূল্যবান সময় নিয়ে এখানে এসেছেন, আমাদের কথা শুনেছেন এবং আপনাদের সমস্যাগুলো আমাদের জানিয়েছেন। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলো আরও শুনবো, আরও জানবো।

তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কীভাবে সমস্যাগুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধান করে একটি সুন্দর, সমতাভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক ও শ্রমের মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্র উপহার দেওয়া যায় সে লক্ষ্যেই বিএনপি কাজ করছে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী বলেন, বিএনপির রাজনীতি হলো পরিকল্পনা, ঐক্য ও মানবিক মর্যাদার রাজনীতি। এখানে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’ সবার আগে। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশ, ক্ষমতার চেয়ে দেশপ্রেম বড়। এ দর্শন নিয়েই আমরা এগোতে চাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না।

তিনি বলেন, ভাষানটেক ও কড়াইল বস্তি থেকে আসা তিন বোন, পোশাক শিল্পের দুই পরিশ্রমী নারী শ্রমিক এবং একজন পরিবহন শ্রমিকের কষ্টের কথা আমরা শুনেছি। এ সমস্যাগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্য দিতে হবে, মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি, নেতা নয়।

ভাষানটেক, কড়াইল ও সাততলার বস্তিবাসী থেকে শুরু করে নারী পোশাক শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিক, সবার কণ্ঠ মিলেছে এক জায়গায়।

ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির মতবিনিময় সভায় ডা. জুবাইদা রহমান তুলে ধরেন একটি সমতা, সম্মান ও পরিকল্পনাভিত্তিক বাংলাদেশের রূপরেখা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির নির্বাচনী পরিচালনা পেশাজীবী কমিটির দলনেতা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পোশাক শ্রমিকসহ সব শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শুধু নিত্যপণ্যের দাম নয়, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়সহ সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা হবে। প্রতি পাঁচ বছর নয়, দুই বছর অন্তর মজুরি পুনর্নির্ধারণে কমিশন গঠন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ নয়, বরং কড়াইলসহ বিভিন্ন বস্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে, যা নির্মাণ শুরুর আগেই বস্তিবাসীদের নামে হস্তান্তর করা হবে।

পরিবহন খাতকে দেশের ‘লাইফলাইন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের জন্য বিমা চালু করা হবে। দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে চিকিৎসা ও পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

ভাষানটেক: আবাসন, কাজ ও নারীর ক্ষমতায়নের দাবি

ভাষানটেক বস্তিবাসীদের পক্ষে সভায় বক্তব্য দেন গৃহিণী তানিয়া আক্তার। তিনি বলেন, বিএনপি শাসনামলে ভাষানটেকে দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য একটি আবাসন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা কোনো ঘর পাননি।

তিনি বলেন, তারেক রহমান ‘ঘরের লোক’ এবং একজন দেশপ্রেমিক নেতা। তিনি নির্বাচিত হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি তাদের অভাব, অভিযোগ জানাতে পারবে। ভাষানটেক, ধামালকোট ও সাততলা এলাকার প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি গৃহিণীদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং বাল্যবিয়ে রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

কড়াইল: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থায়ী বসবাসের আকুতি

কড়াইল বস্তিবাসীদের পক্ষে সভায় কথা বলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার বিথি। তিনি বলেন, বারবার উচ্ছেদ অভিযানের কারণে কড়াইলবাসীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। দরিদ্র জনবসতির জন্য তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারে যে স্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা রয়েছে, তা এলাকাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, কড়াইলে কোনো সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। ফলে শিক্ষার হার ও মান দুটোই শোচনীয়। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

চিকিৎসা সেবা ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জরুরি ভিত্তিতে একটি ডেলিভারি সেন্টার ও শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের দাবি জানান।

সাততলা: অগ্নিঝুঁকি ও নারী নিরাপত্তার প্রশ্ন

সাততলা বস্তিবাসীদের পক্ষে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নার্গিস আক্তার বলেন, ঘনবসতি ও অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উন্নত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, এলাকায় কোনো সরকারি ডেলিভারি সেন্টার বা প্রসূতি হাসপাতাল নেই। ফলে অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঘরে সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। এ সংকট নিরসনে একটি আধুনিক ডেলিভারি সেন্টার স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।

নারী নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্যে নারীদের চলাচল অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত আলো ও স্ট্রিট লাইট স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

পরিবহন শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও হয়রানির অভিযোগ

পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষে নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, অটোরিকশার আধিক্যে দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং সনাতন রিকশাচালকরা যাত্রী সংকটে পড়ছেন। চালকরা দৈনিক ১৬–১৮ ঘণ্টা কাজ করেও পরিবার চালাতে পারছেন না।

