গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি :
গাজীপুরের শ্রীপুরে ভুল চিকিৎসায় রুমা আক্তার (২৫) নামে এক প্রসূতি মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে বিক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা হাসপাতাল ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের সঙ্গেও তাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড গ্রামের মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থিত লাইফ কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত রুমা আক্তার (২৫) শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব এলাকার মানিক মিয়ার স্ত্রী। তাদের সংসারে ১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। রুমা আক্তার উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের হেরা পটকা গ্রামের আব্দুর রশিদের মেয়ে।
ঘটনার প্রতিবাদে আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন মাওনা-কালিয়াকৈর আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলা এ বিক্ষোভে সড়কটিতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ওই সড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শ্রীপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের সঙ্গেও বিক্ষোভকারীদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
নিহতের স্বামী মানিক মিয়া বলেন, তার স্ত্রীর প্রসববেদনা উঠলে শনিবার (৭ মার্চ) দিবাগত রাত দুইটার দিকে মাওনা চৌরাস্তার লাইফ কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রোববার (৮ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে আশুলিয়া নারী ও শিশু কেন্দ্রের গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং ওই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাজশ্রী ভৌমিক ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক রেজোয়ান রুমা আক্তারকে অপারেশন কক্ষে নিয়ে যান। দুপুর ১২টার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তাদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়।
তিনি বলেন, এরপর থেকেই প্রসূতি রুমাকে অপারেশন থিয়েটারে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রুমার সঙ্গে স্বজনদের দেখা করতে দিচ্ছিল না। এতে তাদের সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে স্বজনেরা জোর করে অপারেশন কক্ষে ঢুকে রুমা আক্তারকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি জানালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করে।
রুমা আক্তারের বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, সকাল ১০টার দিকে মেয়েকে সিজারের জন্য অপারেশন কক্ষে নেওয়া হয়। দুপুর ১২টার দিকে ছেলে সন্তানকে বের করে দেওয়া হলেও বিকেল চারটা পর্যন্ত রোগীকে বাইরে আনা হয়নি। সোমবার (৯ মার্চ) সেহরি খাওয়ার পর হঠাৎ রুমার পেট ফুলে যায় এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে জানা যায়। পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বজনদের না জানিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য উত্তরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পথে প্রসূতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল সাতটার দিকে এ খবর জানাজানি হলে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে লাইফ কেয়ার হাসপাতালে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। তারা চারতলা ভবনের অপারেশন থিয়েটারসহ প্রতিটি তলার কক্ষ ভাঙচুর করেন। স্বজনদের অভিযোগ, প্রসূতি রুমাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বের করে নেওয়া হয়েছিল। পরে উত্তরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
লাইফ কেয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আজাহারুল ইসলাম পারভেজ বলেন, প্রসূতির স্বজনেরা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর করেছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা যন্ত্রপাতি, চেয়ার ও অপারেশন থিয়েটারের ভেতরের সরঞ্জাম ভেঙে ফেলা হয়েছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ক্যাশে থাকা প্রায় ২০ লাখ টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, রোগীর স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী লাইফ কেয়ার হাসপাতালে প্রসূতির সিজার হওয়ার পর যে ২৪ ঘণ্টা ফলোআপ চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে নবজাতকের অবস্থাও সংকটাপন্ন দেখতে পান।
তিনি বলেন, স্বজনদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যাতে আগে নবজাতকের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তদন্তের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম বলেন, স্বজনদের অভিযোগ- হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। সিজার করতে গিয়ে নবজাতকের মাথার কিছু অংশে আঘাতও লেগেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই শিশুটিকে ভালো পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এর আগেও এ হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালটির কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও চিকিৎসকেরও সংকট রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ায় হাসপাতালটি সিলগালা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রসূতির স্বজনদের বাধার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করা সম্ভব হয়নি।
প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি জোরদার করেছে।
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি 






















