নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা-১৮ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র সাময়িকভাবে স্থগিতের পর বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে এ তথ্য জানান বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।
মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের বলেন, “আমি এর আগেও আরও তিন/চারবার নির্বাচন করেছি। এইরকম কঠিন হতে দেখিনি কোন পথ। এবং এই কারণেই বিশেষ করে আজকের যে নির্বাচন কমিশন আমাকে বৈধ ঘোষণা করেছে তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিই। কারণ হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন যারা যেখানে যতটুকু দায়িত্ব পালন করেন, তাদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবার ওপরেও একটা গুণমান সম্পন্ন সুষ্ঠ, সবার কাছে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব।
নির্বাচন কমিশনে ‘চাপ প্রয়োগ’ করে মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে দাবি করেন বিএনপি জোটের এই প্রার্থী বলেন, চাপ তৈরি করে, মব করে যদি নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা যায়, তাহলে সেই নির্বাচন কোন গুণমান পেতে পারে না। যেজন্যই এতগুলো শহীদ জীবন দিলেন, এত বড় আন্দোলন হল, সেগুলোর কোনো মূল্য থাকে না।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্নাসহ ১৭ জন ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। ঢাকা উত্তর সিটির ১, ১৭, ৪৩ থেকে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড ও বিমানবন্দর এলাকা নিয়ে এই আসন।
বগুড়ায় মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার চিত্র তুলে ধরে মান্না বলেন, “সেইখানকার এই প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা মানে, একটা মোবোক্রেসি হয়েছে। আমার যে প্রার্থিতা, যখন বাছাই করা হয় তখন আমার প্রতিপক্ষ বলব না কি বলব, আমি ঠিক জানি না। মানে একটা দলের প্রার্থীর পক্ষে বগুড়া জেলার ১২ জন আইনজীবী একসাথে আসছে। ঢাকার সুপ্রিম কোর্টসহ দুই তিনজন আইনজীবীকে নেওয়া হয়েছে। সহকারী অটর্নি জেনারেল গেছেন।
“আর নিজেদের দলের লোক যে কত গেছে, সেটা বলবার দরকার নেই। এবং তারা ইচ্ছামত কথা বলেছেন। যত জোরে জোরে কথা বলা যায়, বলেছেন। আমার পক্ষে যারা যুক্তি দিচ্ছিলেন, তাদেরকে ধমক দিয়েছেন। তারা ডিসির পাশে বসে, মনে হচ্ছে যে তারাই যেন একটা কর্তৃত্ব করছেন, নির্দেশ জারি করেছেন এরকম।”
জোটের আসনে বিএনপির প্রার্থী দেওয়ার কারন না জানার কথা তুলে ধরে মান্না বলেন, “আপনারা এটাও তো জানেন যে আমাকে, আমরা যে যুগপৎ আন্দোলন প্রায় ১৫ বছর ধরে করেছি, সেই যুগপৎ শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে বগুড়া-২ আসনে ঘোষণা করা হয়েছিল প্রার্থী হিসেবে। অথচ সেইখানেই আবার বিএনপির পক্ষ থেকে আরেকজন প্রার্থীকে তাদের দলের, তাকে একটা চিঠি দেওয়া হয়েছিল বৈধ প্রার্থী হিসেবে। জানি না কেন, আমার সাথে এ নিয়ে কোনো কথা হয়নি।
বগুড়ায় মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলোর অনেককিছুই ইতোমধ্যে আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে মান্নার নাম ঋণ খেলাপির তালিকায় থাকায় তার ভোটের পথ আটকেছিল। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ঋণ খেলাপির তালিকা থেকে নাম কাটানোর জন্য তিনি হাই কোর্টে আবেদন করলে তা খারিজ হয়ে যায়।
সেই আদেশের বিরুদ্ধে মান্না আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিল করে সিআইবির তালিকা থেকে নাম কাটানোর আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী।
