নিজস্ব প্রতিবেদক :
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় দাখিল করা অভিযোগপত্রের ওপর শুনানির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দিন ধার্য করেছেন আদালত।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) ঢাকার এডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। পাশাপাশি এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষকে সাহায্যের জন্য তিন আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদালত থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তারা হলেন- সিনিয়র আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার, ব্যরিস্টার এস এম মইনুল করিম, সহকারী এটর্নি জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল।
এদিন সকাল ১১টার দিকে আদালতে আসেন মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের, ফাতিমা তাসনিম জুমা, শান্তা আক্তারসহ অনেকে।
মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাবের সাক্ষীসেলে দাঁড়িয়ে আদালতের কাছে এ মামলায় নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবীদের আবেদনের সঙ্গে সম্মতি জানান।
আদালতে আইনজীবীরা চার্জশিট পর্যালোচনার জন্য আগামী দুই দিন মঙ্গলবার এবং বুধবার সময় চান। পর্যালোচনা শেষে আগামী বৃহস্পতিবার তারা চার্জশিট গ্রহণ বা নারাজির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। পরে আদালত তাদের আবেদন গ্রহণ করে দুই দিন সময় দেন।
শুনানি শেষে আইনজীবীরা সাংবাদিকদের বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদি বলতেন, আমার শত্রুর সঙ্গেও ন্যায় বিচার করতে চাই এ কথাকে মাথায় রেখে আমরা এ মামলার চার্জশিট নিয়ে আরও স্টাডি করতে চাই। যেন কোনও নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি না পায়। এ মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার ১৭ জনের মধ্যে ৯ জন জবানবন্দি দিয়েছে।

গত ৬ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিচারক জশিতা ইসলাম চার্জশিটটি দেখিলাম বলে সই করেন। এরপর চার্জশিটে কোনও আপত্তি রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে বক্তব্য শুনতে বাদিকে আজ ১২ জানুয়ারি আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরে ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, হাদি হত্যার ঘটনায় ১৭ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও ফয়সাল (২৫)।
ডিবিপ্রধান জানান, তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেফতার আসামিদের জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল ও প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ, উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুজনসহ ছয়জনকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি।
হাদি হত্যার মোটিভ তুলে ধরে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফয়সাল নিজেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভিকটিমের পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের পরিকল্পনায় ন্যক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
পুলিশ বলছে, হাদি হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর। ঘটনার দিন দুজন হাদিকে অনুসরণ করছিলেন। মোটরসাইকেলে করে পেছন থেকে এসে রিকশায় বসা হাদিকে গুলি করা হয়। চালকের আসনে ছিলেন আলমগীর হোসেন আর পেছনে বসে থাকা ফয়সাল গুলি করেছিলেন।
তদন্তে হাদি হত্যায় পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর ‘সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে’ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, বাপ্পী শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীরের পলায়নে ‘সার্বিক সহায়তাকারী’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
এই তিন আসামি ছাড়া অন্যদের মধ্যে ফয়সালের পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজনসহ মোট আটজন ফয়সালকে পালাতে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। তারা হলেন— ফয়সালের দুলাভাই মুক্তি মাহমুদ, বোন জেসমিন, বাবা হুমায়ুন, মা হাসি, স্ত্রী সাহেদা, শ্যালক ওয়াহিদ, বান্ধবী মারিয়া এবং কবির। এছাড়া ফয়সালকে পালাতে ভাড়া গাড়ি ব্যবস্থা করেন নুরুজ্জামান। ফয়সালকে সীমান্ত দিয়ে পালাতে ফিলিপ, সিবিয়ন, সঞ্জয় ও আমিনুল সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ পুলিশের। অভিযোগপত্রভুক্ত ১৭ নম্বর আসামি ফয়সালকে গ্রেফতারের পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন তথ্য পাওয়া গেলে বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে সম্পূরক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা হাদিকে মাথায় গুলি করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। তিন দিন পর ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। ফয়সাল করিম মাসুদকে আসামি করে ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। হাদি মারা যাওয়ার পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