লাইসেন্স নবায়ন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং রাস্তায় হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরে তিনি শ্রমিকবান্ধব পরিবহন নীতির দাবি জানান।

নারী পোশাক শ্রমিকদের ক্ষোভ ও দাবি

নারী পোশাক শ্রমিকদের পক্ষে ফাতেমা খাতুন বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা যেখানে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পান, সেখানে পোশাক শ্রমিকরা পান মাত্র ৪ মাস। পোশাক শ্রমিকরা রোবট নন। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে ছুটি ৬ মাস করার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, অনেক কারখানায় নারী শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সুপারভাইজারদের গায়ে হাত তোলা, কুপ্রস্তাব এবং জোরপূর্বক অতিরিক্ত কাজ করানো বন্ধ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকদের জন্য সুলভ মূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সভা শেষে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ এবং সবার আগে বাংলাদেশ। এ নীতিতেই আমরা একটি মানবিক ও সমতার বাংলাদেশ গড়তে চাই।

 

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

এসএ কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে যৌথ অভিযানে কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ, আটক ২

আমরা এমন সমাজ উপহার দিতে চাই, যেখানে নেতার আগে জনতা : জুবাইদা রহমান

প্রকাশের সময় : ১১:০৫:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বিএনপি চেয়ারম্যান ও ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমাজ, এমন একটি রাষ্ট্র উপহার দিতে চাই জনগণকে, যেখানে নেতার আগে জনতা। করব কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সেজন্য আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।’

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে হাতিরঝিল অ্যাম্পিথিয়েটারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে বিএনপির নির্বাচনী পরিচালনা পেশাজীবী কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতি সুষ্ঠু পরিকল্পনার রাজনীতি। এখন আমাদের গৌরবের নতুন সূর্যোদয়। আমরা বলি, ‘‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ, ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ, ভেদাভেদের আগে সমতা, সবার জন্য সমান সুযোগ-শ্রমের মর্যাদা। আমরা সকলকে দিতে চাই শ্রমের মর্যাদা, মেধার মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক চাকরি এবং অধিকার, সুবিচার, শোষণের আগে অধিকার।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আমরা দিতে চাই শ্রমের মর্যাদা, মেধার মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক চাকরি এবং ন্যায়ভিত্তিক অধিকার।শোষণের আগে অধিকার- এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাস করি।

তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, যেখানে নেতার আগে জনতা। করবো কাজ, গড়বো দেশ- সবার আগে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আপনারা আপনাদের মূল্যবান সময় নিয়ে এখানে এসেছেন আমাদের কথা শুনেছেন এবং আপনাদের সমস্যাগুলো আমাদেরকে বলেছেন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো আপনাদের সমস্যাগুলো আরো শুনব, আরও জানব। আমরা একে-অপরকে আরও জানতে চেষ্টা করব সমস্যাগুলো কীভাবে সুষ্ঠুভাবে সমাধান করে একটি সুন্দর সমতাভিত্তিক জ্ঞানভিত্তিক শ্রমভিত্তিক রাষ্ট্র উপহার দেওয়া যায়।’

এই অনুষ্ঠানে সব পেশার মানুষজন এক সঙ্গে আসায় তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জুবাইদা রহমান বলেন, ‘এতক্ষণ আমরা শুনলাম ভাষানটেক, কড়াইল, সাততলা থেকে আগত তিনজন বোনের হৃদয় বিদারক অনেক সমস্যার কথা, শুনলাম দুইজন পোশাককর্মী ভাই ও বোনের হৃদয় বিদারক সমস্যাগুলোর কথা এবং একজন পরিবহনকর্মী ভাইয়ের কথা।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের সমস্যা অনেক। আমি-আপনি-আমাদের সকলের সমস্যা অনেক। সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব।’

সভায় উপস্থিত জনসাধারণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আজ আপনারা প্রমাণ করেছেন যে আপনারা সবাই একসঙ্গে আছেন। আপনারা আপনাদের মূল্যবান সময় নিয়ে এখানে এসেছেন, আমাদের কথা শুনেছেন এবং আপনাদের সমস্যাগুলো আমাদের জানিয়েছেন। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলো আরও শুনবো, আরও জানবো।

তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কীভাবে সমস্যাগুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধান করে একটি সুন্দর, সমতাভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক ও শ্রমের মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্র উপহার দেওয়া যায় সে লক্ষ্যেই বিএনপি কাজ করছে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী বলেন, বিএনপির রাজনীতি হলো পরিকল্পনা, ঐক্য ও মানবিক মর্যাদার রাজনীতি। এখানে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’ সবার আগে। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশ, ক্ষমতার চেয়ে দেশপ্রেম বড়। এ দর্শন নিয়েই আমরা এগোতে চাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না।