এ আবেদন শুনে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক গত রোববার হাই কোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেন। সেই সঙ্গে সিআইবির তালিকায় মান্নার নামও স্থগিত করা হয়। ফলে ঋণ সংক্রান্ত জটিলতায় তার নির্বাচন করার জটিলতা কেটে যায়।
আওয়ামী লীগ ছেড়ে আসা নাগরিক ঐক্যের এই নেতা বলেন, “এরকম একটা মজার ব্যাপার হল, আমি একটা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছি, আমি নেইনি আমার কোম্পানি, যখন আমি ছিলাম না ছিল, অন্য কেউ। সেই লোক, সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক পলাতক, মামলা আছে তার নামে। আমি গেছি যাতে আমার ওপরে বোঝা না চাপে। কোম্পানির লসটা হয় ব্যাংকের লসটা হয়, তাকে বহুভাবে হ্যারাস করা হয়েছে, চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, সেই কাহিনী আমি বলছি না।”
তারপরেও এমন এমন বিষয় তোলা হয়েছে এবং যার ভিত্তিতে বগুড়াতে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “সেগুলো খুবই ‘হাস্যকর ও তুচ্ছ’ ব্যাপার, যেগুলো অত বড় ধরবার মতো নয়, আইন অনুযায়ী গ্রাহ্য হতে পারে।”
মান্নার মতে, প্রার্থীদের বাদ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। বরং কিছু ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দিয়ে নির্বাচনে সুযোগ দেওয়াই তাদের কাজ।
“কিন্তু কেউ কেউ কোনো কোনো দলের কোনো কোনো অংশ, আমি দেখতে পাচ্ছি রীতিমত তার উপরে হস্তক্ষেপ করছে। নির্বাচন কমিশনের উপরে তো বটেই, এমনকি প্রার্থীদের পর্যন্ত ধমক দিয়ে বৈধকে অবৈধ এবং দলের লোকজন নিয়ে এসে তথাকথিত সমর্থক নিয়ে এই সমস্ত কাজকর্ম করেছে।”
নাগরিক ঐক্যে সভাপতি বলেন, “আমি বগুড়ার ব্যাপারে বলেছি যে এতই ঠুনক যুক্তিতে, বলা হয়েছে, এখানে যেগুলো বলা হয়েছে, ধরেন আমি একটা সই করবার সময় তারিখটা ভুল হয়ে গেছে। আমার ভুল আমি স্বীকার করছি, হতেই পারে। অনেক প্রার্থীর হয় এরকম…। এই শুধু ভুলের উপরে আবার প্রার্থীতা বাতিল হবে এরকম তো কোনো কথা নেই।”
আপিল করবেন কি না, এমন প্রশ্নে মান্না বলেন, “আপিল করবো, আমি জোটের প্রার্থী হিসেবে কি হবে, তাতো আমি জানি না। আমি এটা বিশ্বাস করি যে এই আপিলে আমি জিততে পারবো। তারপরে আমরা তো আর জোটের প্রার্থী হিসেবে নমিনেশন পেপার দিই না, আমরা দিয়েছি দলের পক্ষ থেকে, তখন আমি চিন্তা করব ব্যাপারটাকে কি করা যায়। আমার দলের লোক যেমন আমাকে চায়, আমি মনে করি এই জায়গা থেকেও সেরকম রিঅ্যাকশন আমি পেয়েছি।”
হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের তথ্যে অসামঞ্জস্যতা থাকায় প্রথমে তার মনোনয়ন স্থগিত করা হলেও পরবর্তীতে সংশোধিত কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রেক্ষিতে তাকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের ফল ঘোষণার সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা মান্নার মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখার কথা জানান। সে সময় জানানো হয়, মান্নার জমা দেওয়া হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের তথ্যে কিছু গরমিল রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে মান্নার প্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় সংশোধনীর জন্য সময় চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা এক ঘণ্টা সময় মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে যাচাই-বাছাই শেষে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “আমি এর আগেও তিন-চারবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। কিন্তু এবারকার পথ এত কঠিন হবে, তা আগে কখনো দেখিনি। আজ নির্বাচন কমিশন আমাকে বৈধ ঘোষণা করেছে—এ জন্য আমি আন্তরিকভাবে তাদের ধন্যবাদ জানাই।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 























