Dhaka রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আনন্দ বা মঙ্গল নয়, হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ : সংস্কৃতিমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

পয়লা বৈশাখে যে শোভাযাত্রা হবে সেটি আর আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে হবে না। এবার সেটি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে উদযাপিত হবে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।

রোববার (০৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউনেসকো স্বীকৃত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে। এ সিদ্ধান্ত তখন সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

গত ৩১ মার্চ সংস্কৃতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, শোভাযাত্রাটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে চলে আসছিল। আমাদের কোনো অ্যালার্জি নেই যে ‘মঙ্গল’ দিলে আমাদের ক্ষতি হবে বা ‘আনন্দ’ দিলে আমাদের লাভ হবে। আমরা আনন্দ ও মঙ্গলের এই বিতর্ককে অনর্থক মনে করি।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে আনন্দ শোভাযাত্রা নাম দেওয়ায় আমরা তাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু, এটি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

পরে ২ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বলেছে, ‘শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচরিত ধর্মীয় ঐতিহ্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে পয়লা বৈশাখের মতো জাতীয় উৎসবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হলে ওলামায়ে কেরাম চুপ করে বসে থাকবেন না।’

সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী বলেন, নাম (শোভাযাত্রা) নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা এই বিতর্কের অবসান করতে চাই। আজকের বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি— আমরা এটিকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ও বলবো না, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ও বলবো না। শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে, যেখানে সব সংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যার যার মতো ঢোল-বাদ্য, পোশাক-আশাক নিয়ে একটি আনন্দঘন শোভাযাত্রা হবে। এই শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী আনন্দ— সবকিছুতেই আমরা বৈশাখকে হাইলাইট করতে চাই। এটি আমাদের সিদ্ধান্ত।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, পহেলা বৈশাখ নিয়ে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হাজার বছরের পুরোনো পহেলা বৈশাখ— ১৯৮৯ সালে এরশাদের আমলে এই শোভাযাত্রা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে চালু হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা ‘আনন্দ’ বাদ দিয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে আবার এর নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে।

সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, এ সরকারের দায়বদ্ধতা জনগণ, জাতি ও দেশের কাছে। আমরা চাই, অতীতের যা কিছু গ্লানি— তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু আমরা সমাজে বিভাজন চাই না। মানুষের মধ্যে অনৈক্য ও সংঘাত আমরা চাই না। আমরা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য চাই। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মত, আদর্শ ও ভাবনার মানুষ থাকবে— এটিই গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য।

নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করায় ইউনেসকোর স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কি ইউনেসকো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র? যখন নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল; যখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল। আমরা তাদের জানিয়ে দেবো— আমাদের দেশে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হবে। এটাই আমাদের ঐতিহ্য।

তিনি বলেন, শোভাযাত্রার নামে ইউনেসকো কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। তারা স্বীকৃতি দিয়েছে বৈশাখের উৎসবকে। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। আমাদের সংস্কৃতি কি শুধু শোভাযাত্রা? আরও অনেক কিছু রয়েছে।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে।

দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য বজায় রেখে সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে। সভায় গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কবে থেকে সাধারণ মানুষের জন্য চালু হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের জন্য আমাদের এখনো কাজকর্ম সব কমপ্লিট হয়নি। এখনো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে খুব শিগগিরই হবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। এছাড়া সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও আয়োজক কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও অংশ নেন।

আবহাওয়া

সংবাদ সম্মেলনে অঝোরে কাঁদলেন নিশো

আনন্দ বা মঙ্গল নয়, হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ : সংস্কৃতিমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০২:৩৫:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

পয়লা বৈশাখে যে শোভাযাত্রা হবে সেটি আর আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে হবে না। এবার সেটি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে উদযাপিত হবে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।

রোববার (০৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউনেসকো স্বীকৃত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে। এ সিদ্ধান্ত তখন সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

গত ৩১ মার্চ সংস্কৃতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, শোভাযাত্রাটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে চলে আসছিল। আমাদের কোনো অ্যালার্জি নেই যে ‘মঙ্গল’ দিলে আমাদের ক্ষতি হবে বা ‘আনন্দ’ দিলে আমাদের লাভ হবে। আমরা আনন্দ ও মঙ্গলের এই বিতর্ককে অনর্থক মনে করি।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে আনন্দ শোভাযাত্রা নাম দেওয়ায় আমরা তাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু, এটি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

পরে ২ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বলেছে, ‘শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচরিত ধর্মীয় ঐতিহ্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে পয়লা বৈশাখের মতো জাতীয় উৎসবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হলে ওলামায়ে কেরাম চুপ করে বসে থাকবেন না।’

সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী বলেন, নাম (শোভাযাত্রা) নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা এই বিতর্কের অবসান করতে চাই। আজকের বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি— আমরা এটিকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ও বলবো না, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ও বলবো না। শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে, যেখানে সব সংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যার যার মতো ঢোল-বাদ্য, পোশাক-আশাক নিয়ে একটি আনন্দঘন শোভাযাত্রা হবে। এই শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী আনন্দ— সবকিছুতেই আমরা বৈশাখকে হাইলাইট করতে চাই। এটি আমাদের সিদ্ধান্ত।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, পহেলা বৈশাখ নিয়ে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হাজার বছরের পুরোনো পহেলা বৈশাখ— ১৯৮৯ সালে এরশাদের আমলে এই শোভাযাত্রা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে চালু হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা ‘আনন্দ’ বাদ দিয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে আবার এর নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে।

সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, এ সরকারের দায়বদ্ধতা জনগণ, জাতি ও দেশের কাছে। আমরা চাই, অতীতের যা কিছু গ্লানি— তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু আমরা সমাজে বিভাজন চাই না। মানুষের মধ্যে অনৈক্য ও সংঘাত আমরা চাই না। আমরা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য চাই। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মত, আদর্শ ও ভাবনার মানুষ থাকবে— এটিই গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য।

নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করায় ইউনেসকোর স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কি ইউনেসকো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র? যখন নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল; যখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল। আমরা তাদের জানিয়ে দেবো— আমাদের দেশে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হবে। এটাই আমাদের ঐতিহ্য।

তিনি বলেন, শোভাযাত্রার নামে ইউনেসকো কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। তারা স্বীকৃতি দিয়েছে বৈশাখের উৎসবকে। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। আমাদের সংস্কৃতি কি শুধু শোভাযাত্রা? আরও অনেক কিছু রয়েছে।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে।

দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য বজায় রেখে সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে। সভায় গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কবে থেকে সাধারণ মানুষের জন্য চালু হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের জন্য আমাদের এখনো কাজকর্ম সব কমপ্লিট হয়নি। এখনো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে খুব শিগগিরই হবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। এছাড়া সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও আয়োজক কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও অংশ নেন।