স্পোর্টস ডেস্ক :
শুরুতে শ্রীলঙ্কার তিন উইকেট নিয়ে তাদের চাপে ফেললো বাংলাদেশ। এরপর বড় জুটিতে ম্যাচ হেলে যায় শ্রীলঙ্কার দিকে। কিন্তু ফের উইকেট নিয়ে সফরকারীদের চাপে ফেলে স্বাগতিকরা। তাওহীদ হৃদয়ের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের কল্যাণে পাওয়া রান অবশ্য শেষ অবধি যথেষ্ট হয়নি জয়ে।
শুক্রবার (১৫ মার্চ) চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বাংলাদেশকে ৩ উইকেটে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। শুরুতে ব্যাট করতে নেমে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৮৬ রান করে বাংলাদেশ। ওই রান তাড়া করতে নেমে ৪৭ ওভার ১ বলে জয় পায় সফরকারীরা।
২৮৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে শ্রীলঙ্কা। প্রথম ওভারেই লঙ্কান ওপেনার আভিস্কা ফার্নান্দোকে ফেরান শরীফুল ইসলাম। এরপর বাংলাদেশের বোলারদের উপর চড়াও হন কুশল মেন্ডিস ও নিশঙ্কা জুটি।
প্রথম ওভারে উইকেট হারানোর পরও পাঁচ ওভারে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ৪২ রান তোলেন লঙ্কান দুই টপ অর্ডার। তবে ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে প্রথমবার বোলিংয়ে এসেই লঙ্কান ইনিংসে আঘাত হানেন পেসার তাসকিন আহমেদ। লঙ্কান অধিনায়ক কুশল মেন্ডিসকে (১৬) মুশফিকুর রহিমের কাছে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তাসকিন। মেন্ডিসকে ফেরানোর পর আবার আঘাত হানেন শরীফুল ইসলাম, ফেরান সাদিরা সামারাবিক্রমাকে (১)। ৪৩ রানেই ৩ উইকেট নেই শ্রীলঙ্কার!
সেটা ৫৭/৪ হয়ে যেত, যদি লিটনের হাত থেকে আসালঙ্কার ক্যাচটা ফসকে না যেত! তাসকিন আহমেদের করা দশম ওভারের দ্বিতীয় বলে আসালাঙ্কা গালিতে ক্যাচ দিয়েছিলেন, কিন্তু লিটন ডাইভ দিয়ে বলটা হাতের নাগালে পেলেও ক্যাচটা ধরে রাখতে পারেননি। আসালঙ্কার রান তখন মাত্র ৬! এরপর আর পেছনে তাকাননি লঙ্কান সহ-অধিনায়ক। ওপেনার পাথুম নিশঙ্কাকে নিয়ে তানজিম-তাইজুলদের উপর চড়াও হন।
স্বাগতিকদের আর কোনো সুযোগ না দিয়েই আগ্রাসী ক্রিকেট খেলছেন দুজন। দুই টপ অর্ডারই তাদের ব্যক্তিগত অর্ধশতক তুলে নিয়ে ২৬তম ওভারে তাদের জুটির শতরান পূরণ করেন। এরপর নিজেদের রান তোলার গতি আরো বাড়ান নিশঙ্কা-আসালঙ্কা।
শুধু রানই বাড়াননি, রেকর্ডও ভেঙেছেন। ১৯৯৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অর্জুনা রানাতুঙ্গা ও রোশান মাহানামার গড়া ১৭১ রানের জুটিই এতদিন ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার চতুর্থ উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি ছিল, সে রেকর্ড আজ ভেঙে দিয়েছেন আসালঙ্কা-নিশঙ্কা। নিশঙ্কা তো সেঞ্চুরিই পেয়ে যান।
শ্রীলঙ্কার জয় যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই ৩৭তম ওভারে রেকর্ড ১৮৫ রানের জুটি ভাঙেন স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। ১১৪ রান করে ফেরেন নিশঙ্কা। লঙ্কান ওপেনারের বিদায়ের পর আসালঙ্কাকে ফেরান তাসকিন আহমেদ। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৯ রান দূরে থেকে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন চারিথ।
এরপর তানজিম সাকিব যখন জানিথ লিয়ানাগেকে ফেরান, ২২৮ রানে ২ উইকেট থেকে ২৫১ রানে ৬ উইকেট হয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। উত্তেজনা ফেরে চট্টগ্রামের গ্যালারিতে। কিন্তু ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ও দুনিথ ভেল্লালাগে সব উত্তেজনায় জল ঢেলে দেন! হাসারাঙ্গা শেষ পর্যন্ত ২৫ রান করে আউট হলেও ততক্ষণে শ্রীলঙ্কা জয় থেকে মাত্র ২ রান দূরে!
এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের হয়ে ইনিংস শুরু করতে আসেন লিটন কুমার দাস ও সৌম্য সরকার। তবে শুরুটা ভালো হয়নি টাইগারদের। ইনিংসের তৃতীয় বলেই রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরে যান লিটন। এরপর দ্বিতীয় উইকেটে ব্যাট হাতে আসেন আগের ম্যাচে শতক করা টাইগার অধিনায়ক শান্ত।
নাজমুল হাসান শান্তকে সঙ্গে নিয়ে শুরুর ধাক্কা সামাল দেন সৌম্য। সাবলীল ব্যাটিংয়ে রানের চাকা সচল রাখেন এই দুই ব্যাটার। ৭৫ রানের জুটি গড়েন শান্ত-সৌম্য। তবে ৩৯ বলে ৪০ রান করে আউট হন টাইগার অধিনায়ক। তার বিদায়ের পর উইকেটে আসেন তাওহিদ হৃদয়।
তৃতীয় উইকেটে হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে ব্যাট করতে থাকেন সৌম্য। ৫২ বলে নিজের অর্ধশত পূরণ করেন এই টাইগার ওপেনার। এদিকে লঙ্কানদের বিপক্ষে দারুণ এই ফিফটি হাঁকিয়ে আজ দুর্দান্ত এক রেকর্ড গড়েছেন সৌম্য। বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দ্রুততম ২ হাজার রান করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। এ মাইলফলক ছুঁতে সৌম্য খেলেছেন ৬৪ ইনিংস।
এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল শাহরিয়ার নাফিস ও লিটন দাসের দখলে। দুজনেই ৬৫ ইনিংস খেলে করেছিলেন ২ হাজার রান। অর্ধশতকের পর কিছুটা মারমুখী ব্যাটিং করতে থাকেন সৌম্য। তবে দলীয় ১৩০ রানে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। প্যাভিলিয়নে ফেরার আগে ৬৬ বলে ৬৮ রানের ইনিংস খেলেন তিনি।
সৌম্যের বিদায়ের পর ক্রিজে এসেই সাজঘরে ফিরে যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। রানের খাতা খোলার আগেই ফিরে যান তিনি। দ্রুত জোড়া উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকে পঞ্চম উইকেটে ব্যাট হাতে নামা মুশফিকুর রহিম ও হৃদয় জুটি গড়ে এগোতে থাকে।
তবে উইকেটে থিতু হয়ে ইনিংস বড় করতে পারেননি মুশি। দলীয় ১৭৩ রানে আউট হয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন মুশফিক। সাজঘরে যাবার আগে ২৮ বলে ২৫ করেন তিনি। এরপর ষষ্ট উইকেটে ব্যাট হাতে নামানে মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে উইকেটে এসে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি টাইগার এই অলরাউন্ডার। দলীয় ১৮৯ রানে সাজঘরে ফেরেন ১২ রান করে।
শেষ দিকে বাংলাদেশের যাওয়া আসা মিছিলে ব্যাট হাতে লড়াই চালিয়ে যান তাওহিদ হদয়। তার ৯৬ রানের ইনিংসে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৮৬ রানের সংগ্রহ পায় টাইগাররা। শ্রীলঙ্কার হয়ে বল হাতে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা নেন সর্বোচ্চ চার উইকেট।
আগামী ১৮ মার্চ একই মাঠে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। টি-টোয়েন্টি সিরিজের মতো ওয়ানডে সিরিজের নিষ্পত্তিও হবে সিরিজের শেষ ম্যাচে। টি-টোয়েন্টি সিরিজের মতো ওয়ানডে সিরিজের শেষটাও লঙ্কানরা রাঙাক, শান্তরা নিশ্চয়ই তা চাইবেন না।