তিনি বলেন, ভাষানটেক ও কড়াইল বস্তি থেকে আসা তিন বোন, পোশাক শিল্পের দুই পরিশ্রমী নারী শ্রমিক এবং একজন পরিবহন শ্রমিকের কষ্টের কথা আমরা শুনেছি। এ সমস্যাগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্য দিতে হবে, মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি, নেতা নয়।

ভাষানটেক, কড়াইল ও সাততলার বস্তিবাসী থেকে শুরু করে নারী পোশাক শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিক, সবার কণ্ঠ মিলেছে এক জায়গায়।

ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির মতবিনিময় সভায় ডা. জুবাইদা রহমান তুলে ধরেন একটি সমতা, সম্মান ও পরিকল্পনাভিত্তিক বাংলাদেশের রূপরেখা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির নির্বাচনী পরিচালনা পেশাজীবী কমিটির দলনেতা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পোশাক শ্রমিকসহ সব শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শুধু নিত্যপণ্যের দাম নয়, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়সহ সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা হবে। প্রতি পাঁচ বছর নয়, দুই বছর অন্তর মজুরি পুনর্নির্ধারণে কমিশন গঠন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ নয়, বরং কড়াইলসহ বিভিন্ন বস্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে, যা নির্মাণ শুরুর আগেই বস্তিবাসীদের নামে হস্তান্তর করা হবে।

পরিবহন খাতকে দেশের ‘লাইফলাইন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের জন্য বিমা চালু করা হবে। দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে চিকিৎসা ও পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

ভাষানটেক: আবাসন, কাজ ও নারীর ক্ষমতায়নের দাবি

ভাষানটেক বস্তিবাসীদের পক্ষে সভায় বক্তব্য দেন গৃহিণী তানিয়া আক্তার। তিনি বলেন, বিএনপি শাসনামলে ভাষানটেকে দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য একটি আবাসন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা কোনো ঘর পাননি।

তিনি বলেন, তারেক রহমান ‘ঘরের লোক’ এবং একজন দেশপ্রেমিক নেতা। তিনি নির্বাচিত হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি তাদের অভাব, অভিযোগ জানাতে পারবে। ভাষানটেক, ধামালকোট ও সাততলা এলাকার প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি গৃহিণীদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং বাল্যবিয়ে রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

কড়াইল: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থায়ী বসবাসের আকুতি

কড়াইল বস্তিবাসীদের পক্ষে সভায় কথা বলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার বিথি। তিনি বলেন, বারবার উচ্ছেদ অভিযানের কারণে কড়াইলবাসীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। দরিদ্র জনবসতির জন্য তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারে যে স্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা রয়েছে, তা এলাকাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, কড়াইলে কোনো সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। ফলে শিক্ষার হার ও মান দুটোই শোচনীয়। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

চিকিৎসা সেবা ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জরুরি ভিত্তিতে একটি ডেলিভারি সেন্টার ও শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের দাবি জানান।

সাততলা: অগ্নিঝুঁকি ও নারী নিরাপত্তার প্রশ্ন

সাততলা বস্তিবাসীদের পক্ষে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নার্গিস আক্তার বলেন, ঘনবসতি ও অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উন্নত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, এলাকায় কোনো সরকারি ডেলিভারি সেন্টার বা প্রসূতি হাসপাতাল নেই। ফলে অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঘরে সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। এ সংকট নিরসনে একটি আধুনিক ডেলিভারি সেন্টার স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।

নারী নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্যে নারীদের চলাচল অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত আলো ও স্ট্রিট লাইট স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

পরিবহন শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও হয়রানির অভিযোগ

পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষে নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, অটোরিকশার আধিক্যে দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং সনাতন রিকশাচালকরা যাত্রী সংকটে পড়ছেন। চালকরা দৈনিক ১৬–১৮ ঘণ্টা কাজ করেও পরিবার চালাতে পারছেন না।

লাইসেন্স নবায়ন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং রাস্তায় হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরে তিনি শ্রমিকবান্ধব পরিবহন নীতির দাবি জানান।

নারী পোশাক শ্রমিকদের ক্ষোভ ও দাবি

নারী পোশাক শ্রমিকদের পক্ষে ফাতেমা খাতুন বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা যেখানে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পান, সেখানে পোশাক শ্রমিকরা পান মাত্র ৪ মাস। পোশাক শ্রমিকরা রোবট নন। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে ছুটি ৬ মাস করার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, অনেক কারখানায় নারী শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সুপারভাইজারদের গায়ে হাত তোলা, কুপ্রস্তাব এবং জোরপূর্বক অতিরিক্ত কাজ করানো বন্ধ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকদের জন্য সুলভ মূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সভা শেষে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ এবং সবার আগে বাংলাদেশ। এ নীতিতেই আমরা একটি মানবিক ও সমতার বাংলাদেশ গড়তে চাই।