Dhaka বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের অদৃশ্য চুক্তি: নথিতে বেলহাসা, বাস্তবে ওরিয়ন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ১২:১৮:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৭৬ জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বহুল আলোচিত যাত্রাবাড়ী–গুলিস্তান (মেয়র হানিফ) ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নাম থাকলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রকল্পের কোনো সরাসরি কনসেশন চুক্তি ছিল না—এমন তথ্য উঠে এসেছে পুরোনো নথি ও অনুসন্ধানে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত নানা গল্প ও বিতর্কের পেছনে মূল নির্মাণকারী হিসেবে উঠে এসেছে দুবাইভিত্তিক বেলহাসা গ্রুপের নাম।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ২১ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিওওটি (নির্মাণ–মালিকানা–পরিচালনা–হস্তান্তর) পদ্ধতিতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) সঙ্গে কনসেশন চুক্তি করে বেলহাসা–একম কনসোর্টিয়াম। ২০০৬ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের অনুমোদনে বেলহাসা–একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস আবারও কাজ শুরু করে।

জাতীয় অর্থনীতির কাছে থাকা নথি বলছে, ২০১০ সালের ১৩ মে ডিসিসি ও বেলহাসা–একম যৌথভাবে অর্থায়নসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। কিন্তু সে পর্যায়ে বেলহাসাকে কার্যত সরিয়ে দিয়ে প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয় ওরিয়ন গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া চুক্তিপত্র ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বেলহাসা–একমের নামে কাগজপত্র তৈরি করে প্রকল্পটি দখলে নেয় ওরিয়ন।

বেলহাসা পরিবারের দাবি, ওবায়দুল করিম পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি হয়নি এবং উপস্থাপিত নথিপত্র সম্পূর্ণ জাল। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের দায়ের করা একাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। বেলহাসা ওবায়দুল করিমের বিরুদ্ধে কোম্পানি দখলের অভিযোগে মামলা করে (মামলা নং ৪৯৬/১০)। এর পাল্টা হিসেবে ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট ওরিয়ন পক্ষ বেলহাসার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে (মামলা নং ৩৪৯/১০)।

বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যমতে, শেয়ার বণ্টন নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে যৌথ কোম্পানির নাম পরিবর্তন করা হয়। বেলহাসা–একম জেভি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের নাম বদলে ‘ওরিয়ন গ্রুপ’ রাখা হয় এবং চেয়ারম্যান হন ওবায়দুল করিম। পরবর্তীতে ‘ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’-এর নামে ফ্লাইওভার প্রকল্পের দখল নেওয়া হয় এবং যৌথ কোম্পানির ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নেয় ওরিয়ন।

আইনি লড়াইয়ে বেলহাসার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে যুক্ত ছিলেন আইনজীবী জোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি আদালতে বলেন, বেলহাসা ও একম—উভয় প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর জাল করে কোম্পানি দখল করা হয়েছে, যা ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় অপরাধের শামিল।

এদিকে টোল আদায় ও ব্যয়সংক্রান্ত বিরোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ওরিয়ন গ্রুপের মধ্যে আরবিট্রেশন মামলা হয়। ওই মামলার নথি অনুযায়ী, ওরিয়নের দাখিল করা কিছু কাগজপত্র জাল প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দাবি বাতিল করে ডিএসসিসি এবং নতুন করে চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য করে।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭০ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে মৌখিক সিদ্ধান্ত ও যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয় ছিল ৭৮৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের দৈর্ঘ্যও মূল পরিকল্পনার বাইরে বাড়ানো হলেও সংশোধিত কোনো বৈধ চুক্তিপত্র পাওয়া যায়নি।

ডিসিসি সূত্র স্বীকার করেছে, প্রকল্পের শুরুর দিকে ওরিয়নের সঙ্গে কোনো সরাসরি বৈধ চুক্তি ছিল না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। দুই দশক পরও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির তথ্য দিতে পারেনি ডিএসসিসি।

বর্তমান ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, চুক্তিটি মূলত অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল, তবে পরবর্তীতে ওরিয়নকে কাজ করার অনুমোদনসংক্রান্ত একটি চিঠি তিনি দেখেছেন। তবে চুক্তির গোড়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম ও মুখপাত্র খালেদ মাসুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

