Dhaka বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শেষ হলো ভোট উৎসব, ফলাফলের অপেক্ষা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৫:১২:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২১৪ জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় শেষ হলো । সারা দেশে মহোৎসব পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। এবার ফলাফলের অপেক্ষা।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ৯ ঘণ্টা ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ চলে। সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রে বাড়তে থাকে ভোটারের উপস্থিতি। দুপুরের পর থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া।

এদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি সমন্বয় সেল থেকে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষ্যে দেশের ৪৮৬টি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। জালভোট দেওয়া হয়েছে ৫৯টি এবং ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৩টি জায়গায়।

সমন্বয় সেলের তথ্য বলছে, দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশের সব কেন্দ্রের মধ্যে পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৪টি স্থানে। সারাদেশে বিভিন্ন প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৩৫ জায়গায়। দেশের সব কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮৬টি ভোট কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে সারাদেশে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে তিনটি জায়গায়। ৬ জন প্রার্থীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ৫৯টি জালভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভোট দিতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। অগ্নিসংযোগের ঘটনা পাওয়া গেছে ৪টি স্থানে এবং নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অবহেলার ঘটনা ঘটেছে ৩৩টি।

সারাদিন কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই নারী-পুরুষ ও প্রবীণ ভোটারদের ছিল দীর্ঘ সারি। এছাড়া এবারের ভোটে সারাদেশে নারীর ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

ভোটাররা বলেছেন, উৎসবমুখর পরিবেশে তারা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন। এবার ভোট দিতে কোনো বাধা ছিল না। এবারের পরিবেশে ভয় ছিল না, শান্তিতেই ভোট দিয়েছি।

নির্বাচনের দিনটিতে সারাদেশে বিরাজ করেছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। কোথাও কোথাও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর এলেও সামগ্রিকভাবে দিনটি কেটেছে শান্তিপূর্ণভাবে।

সারাদেশের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, নওগাঁয় ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার আগেই নির্ধারিত রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে রাখার অভিযোগে এক প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর ব্যালট পেপার বাক্সে জমা না দিয়ে কেন্দ্রত্যাগের অভিযোগে শাহিন মালিথা (২৮) নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে।

অপরদিকে, চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার একটি ভোটকেন্দ্রের পাশ থেকে নগদ ৭৯ হাজার ৩০০ টাকাসহ জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) সলিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে এজেন্টের ২৩টি স্বাক্ষরিত রেজাল্ট শিট জব্দের ঘটনায় ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জেসমিন আরাকে অপসারণ করা হয়েছে। এদিকে, ভোলা-১ সংসদীয় আসনের সদর আসনের একটি ভোটকেন্দ্রের পাশের মাঠে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এক জামায়াত কর্মী আটক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। একই জেলার সরাইল উপজেলায় ভোটগ্রহণ চলাকালে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মো. মুজাহিদুল ইসলাম নামে এক পোলিং অফিসারের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

গোপালগঞ্জ সদরের একটি ভোটকেন্দ্র ভোটগ্রহণ চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই আনসার সদস্যসহ ভোটারের সঙ্গে আসা এক শিশু আহত হয়েছে। এছাড়া ভোটকেন্দ্রর মূল ফটক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলার তিনটি ভোট কেন্দ্রের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মাদারীপুরের রাজৈরে একটি ভোটকেন্দ্রের পাশে মোটরসাইকেল আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে মোটরসাইকেলের আশি শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে।

এদিকে, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সদর উপজেলার মাকহাটি এলাকায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে আলুর ক্ষেত থেকে ধাওয়া করে আটক করেছে সেনাবাহিনী। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২০টি অবিস্ফোরিত ককটেল ও একটি একনালা বন্দুক উদ্ধার করা হয়। একই আসনের মাকহাটি গুরুচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের অদূরে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

