নিজস্ব প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনের (এএনএফআরইএল) চেয়ারপারসন সোহানা এন হেতিয়ারাচ্চি।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, তরুণ ও নারী ভোটারদের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। একই সঙ্গে ভোট গণনা প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনি প্রচারণায় যে ব্যয় হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরার পরামর্শ দেন রোহানা এন. হেত্তিয়ারাচ্চি। পাশাপাশি তিনি বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।
সংবাদ সম্মেলনে আনফ্রেল জানায়, দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত এই জাতীয় নির্বাচন জনগণের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা খুব সীমিত ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
রোহানা হেতিয়ারাসসি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর এ নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল, যা ভোটকেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি থেকেই বোঝা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।’ দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
আনফ্রেল পর্যবেক্ষক দল জানায়, নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অধিকাংশ এলাকায় ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পেরেছেন। কোথাও কোথাও অনিয়ম বা প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ পাওয়া গেলেও তা সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেনি বলে জানায় সংস্থাটির পর্যবেক্ষক দল।
তবে কিছু কেন্দ্রে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত জটিলতা, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি এবং গণনা প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার অভাবের কথা উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
আনফ্রেল চেয়ারপারসন বলেন, ‘নির্বাচনি প্রচারণার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল বিবরণী প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল ভোটের দিন নয়, পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। অর্থায়নের উৎস ও ব্যয়ের খাত প্রকাশ করা হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।’
আনফ্রেল মনে করে, তরুণ ও নারী ভোটারদের সক্রিয় ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনি ইশতেহার ও সাংগঠনিক কাঠামোয় তরুণ ও নারীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা।
রোহানা হেতিয়ারাসসি বলেন, ‘গণতন্ত্র তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। তরুণ ও নারী ভোটারদের সম্পৃক্ততা শুধু ভোটদানে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াতেও বাড়াতে হবে।’
আনফ্রেল পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ভোট গণনা প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার সুপারিশ করা হয়েছে। গণনা শেষে ফলাফল প্রকাশে সময়ক্ষেপণ, তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বয়হীনতা কিংবা পর্যবেক্ষকদের সীমিত প্রবেশাধিকার-এসব বিষয়ে উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
সংস্থাটি মনে করে, ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, প্রশিক্ষিত নির্বাচনকর্মী নিয়োগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আস্থা আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে আনফ্রেল বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভোটারদের আগ্রহ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক স্থিতিশীলতা-এসব দিক নির্বাচনকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়ার উন্নয়ন-এসব ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন বলেও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। ভবিষ্যতে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেছে আনফ্রেল।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণ করেছে রাশিয়ান ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন (সিইসি)। কমিশনার পাভেল আন্দ্রিভের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সফর করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
পর্যবেক্ষকরা জানান, ভোটগ্রহণে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি ছিল দৃঢ় এবং ভোটারদের আগ্রহও ছিল উল্লেখযোগ্য। পরিদর্শন করা প্রতিটি কেন্দ্রে জাতীয় আইন ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসারে সু-প্রশিক্ষিত পদ্ধতিতে ভোট পরিচালিত হয়েছে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা প্রস্তুত ছিলেন এবং কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছেন। ভোটগ্রহণে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশ বিরাজ করেছে। পোলিং অফিসাররা দলীয় পোলিং এজেন্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বচ্ছতা ও তদারকি নিশ্চিত করেন।
অ্যানফ্রেল বলছে, দীর্ঘমেয়াদি আস্থার জন্য শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থগিতাদেশ অন্তর্ভুক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সম্পর্কে জনমতকে প্রভাবিত করেছে। আর গণভোটের ফলাফল জুলাই সনদের অধীনে সংস্কার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা জোরদার করেছে।
সংস্থাটির অন্তর্বর্তী মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভোটের দিনের অর্জিত আধা টেকসই হবে তখনই, যখন নির্বাচন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা পুনর্মিলনের লক্ষ্যে রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেবে। যা হবে বিধিনির্ভর জবাবদিহিতাভিত্তিক-এর মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক ও প্রচার অর্থায়ন তদারকি, সুস্পষ্ট অভিযোগ বাবস্থাপনা এবং পৃষ্ঠপোষকতা, জবরদস্তি ও পুনরাবৃত্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রণোদনা হ্রাসে প্রযোজনীয় সংস্কার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যানফ্রেল বলছে, ন্যায়বিচারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারে।
আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোটের উপস্থিতি কম কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রোহানা এন. হেত্তিয়ারাচ্চি বলেন, আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হয়েছে। কারণ আমরা এমন ভোটার পেয়েছি যারা এবার প্রথম বারের মতো ভোট দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ বছরের অনেকেই রয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