এসএ কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে যৌথ অভিযানে কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ, আটক ২

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের অদৃশ্য চুক্তি: নথিতে বেলহাসা, বাস্তবে ওরিয়ন

প্রকাশের সময় : ১২:১৮:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বহুল আলোচিত যাত্রাবাড়ী–গুলিস্তান (মেয়র হানিফ) ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নাম থাকলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রকল্পের কোনো সরাসরি কনসেশন চুক্তি ছিল না—এমন তথ্য উঠে এসেছে পুরোনো নথি ও অনুসন্ধানে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত নানা গল্প ও বিতর্কের পেছনে মূল নির্মাণকারী হিসেবে উঠে এসেছে দুবাইভিত্তিক বেলহাসা গ্রুপের নাম।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ২১ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিওওটি (নির্মাণ–মালিকানা–পরিচালনা–হস্তান্তর) পদ্ধতিতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) সঙ্গে কনসেশন চুক্তি করে বেলহাসা–একম কনসোর্টিয়াম। ২০০৬ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের অনুমোদনে বেলহাসা–একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস আবারও কাজ শুরু করে।

জাতীয় অর্থনীতির কাছে থাকা নথি বলছে, ২০১০ সালের ১৩ মে ডিসিসি ও বেলহাসা–একম যৌথভাবে অর্থায়নসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। কিন্তু সে পর্যায়ে বেলহাসাকে কার্যত সরিয়ে দিয়ে প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয় ওরিয়ন গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া চুক্তিপত্র ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বেলহাসা–একমের নামে কাগজপত্র তৈরি করে প্রকল্পটি দখলে নেয় ওরিয়ন।

বেলহাসা পরিবারের দাবি, ওবায়দুল করিম পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি হয়নি এবং উপস্থাপিত নথিপত্র সম্পূর্ণ জাল। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের দায়ের করা একাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। বেলহাসা ওবায়দুল করিমের বিরুদ্ধে কোম্পানি দখলের অভিযোগে মামলা করে (মামলা নং ৪৯৬/১০)। এর পাল্টা হিসেবে ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট ওরিয়ন পক্ষ বেলহাসার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে (মামলা নং ৩৪৯/১০)।

বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যমতে, শেয়ার বণ্টন নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে যৌথ কোম্পানির নাম পরিবর্তন করা হয়। বেলহাসা–একম জেভি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের নাম বদলে ‘ওরিয়ন গ্রুপ’ রাখা হয় এবং চেয়ারম্যান হন ওবায়দুল করিম। পরবর্তীতে ‘ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’-এর নামে ফ্লাইওভার প্রকল্পের দখল নেওয়া হয় এবং যৌথ কোম্পানির ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নেয় ওরিয়ন।

আইনি লড়াইয়ে বেলহাসার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে যুক্ত ছিলেন আইনজীবী জোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি আদালতে বলেন, বেলহাসা ও একম—উভয় প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর জাল করে কোম্পানি দখল করা হয়েছে, যা ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় অপরাধের শামিল।

এদিকে টোল আদায় ও ব্যয়সংক্রান্ত বিরোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ওরিয়ন গ্রুপের মধ্যে আরবিট্রেশন মামলা হয়। ওই মামলার নথি অনুযায়ী, ওরিয়নের দাখিল করা কিছু কাগজপত্র জাল প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দাবি বাতিল করে ডিএসসিসি এবং নতুন করে চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য করে।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭০ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে মৌখিক সিদ্ধান্ত ও যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয় ছিল ৭৮৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের দৈর্ঘ্যও মূল পরিকল্পনার বাইরে বাড়ানো হলেও সংশোধিত কোনো বৈধ চুক্তিপত্র পাওয়া যায়নি।

ডিসিসি সূত্র স্বীকার করেছে, প্রকল্পের শুরুর দিকে ওরিয়নের সঙ্গে কোনো সরাসরি বৈধ চুক্তি ছিল না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। দুই দশক পরও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির তথ্য দিতে পারেনি ডিএসসিসি।

বর্তমান ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, চুক্তিটি মূলত অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল, তবে পরবর্তীতে ওরিয়নকে কাজ করার অনুমোদনসংক্রান্ত একটি চিঠি তিনি দেখেছেন। তবে চুক্তির গোড়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম ও মুখপাত্র খালেদ মাসুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।