ফরিদপুর-১ ও ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনের সদর উপজেলা ও মধুখালী উপজেলার দুটি কেন্দ্র থেকে দুজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা) আসনের ভোটগ্রহণে প্রভাব বিস্তার ও কারচুপির চেষ্টার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে সেনাবাহিনী। জেলায় ভোট কেন্দ্রের ভেতরে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগে বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে জরিমানা করেছেন বিচারিক আদালত।

শেরপুর-১ (সদর) আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যালট বই ছিনতাই ও জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় একজনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভর পক্ষে টাকা বিতরণ করতে গিয়ে নগদ টাকাসহ তার ৩ কর্মী জনতার হাতে আটক হয়েছে। পরে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন তারা।

নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার দেশের ২৯৯ সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকলেও বাকি আসনে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি সর্বোচ্চ ২৯১ জন, ইসলামী আন্দোলন ২৫৮ জন, জামায়াতে ইসলামী ২২৯ জন এবং জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন প্রার্থী দিয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩২ প্রার্থী ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটারের এ বিশাল কর্মযজ্ঞে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন।

ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য, ৫টি জেলার ১৭টি আসনে ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৫০০ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ জন র‌্যাব সদস্য, বিএনসিসির ১২৮টি সেকশনের ১ হাজার ৯২২ সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন-সংক্রান্ত অপরাধ আমলে নেওয়া এবং সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্নের লক্ষ্যে ২৯৯টি আসনে মোট ৬৫৭ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। তারা ভোট গ্রহণের আগে দুই দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরের দুই দিন- মোট পাঁচ দিন দায়িত্বে থাকবেন। এ সময়সীমা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে প্রতি উপজেলা ও নির্বাচনী থানায় ন্যূনতম দুই জন করে মোট ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনে ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ করছেন।

নির্বাচন কমিশন জানায়, এই নির্বাচনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং সংবাদ সংগ্রহের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে এসেছেন। আগতদের মধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে আসছেন প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি।

এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক এসেছেন।

 

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

বিএনপির বিজয় অনিবার্য, চূড়ান্ত ফল না পাওয়া পর্যন্ত সজাগ থাকুন : মাহদী আমিন

শেষ হলো ভোট উৎসব, ফলাফলের অপেক্ষা

প্রকাশের সময় : ০৫:১২:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় শেষ হলো । সারা দেশে মহোৎসব পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। এবার ফলাফলের অপেক্ষা।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ৯ ঘণ্টা ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ চলে। সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রে বাড়তে থাকে ভোটারের উপস্থিতি। দুপুরের পর থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া।

এদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি সমন্বয় সেল থেকে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষ্যে দেশের ৪৮৬টি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। জালভোট দেওয়া হয়েছে ৫৯টি এবং ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৩টি জায়গায়।

সমন্বয় সেলের তথ্য বলছে, দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশের সব কেন্দ্রের মধ্যে পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৪টি স্থানে। সারাদেশে বিভিন্ন প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৩৫ জায়গায়। দেশের সব কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮৬টি ভোট কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে সারাদেশে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে তিনটি জায়গায়। ৬ জন প্রার্থীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ৫৯টি জালভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভোট দিতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। অগ্নিসংযোগের ঘটনা পাওয়া গেছে ৪টি স্থানে এবং নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অবহেলার ঘটনা ঘটেছে ৩৩টি।

সারাদিন কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই নারী-পুরুষ ও প্রবীণ ভোটারদের ছিল দীর্ঘ সারি। এছাড়া এবারের ভোটে সারাদেশে নারীর ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

ভোটাররা বলেছেন, উৎসবমুখর পরিবেশে তারা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন। এবার ভোট দিতে কোনো বাধা ছিল না। এবারের পরিবেশে ভয় ছিল না, শান্তিতেই ভোট দিয়েছি।

নির্বাচনের দিনটিতে সারাদেশে বিরাজ করেছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। কোথাও কোথাও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর এলেও সামগ্রিকভাবে দিনটি কেটেছে শান্তিপূর্ণভাবে।

