স্পোর্টস ডেস্ক :
ক্লাব ফুটবলে একসময় তাঁরা ছিলেন সতীর্থ। লিভারপুলে একসঙ্গে খেলেছিলেন পাঁচ বছর। কথাটা যে মোহাম্মদ সালাহ ও সাদিও মানের প্রসঙ্গে বলা, সেটা হয়তো অনেকেই বুঝতে পেরেছেন। গতকাল দুই বন্ধু হয়ে গেলেন প্রতিপক্ষ। শেষ হাসি হেসেছেন মানে।
তাঞ্জিয়ারে গত রাতে হয়েছিল আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (আফকন) প্রথম সেমিফাইনাল সেনেগাল-মিসর ম্যাচ। লিভারপুলের দুই সাবেক সতীর্থ সালাহ-মানের লড়াইয়েই চোখ ছিল ফুটবলপ্রেমীদের। শেষ পর্যন্ত ফাইনালের টিকিট কেটেছে মানের সেনেগাল। মিসরকে ১-০ গোলে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো আফকনের ফাইনালে উঠেছে সেনেগাল।
ম্যাচে প্রায় ৬৪ শতাংশ পজেশন রেখে গোলের জন্য ১২টি শট নিয়ে ৪টি লক্ষ্যে রাখতে পারে সেনেগাল। মিশরের ৩ শটের কেবল একটি লক্ষ্যে ছিল, সেটিও দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে।
এবারের আফকনে সেমিফাইনাল পর্যন্ত মিশরের হয়ে চার গোল করেছিলেন সালাহ, যা তার সেরা আসর। কিন্তু এই ম্যাচে তিনি ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে ওমর মারমুশের দূরপাল্লার শটটি সেনেগাল গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্দি ঠেকানোর আগ পর্যন্ত মিশর তেমন কোনো হুমকিই তৈরি করতে পারেনি। পাপে থিয়াওয়ের শিষ্যরা ফাইনালে খেলবে স্বাগতিক মরক্কোর বিপক্ষে। বুধবার অন্য সেমিফাইনালে নাইজেরিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে মরক্কো। রোববার (জিএমটি ১৯:০০) অনুষ্ঠিত হবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ।
তবে ফাইনালে সেনেগাল পাবে না অধিনায়ক কালিদু কুলিবালি ও মিডফিল্ডার হাবিব দিয়ারাকে। নকআউট পর্বে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখায় তারা নিষিদ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে কুলিবালি আবার প্রথমার্ধেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন, তার ফিটনেস নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
অ্যানফিল্ডের দীর্ঘদিনের সতীর্থদের দ্বৈরথ হিসেবে প্রচারিত ম্যাচে শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল সেনেগাল। যদিও সংগঠিত মিশরীয় রক্ষণ ভাঙতে বেশ বেগ পেতে হয়। প্রথমার্ধে নিকোলাস জ্যাকসনের শট বার ছাপিয়ে যায়। পরে দিয়ারা ও পাপে গেয়ের শটে পরীক্ষা দিতে হয় গোলরক্ষক মোহাম্মদ এল শেনাওয়িকে।
মিশর খুব কমই আক্রমণে উঠতে পেরেছে। প্রথমার্ধে কুলিবালির ফাউলে ৩০ গজ দূরে ফ্রি-কিক পেলেও সেটি কাজে লাগাতে পারেনি তারা। বিরতির আগে দুই দলের টেকনিক্যাল এরিয়ায় উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে, সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও মিশরের এলাকায় ঢুকে নির্দেশনা দেওয়ায় দুই বেঞ্চের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
দ্বিতীয়ার্ধেও চিত্রটা একই থাকে। লামিন কামারা ও ইলিমান এনদিয়ায়ের দূরপাল্লার শটে চেষ্টা চালায় সেনেগাল, আর মিশর রক্ষণাত্মকই থাকে, বিরতিতে অভিজ্ঞ ত্রেজেগেকে নামানো সত্ত্বেও।
অবশেষে কাঙ্ক্ষিত গোল আসে। কামারার একটি শট প্রতিহত হলে বল পেয়ে যান মানে, ২০ গজ দূর থেকে নিখুঁত ফিনিশে ম্যাচের নিয়তি বদলে দেন তিনি। ভিএআরে নিকোলাস জ্যাকসনের অফসাইড ও মানের হ্যান্ডবলের অভিযোগ খতিয়ে দেখলেও গোল বহাল থাকে।
