নিজস্ব প্রতিবেদক :
অটোরিকশার জন্য লাইসেন্স-রুট পারমিট প্রদান, লাইসেন্স প্রদান না করা অবধি রিকশা আটক বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করাসহ ১২ দফা দাবি জানিয়েছে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: রিকশা শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক দল-প্রার্থীদের অঙ্গীকার’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানানো হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম, সংগঠক ফয়সাল হায়দার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি আব্দুল আলী প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে ফয়সাল হায়দার বলেন, আপনারা জানেন বাংলাদেশের ৭০ লাখ মানুষ রিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু বিভিন্ন সময়ের সরকারগুলোর উদাসীনতা ও যৌক্তিক নীতিমালা না থাকায় তাদের জীবিকা আজও নিরাপদ হয়নি। ফলে ৭০ লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবারসহ দেশের সাড়ে ৩ কোটিরও অধিক মানুষ রুটি-রুজির অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
তিনি বলেন, রিকশাকে যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রাংশ দিয়ে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। বিদ্যুৎ জাতীয় সম্পদ। সুতরাং বৈধ পথে বিদ্যুৎ ব্যবহার করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে। তা ছাড়া রিকশা কোনো ব্যক্তিগত বাহন নয়, এটি গণপরিবহনেরই একটি অংশ। গণপরিবহনে বিদ্যুৎ ব্যবহার তার গণস্বার্থকে উপকৃত করবে। কারো ব্যক্তিগত আরাম বা বিলাসিতায় এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হবে না। ব্যাটারিচালিত প্রত্যেক যানবাহনের চালক তার ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য বাণিজ্যিক মূল্য নিয়মিত পরিশোধ করে আসছে।
ফয়সাল হায়দার বলেন, আমরা ২০১২ সাল থেকে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রদানের দাবি করছি। কিন্তু আমাদের দাবিতে কর্ণপাত করা হচ্ছে না। আমরা প্রত্যাশা করছি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দ্রুততার সঙ্গে বিআরটিএ কর্তৃক ব্যাটারিচালিত যানবাহনের লাইসেন্স প্রদান এবং লাইসেন্স প্রদান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত যানবাহন আটক বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ও রাজনৈতিক দলসমূহ কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন আইন), ২০০৯’-এর অধিকতর সংশোধনকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশটি বাতিল করে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলের নীতিমালা প্রণয়ন ও তদারকির পূর্ণ এখতিয়ার বিআরটিএর কাছে অর্পণ করা আবশ্যক। একইসঙ্গে বিআরটিএ কর্তৃক এই বাহন সংক্রান্ত প্রণীত খসড়া নীতিমালাটি অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে যৌক্তিকভাবে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
সভায় যেসব দাবি উপস্থাপন করা হয় সেগুলো হলো—
১. আধুনিকায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করে দেশের সড়ক উপযোগী মডেলে আধুনিকায়নসহ বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স-রুট পারমিট প্রদান ও যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। আধুনিকায়নের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।
২. বিআরটিএ কর্তৃক ব্যাটারিচালিত যানবাহন চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে ও লাইসেন্স প্রদান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত যানবাহন আটক বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করতে হবে।
৩. অবিলম্বে জরিপের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক অটোরিকশার সংখ্যা ও মালিকানা নির্ধারণ করে আনুপাতিক হার পদ্ধতিতে সকলের লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দেশের সড়ক উপযোগী মডেল সকলের জন্য উন্মুক্ত করে বাহনগুলোর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত ও বাহন বিনিময় নীতি শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে নির্ধারণ করতে হবে।
৫. শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে।
৬. ব্যাটারিচালিত যানবাহন শ্রমিকদের ওপর জুলুম-নির্যাতন-চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। অবৈধ কার্ড-টোকেনের নামে চাঁদাবাজি যেন পুনরায় ফিরে না আসে তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. ব্যাটারিচালিত যানবাহন গ্যারেজের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করতে হবে।
৮. বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক ও সাইকেলের জন্য সকল সড়কে সার্ভিস লেন নির্মাণ করতে হবে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে রাস্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও ব্যাটারিচালিত যানের জন্য র্যাকার বিল কমিয়ে যৌক্তিক করতে হবে।
৯. নিত্যপণ্যের ভ্যাট কমাও-শ্রমিকদের জন্য রেশন চালু করতে হবে। বাসস্থান, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম কার্যকর করতে হবে। অসৎ বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে।
১০. ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন হিসেবে শিল্পের স্বীকৃতি দিতে হবে। শিল্পের বিকাশে সহায়তার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় এক অঙ্কের সুদে জামানতবিহীন ঋণ দিতে হবে।
১১. ‘জীবিকা সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করতে হবে। ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংক্রান্ত সকল রিট দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। শ্রম সংস্কার সুপারিশ— জীবিকার মাধ্যম বিনষ্ট না করার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
১২. রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক ও দেশের অর্থনীতির বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে প্যাডেলচালিত যানবাহনের শ্রম থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