সারাদেশের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, নওগাঁয় ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার আগেই নির্ধারিত রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে রাখার অভিযোগে এক প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর ব্যালট পেপার বাক্সে জমা না দিয়ে কেন্দ্রত্যাগের অভিযোগে শাহিন মালিথা (২৮) নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে।

অপরদিকে, চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার একটি ভোটকেন্দ্রের পাশ থেকে নগদ ৭৯ হাজার ৩০০ টাকাসহ জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) সলিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে এজেন্টের ২৩টি স্বাক্ষরিত রেজাল্ট শিট জব্দের ঘটনায় ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জেসমিন আরাকে অপসারণ করা হয়েছে। এদিকে, ভোলা-১ সংসদীয় আসনের সদর আসনের একটি ভোটকেন্দ্রের পাশের মাঠে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এক জামায়াত কর্মী আটক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। একই জেলার সরাইল উপজেলায় ভোটগ্রহণ চলাকালে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মো. মুজাহিদুল ইসলাম নামে এক পোলিং অফিসারের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

গোপালগঞ্জ সদরের একটি ভোটকেন্দ্র ভোটগ্রহণ চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই আনসার সদস্যসহ ভোটারের সঙ্গে আসা এক শিশু আহত হয়েছে। এছাড়া ভোটকেন্দ্রর মূল ফটক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলার তিনটি ভোট কেন্দ্রের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মাদারীপুরের রাজৈরে একটি ভোটকেন্দ্রের পাশে মোটরসাইকেল আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে মোটরসাইকেলের আশি শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে।

এদিকে, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সদর উপজেলার মাকহাটি এলাকায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে আলুর ক্ষেত থেকে ধাওয়া করে আটক করেছে সেনাবাহিনী। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২০টি অবিস্ফোরিত ককটেল ও একটি একনালা বন্দুক উদ্ধার করা হয়। একই আসনের মাকহাটি গুরুচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের অদূরে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

ফরিদপুর-১ ও ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনের সদর উপজেলা ও মধুখালী উপজেলার দুটি কেন্দ্র থেকে দুজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা) আসনের ভোটগ্রহণে প্রভাব বিস্তার ও কারচুপির চেষ্টার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে সেনাবাহিনী। জেলায় ভোট কেন্দ্রের ভেতরে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগে বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে জরিমানা করেছেন বিচারিক আদালত।

শেরপুর-১ (সদর) আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যালট বই ছিনতাই ও জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় একজনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভর পক্ষে টাকা বিতরণ করতে গিয়ে নগদ টাকাসহ তার ৩ কর্মী জনতার হাতে আটক হয়েছে। পরে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন তারা।

নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার দেশের ২৯৯ সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকলেও বাকি আসনে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি সর্বোচ্চ ২৯১ জন, ইসলামী আন্দোলন ২৫৮ জন, জামায়াতে ইসলামী ২২৯ জন এবং জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন প্রার্থী দিয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩২ প্রার্থী ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটারের এ বিশাল কর্মযজ্ঞে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন।

ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য, ৫টি জেলার ১৭টি আসনে ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৫০০ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ জন র‌্যাব সদস্য, বিএনসিসির ১২৮টি সেকশনের ১ হাজার ৯২২ সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন-সংক্রান্ত অপরাধ আমলে নেওয়া এবং সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্নের লক্ষ্যে ২৯৯টি আসনে মোট ৬৫৭ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। তারা ভোট গ্রহণের আগে দুই দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরের দুই দিন- মোট পাঁচ দিন দায়িত্বে থাকবেন। এ সময়সীমা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে প্রতি উপজেলা ও নির্বাচনী থানায় ন্যূনতম দুই জন করে মোট ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনে ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ করছেন।

নির্বাচন কমিশন জানায়, এই নির্বাচনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং সংবাদ সংগ্রহের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে এসেছেন। আগতদের মধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে আসছেন প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি।

এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক এসেছেন।