শেষ দিকে সমতায় ফেরার আশায় জিজো, মোস্তাফা মোহাম্মদ ও সালাহ মোহসেনকে নামান মিশর কোচ হোসাম হাসান। কিন্তু সাতবারের চ্যাম্পিয়নরা পুরো ম্যাচেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত মারমুশের আরেকটি শট ঠেকিয়ে দেন মেন্দি, আর জয় নিশ্চিত হয় সেনেগালের।
এর ফলে দ্বিতীয়বারের মতো আফকন শিরোপা জয়ের সুযোগ পেল সেনেগাল। অন্যদিকে ৩৩ বছর বয়সী সালাহর অপেক্ষা আরও বাড়ল। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর তিনি বলেছিলেন, “এই শিরোপাটাই আমি অপেক্ষা করছি।” কিন্তু তাঞ্জিয়ারে গোলের স্পষ্ট সুযোগই পাননি তিনি।
২০১৭ ও ২০২১ আফকনের ফাইনালে হেরেছিলেন সালাহ, ২০১৯ সালে শেষ ষোলোতে বিদায় নেন, আর ২০২৩ আসরে চোটের কারণে প্রথম নকআউটেই ছিটকে যায় মিশর। এবারের হারটি আরও যন্ত্রণাদায়ক, কারণ আবারও ম্যাচজয়ী হলেন মানে- যিনি ২০২২ সালে দুই টাইব্রেকারেই নির্ণায়ক গোল করেছিলেন।
২০২৭ আফকন কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৮ থেকে টুর্নামেন্ট চার বছর পরপর হওয়ায় সেটিই হতে পারে সালাহর শেষ সুযোগ। এদিকে ১৯৮৪ সালের পর প্রথমবার সেমিফাইনালে হেরে গেল মিশর, আর ২০১০ সালে টানা তিন শিরোপার পর থেকে শিরোপা খরাও কাটছে না তাদের।
ম্যাচ শেষে ৩৩ বছর বয়সী মানে জানান, এটিই তাঁর শেষ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস এবং তিনি শিরোপা জয়ে বেশ আশাবাদী, ‘আমার শেষ আফ্রিকা কাপে খেলতে পেরে আমি খুব খুশি। আশা করি, ফাইনাল জিতে ট্রফিটা ডাকারে নিয়ে যেতে পারব। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা ম্যাচটা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছি। আমার মনে হয়, আমরা জয়ের যোগ্য ছিলাম। ফাইনালের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যেন নিজেদের সেরাটা দিতে পারি।’
রাবাতে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে মরক্কো ও নাইজেরিয়ার ম্যাচটি অতিরিক্ত সময় শেষেও গোলশূন্য ছিল। টাইব্রেকারে মরক্কোর জয়ের নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু। সৌদি ক্লাব আল-হিলালের এই গোলরক্ষক নাইজেরিয়ার স্যামুয়েল চুকুয়েজে ও ব্রুনো অনিয়েমায়েচির শট ঠেকান। শেষ কিকে লক্ষ্যভেদ করে মরক্কোকে ফাইনালে তুলে দেন ইউসুফ এন-নেসিরি। এই গোলের পর প্রিন্স মৌলাই আবদেল্লাহ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৬৫ হাজারের বেশি দর্শক আনন্দে মেতে ওঠে।
জয়ের পর মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ম্যাচগুলোর একটি ছিল। প্রতিপক্ষ ছিল খুবই শক্তিশালী ও প্রতিভাবান। খেলোয়াড়দের জন্য এবং মরক্কোর মানুষের জন্য আমি খুব খুশি। এটা তাদের প্রাপ্য।’
২০০৪ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে সর্বশেষ ফাইনাল খেলে মরক্কো, যেখানে তাঁরা হেরেছিল তিউনিসিয়ার কাছে। সেই দলের সদস্য ছিলেন রেগরাগুই। ফাইনালে ওঠার আনন্দে তিনি বলেন, ‘ফাইনালে ওঠাটা সবার জন্য দারুণ উপহার। তবে আমরা এই ম্যাচে অনেক শক্তি খরচ করেছি, তাই দ্রুতই আমাদের পুনরুদ্ধার করতে হবে।’
স্পোর্টস ডেস্ক 

























