হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
বিএনপি সংস্কার চায় না-এমন বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ দাবি করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি শুধু সংস্কার চায় না, সংস্কার বাস্তবায়নও করবে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) বেলা ১২টায় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে ‘তেলিয়াপাড়া দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব ও অস্তিত্ব— মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরকে সামনে নিয়ে বরাবর এগিয়েছি, এখনও আমরা এগিয়ে যাবো।
মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়কে সহ্য করে না, বারবার মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সবশেষে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা আন্দোলনের মাধ্যমে তাদেরকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা আমাদের আরেকটা গৌরবের ও আনন্দের পরিচয়ের ইতিহাস। আমরা জুলাই যুদ্ধকে ধারণ করি, জুলাই সংগ্রামকে ধারণ করি, জুলাই অভ্যুত্থানকে ধারণ করি।
বিএনপি সংস্কার চায় না এমন প্রচারণা চালিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে সংস্কারের সূচনা করেন এবং খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতি চালু করেন।
কোনো একক ব্যক্তির নির্দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়নি মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলায় যখন নিরস্ত্র বাঙালি দিশেহারা, তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ বাঙালিকে বিদ্যুতায়িত করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তির নির্দেশে হয়নি।
মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তির নির্দেশে হয়নি। তেলিয়াপাড়া চা বাগানে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে এবং মেজর জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে সেক্টর কমান্ডাররা একত্র হয়ে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাগানের বাংলোয় অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘সূতিকাগার’ হিসেবে পরিচিত।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তার ঘোষণার পর সেনাবাহিনী ও মুক্তিকামী জনতা যুদ্ধে অংশ নেয়।
শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, জিয়াউর রহমান পরিবার রেখে যুদ্ধে যোগ দেন।
তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করেন এবং পরবর্তীতে পাকবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। এসবই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস, যা অতীতে আড়াল করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
‘বিএনপি সংস্কার চায় না’, এমন প্রচারণা ‘মিথ্যা’ দাবি করে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সংস্কারের সূচনা করেন। খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করেন। ২০২২ সালে ঘোষিত বিএনপির ৩১ দফায় বর্তমান সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর নাম অতীতে উচ্চারিত হয়নি। তিনি বলেন, তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি আওয়ামী লীগের বর্ণনায় প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি বলেন, আমার খুব কষ্ট হয় যখন কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেন। যারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে চায়, আমি তাদেরকে পরিষ্কার করে বলতে চাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিচয়, গর্ব, ঐতিহ্য, অস্তিত্ব।
জুলাই সংস্কার নিয়ে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। এদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে। সবশেষে ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছে। সেটি আমাদের গৌরবের আরও একটি ইতিহাস। আমরা সেজন্যই জুলাই যুদ্ধকে ধারণ করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ, কিছু সংখ্যক রাজনৈতিক দল তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তারা বলতে চায় বর্তমান বিএনপি জুলাই যুদ্ধকে স্বীকার করে না। এ রকম ডাহা মিথ্যা কথা, মিথ্যা প্রচারণা কোনো ভাবেই স্বীকার করে নেওয়া যাবে না।
মির্জা ফখরুল বলেন, সংস্কারতো আমরা শুরু করেছি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। সর্বশেষ আমাদের নেতা তারেক রহমান ২০২২ সালেই ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে সংস্কারের সবগুলো বিষয় তুলে ধরেছিলেন। আমরা সংস্কার চাই। সংস্কার বাস্তবায়ন করবো।
অনুষ্ঠান শেষে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য অতিথিরা।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিকের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব হুমায়ূন কবিরের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এমপি, জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ জি কে গউছ এমপি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম, হবিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ মো. ফয়সল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নাঈম জাহাঙ্গীর, সদস্য সচিব সাদেক খান।
হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি 




















