নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মাতৃভাষা রয়েছে। সেগুলোর সংরক্ষণ জরুরি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দায়িত্ব আমাদের ওপরই বর্তেছে ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরি করার। বাংলাদেশে প্রায় ৬৫টির বেশি ভাষা রয়েছে, সেগুলোকেও সংরক্ষণ করতে হবে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, প্রথম ভাষা হিসেবে এর গুরুত্ব অটুট। তবে এর পাশাপাশি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে কোন ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেটিও এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজির চেয়ে অন্য ভাষার প্রয়োজন রয়েছে। মাদরাসাগুলোতে আরবিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেখানে ইংরেজি বা বাংলাকে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। যা আছে তাই চলছে।
ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা ইংরেজি, উর্দু বা আরবিতে স্বপ্ন দেখি না, স্বপ্ন দেখি বাংলা ভাষায়। চিন্তা, জ্ঞান বিতরণ, অনুভব সবকিছুর শুরু মাতৃভাষা দিয়ে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিদেশে ইংরেজিতে কথা বললেও মনের ভেতর অনেকে বাংলাতেই ভাবেন।
আ ন ম এহছানুল হক বলেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার গতানুগতিক ধারায় কেবল বেকারত্বই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা শেখাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে বেকারত্ব বাড়িয়ে তুলছি। শিক্ষা কি মূলত বেকারত্ব বাড়ানোর জন্য, নাকি কমানোর জন্য—এই মৌলিক প্রশ্নটি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষা যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারে, তবে সেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শিল্প, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিশু প্রকৃতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বেশি শেখে। কিন্তু উচ্চতর পর্যায়ে ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তৃত হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তা কর্মক্ষম ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে। ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং মানসম্মত, কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের লক্ষ্য।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, শিক্ষা কি বেকারত্ব কমানোর জন্য, নাকি বাড়ানোর জন্য? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত ধারায় শিক্ষা বিস্তারের ফলে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে না। নতুন নতুন কলেজ, বিষয় ও প্রতিষ্ঠান চালুর দাবি এলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ভাষা। বাংলাদেশ ও ভারতের একটি বড় অংশে বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়। মাতৃভাষাই মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন ও অনুভূতির প্রধান বাহন। মানুষ বিদেশে অন্য ভাষায় কথা বললেও মনের ভেতর ভাবনা ও বিশ্লেষণ মাতৃভাষাতেই করে। পৃথিবীতে অসংখ্য মাতৃভাষা রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। সে জায়গায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভাষা সংরক্ষণের যে দায়িত্ব বাংলাদেশ পেয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে। দেশের ভেতরেও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলা ভাষার ব্যবহারে শুদ্ধতা ও ব্যাকরণচর্চার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম ও জনপরিসরে ভাষার বিকৃতি বাড়ছে। বানান ও ব্যাকরণের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ভারসাম্য নিয়েও ভাবতে হবে। বাংলা আমাদের প্রথম ভাষা হলেও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে কোন ভাষা কতটা গুরুত্ব পাবে, তা সময়োপযোগীভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষায় আরবি ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেখানে বাংলা ও ইংরেজির সমন্বয় কীভাবে করা যায়, তা বাস্তবভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আদালতের রায় বাংলায় দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ আরও সহজে বুঝতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি, তবে এ বিষয়ে নানা আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন রয়েছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করতে হবে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সব দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে মন্ত্রণালয়ের কোথাও কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে না। এমনকি কাউকে দুর্নীতি করতেও দেওয়া হবে না।
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি জাতির জন্য বিশেষ তাৎপর্যময় দিন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং বাঙালির মৌলিক অধিকার আদায়ের প্রতীক। ভাষা মানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও মৌলিক অধিকার। একইসঙ্গে নিজের পরিবার, অনুভূতি ও চেতনার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক গভীর। সেই ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঙালিকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ত্যাগ ও সংগ্রাম ছাড়া কোনো জাতি অধিকার অর্জন করতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়েও অধিকার আদায়ে আন্দোলন ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পেয়েছেন এটাই বড় প্রাপ্তি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা হলো রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল হলে উঁচু ভবন দাঁড় করে লাভ নেই। তাই শিক্ষার অবকাঠামো মজবুত করাই সবার দায়িত্ব। শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। সেটি হচ্ছে— ‘কারিকুলাম, ক্লাসরুম ও কনসিস্টেন্সি’। পাঠ্যক্রম ভালো হতে হবে, শ্রেণিকক্ষে কার্যকরভাবে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে এবং সারা দেশে শিক্ষার মানে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। বর্তমানে দেশে বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি শিক্ষা ও বিভিন্ন ধারার মাদ্রাসাসহ বহু শিক্ষাধারা রয়েছে। এসব ধারার মধ্যে মানগত সমন্বয় জরুরি।
ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্ঞান ভাষার মধ্যেই গঠিত ও প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষায় ভাষা ও গণিতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ভাষা ও গণিতে দুর্বলতা থাকলে শিক্ষার ভিত্তি শক্ত হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনায় টাস্কফোর্স গঠনের কথাও জানান তিনি। তৃতীয় ভাষা শিক্ষা ধাপে ধাপে চালু করা হবে। তবে ইংরেজি শেখানোর আগে বাংলা ভাষায় দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী বাংলাতেই সঠিকভাবে শেখে না। এ বাস্তবতা পরিবর্তনে জোর দিতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সব দপ্তরে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। আমরা নিজেরা দুর্নীতিতে জড়াবো না এবং অন্যদের ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি থাকবো। দেশকে ভালোবাসার প্রমাণ শুধু আন্দোলনে নয়, কর্মক্ষেত্রেও দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত, মানসম্মত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























