নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের সড়ক পরিবহনে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি নজরদারিতে আনলে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।
রোববার (২৯ মার্চ) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সড়কমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও কাউন্টারে গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, অনেক যাত্রী নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে জানেন না। এই অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় ভাড়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং যাত্রীরা প্রকৃত ভাড়া কত হওয়া উচিত, তা বুঝতে পারেন না।
তিনি বলেন, যাত্রীদের সুবিধার জন্য প্রতিটি কাউন্টার ও বাসে ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে নির্ধারিত ভাড়া প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। এতে করে যাত্রীরা সহজেই ভাড়া যাচাই করতে পারবেন এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ কমে আসবে। আগে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা কম ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতেন, যা পরবর্তীতে ভুল ধারণা তৈরি করেছে।
সড়কমন্ত্রী বলেন, কোনো পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিলে তা অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে ভিজিল্যান্স টিম, পুলিশ কন্ট্রোল রুমসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। যাত্রীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যেখানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আড়ালে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। তবে সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। অনেক সময় পরিবহন মালিকরা নিজেদের সিদ্ধান্তে ভাড়া সমন্বয় করেন, যা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে এবং এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণসহ অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা চলছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণে সরকারি উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলে জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, এতদিন এসি বাসের ভাড়া সরকার নিয়ন্ত্রণ করত না, তবে এখন তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সড়ক পরিবহন বলেন, কয়েকটি দুর্ঘটনা ছাড়া এবারের ঈদযাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল। যেখানে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নন-এসি বাসের পাশাপাশি এসি বাসের ভাড়াও নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী ঈদেও যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
সভা শেষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, মহাসড়কে যত্রতত্র বাস কাউন্টার স্থাপন করা যাবে না। শতভাগ যাত্রী নামিয়ে গাড়ি ফেরিতে উঠাতে হবে। সব গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে, যার মাধ্যমে রুট পরিবর্তন, অতিরিক্ত গতি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
নৌ দুর্ঘটনা ও ফেরি পারাপারে ঝুঁকি এড়াতে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, এখন থেকে ফেরিতে বাস তোলার আগে অবশ্যই শতভাগ যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যাত্রীসহ বাস ফেরিতে তোলা যাবে না।
সড়ক পরিবহন বলেন, ফেরিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকে রেলিং লাগানো বাধ্যতামূলক করা হবে। অনেক সময় ফেরিতে গাড়ি ওঠানামার সময় বা ঢেউয়ের কবলে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, যা রেলিং স্থাপনের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আমরা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে দায়বদ্ধ। অনেক সময় ফেরিতে যাত্রীসহ বাস দুর্ঘটনায় পড়লে বড় প্রাণহানি ঘটে। এটি রোধ করতেই যাত্রীদের নামিয়ে খালি বাস ফেরিতে তোলার নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হবে।
সচিবালয়ের এই সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই নির্দেশনার ফলে ফেরি ঘাটগুলোতে জননিরাপত্তা আরো জোরদার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, সরকারি হিসাবে ঈদযাত্রার ১১ দিনে সড়ক, মহাসড়ক, নৌ ও রেলপথে মোট ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মহাসড়কে ৪৭ জন, নৌপথে ৮ জন, রেলপথে ১৭ জন এবং অন্যান্য দুর্ঘটনায় বাকিদের মৃত্যু হয়। গত বছর একই সময়ে ১৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
এ সময় সড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে সকল বাস বা কমার্শিয়াল পরিবহন- এগুলোতে জিপিএস ট্র্যাকার বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই জিপিএস ইন্সটল (বসানো) করলে জিপিএসের মাধ্যমে যারা ওভার স্পীড করবে, ৮০ কিলোমিটার বা ৬০ কিলোমিটার লিমিটের বাইরে যারা যারা যাবে, তাদের প্রত্যেকের রেকর্ড আমাদের কাছে আসবে। সে অনুযায়ী তার জরিমানা চলে যাবে।
তিনি বলেন, যারা রুট মেনে গাড়ি চালাবে না, অর্ধেক পথ থেকে ফিরে যাবে। জিপিএস-এর মাধ্যমে জিও-ফেন্সিং সহ রুট যে এলাকায় যাওয়ার কথা, সেই এলাকার বাইরে গেলে বা রুট যদি ভায়োলেট করে, সেটা দিয়েও মামলা হবে।
সড়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, জিপিএস-এর মাধ্যমে দেখা যাবে আনফিট বাসগুলো রাস্তায় নেমেছে কিনা। ওইটা আমাদের কাছে রেকর্ড আছে কারা কারা ফিটনেস নবায়ন করে নাই। কিন্তু সে রাস্তায় নামলে, আমরা তাকে জরিমানা করতে পারব। রাস্তায় নামালে ওই ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, জিপিএসের যে কন্ট্রোল রেগুলেশন সফটওয়্যার, এভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং এই ডিজিটাল সিস্টেমে অলরেডি আমরা ডিএমপি এবং হাইওয়ে পুলিশ সিসি ক্যামেরা রেকর্ড দ্বারা, স্পিড ক্যামেরা রেকর্ড দিয়ে কিন্তু ডিজিটাল সিস্টেমে মামলা চলমান আছে। অতএব, আস্তে আস্তে এটা শৃঙ্খলায় আসবে।
জিপিএস কি শুধু হাইওয়ের গাড়িতে বসবে- জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জিপিএস সকল গাড়ির জন্য। ধরেন একটা গাড়ি ঢাকার ভিতরে ঢোকার কথা না, সে গাবতলী পর্যন্ত থাকবে, এখন সে চলে আসলো এখানে কলাবাগান পর্যন্ত বা এদিকে আরামবাগ পর্যন্ত। ওই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হবে। এই যে রাস্তায় জোর জবরদস্তি করে যারা, তাকে মামলা দেব, রুট পারমিট নাই, ঢাকার ভিতরে প্রবেশ করছে কেন, ওই আমিন বাজার ক্রস করলেই তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। তার রুটগুলো আমিন বাস্তবায়ন হবে।
তিনি আরও বলেন, এটা সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলে আমরা আশা করতেছি। এই জিপিএস চালু, প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে মালিক এবং শ্রমিকরা, তারাও এখান একমত হয়েছে জিপিএস চালু হওয়া উচিত।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















